default-image

পেজ খুলে বহুবিবাহের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে ফেসবুকভিত্তিক একটি গ্রুপ। এমনকি দ্বিতীয় বিয়ে করার ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়াসহ আরও যেসব রাষ্ট্রীয় আইন–কানুন আছে, সেসবেরও তোয়াক্কা করছেন না তাঁরা।


এই পেজের এক অ্যাডমিন বলেন, একাধিক বিয়ে যে মূলত শরীয়তে বৈধ এবং সমাজে একে বাঁকা চোখে দেখা হয়, সেটা ভাঙাই তাঁদের উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য অনেকটাই অগোছালো।


জানা গেছে, পেজটি পরিচালনায় যুক্ত আছেন সাত থেকে আটজন। তাঁদের কেউ ব্যবসা করেন, কেউ চাকরি। একজন বাদে প্রত্যেকের বয়স ত্রিশের ঘরে। তাঁদের কেউ বহুবিবাহ করেছেন কি না, জানতে চাইলে ওই অ্যাডমিন বলেন, একজন পারিবারিকভাবে একাধিক বিয়ে করেছেন।


পুলিশ সদরদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (মিডিয়া ও প্ল্যানিং) হায়দার আলী খান প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই পেজ সম্পর্কে কেউ এখন পর্যন্ত অভিযোগ জানাননি। তবে, প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা, খোরপোষ না পাওয়াসম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে নারীরা থানায় অভিযোগ জানাতে আসেন। পুলিশ সমস্যা সমাধানে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।


আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে মুসলিম নারী-পুরুষের বিয়ে, বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারের মূল ভিত্তি শরিয়া আইন এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ–১৯৬১ অনুযায়ী এসব বিষয়ের ফয়সালা হয়ে থাকে। যেমন, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না। স্বামী যদি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেন এবং দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাঁর এক বছরের জেল বা দশ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ব্যারিস্টার ইমাম তারেক হাসান প্রথম আলোকে বলেন, শরীয়া আইনে একাধিক বিয়ের বিষয়টি কঠোর শর্তযুক্ত। দেশের আইনেও তাই। কেবল প্রথম স্ত্রীর মৌখিক অনুমতি হলেই কোনো ব্যক্তি একাধিক বিয়ে করতে পারবেন না। যিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তাঁকে সালিশি পরিষদের কাছে অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত বিবেচনায় নেওয়া হবে। যেমন, স্ত্রীর সন্তান না হওয়া, মারাত্মক শারীরিক দুর্বলতা, দাম্পত্য সম্পর্কে শারীরিক অযোগ্যতা ও মানসিক অসুস্থতা।


তবে ফেসবুকে বহুবিবাহের পক্ষে প্রচার চালানো দলটিতে এসব নিয়ে আলোচনা নেই। কেউ কেউ স্ত্রীকে না জানিয়ে বিয়ে করেছেন এবং ফেসবুকের এই পেজে এসে জানান দিয়েছেন। কেউ আবার দ্বিতীয় স্ত্রী খুঁজতে কোনো একটি জেলায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে গ্রুপের সদস্যদের জানিয়েছেন। কেউ বহুবিবাহের আয়োজক। বহুবিবাহের আয়োজন সম্পন্ন করে পেজে জানান দিয়েছেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবু সায়েম প্রথম আলোকে বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বায়তুল মোকাররম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে সরকারের উচিত, যাঁরা এমন প্রচার করছেন, তাঁদের সঙ্গে বসা এবং এ ধরনের প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া। তারপরও প্রচার চালালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের সময় মুসলিমদের সংখ্যা ছিল কম এবং যুদ্ধে প্রচুর পুরুষ শহীদ হন। তাঁদের বিধবা স্ত্রী ও কন্যাদের পুনর্বাসনের জন্য একাধিক বিয়ের প্রসঙ্গ আসে। সুরা নিসায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে, যদি সব ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারার শঙ্কা থাকে, তাহলে কোনো অবস্থায় একাধিক বিয়ে করা যাবে না। সব স্ত্রীর মধ্যে ন্যায্যতা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এর অর্থ ধর্মে প্রকারান্তরে একাধিক বিয়েকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে বহুবিবাহের পক্ষে প্রচার চালানো তাঁর মতে অন্যায়।

গবেষণা কী বলছে


২০১০ সালে মালয়েশিয়ায় সিস্টার্স ইন ইসলাম ও ২০১৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বহুবিবাহের শিকার পরিবারগুলোর ওপর গবেষণা হয়। মালয়েশিয়ায় পরিচালিত গবেষণায় অংশ নেওয়া ওই সব পরিবারের সন্তানেরা অভিযোগ করেছেন, নতুন বিয়ে করার পর তাঁদের বাবা তাঁদের অবহেলা করতে শুরু করেন।

এমনকি, বহুবিবাহের কারণে যাঁদের দশটির বেশি সন্তান রয়েছে, তাঁরা সন্তানদের ঠিকমতো চেনেন না। সন্তানেরা স্কুলের বেতন বা হাতখরচের টাকা চাইতে গেলে বাবা জানতে চান যে তাঁরা কোন স্ত্রীর সন্তান।


অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রানা রাদ্দাবি বহুবিবাহের শিকার ১০০ নারীর ওপর জরিপ চালান। সেসব নারীর বড় অংশই মানসিক চাপে থাকেন। শারীরিক অসুস্থতায়ও ভোগেন বেশি। অনেক সময় স্বামী সব স্ত্রীকে সমানভাবে টাকাপয়সা দেন না বা ঘরের কাজে সাহায্য করেন না। ফলে নারী আর্থিক সংকটেও ভোগেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন