default-image

কেউ কেউ নিম্নমানের কাগজ দিয়ে বই ছাপিয়েছেন। কারও কারও মুদ্রণ ও বাঁধাই খারাপ হয়েছে। কেউবা নির্ধারিত সময়ে বই ছাপিয়ে দিতে পারেননি। চলতি শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণে এ রকম নানা অনিয়মের জন্য ১৪টি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা প্রথম আলোকে বলেন, দরপত্র অনুযায়ী কাজ হয়নি বা ব্যত্যয় ঘটেছে, এমন কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ হয়তো এক বছরের মধ্যে এনসিটিবির কোনো কাজ করতে পারবে না, কেউ দুই বছর বা সারা জীবনের জন্য এনসিটিবির কাজ করতে পারবে না। কাউকে জরিমানা করা হবে। সতর্কও করা হবে।

এনসিটিবির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি এনসিটিবির বোর্ড সভায় এসব মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, মোট ১৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও ৪টি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তাদের শুধু সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ২২৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য বিনা মূল্যের বই ছাপা হয়েছে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৩৯৪টি। এবার প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দামে কাজ নিয়েছিলেন মুদ্রণকারীরা। এ জন্য আশঙ্কা করা হয়েছিল,

বিজ্ঞাপন

এবার নিম্নমানের কাগজে বই ছাপতে পারেন মুদ্রণকারীদের অনেকেই। বছরের শেষ সময়ে এসে এ রকম কিছু ঘটনা ধরাও পড়েছিল। এ জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে সাড়ে ৬ লাখের বেশি বই এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন কাগজ বাতিল করা হয়েছিল।

এনসিটিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঢাকার দক্ষিণ মাতুয়াইলের মেসার্স নিবেদিকা প্রেসের বিরুদ্ধে দুটি দোষ পেয়েছে এনসিটিবি। প্রথমত, তারা বই দিতে অস্বাভাবিক দেরি করেছে। আবার দরপত্র অনুযায়ী তারা যে সক্ষমতার কথা বলেছিল, সে অনুযায়ী বাস্তবে সক্ষমতা দেখা যায়নি। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় কাগজ কিনতে না পারায় এই দেরি হয়েছে।

বগুড়ার এস আর প্রিন্টিং প্রেস এবং সূত্রাপুরের টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস শিক্ষাবর্ষের সাড়ে তিন মাস পর বই দিতে পেরেছে।

এত দেরিতে বই দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা কীভাবে শুরুতে বই পেল, জানতে চাইলে এনসিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, আপৎকালীন মজুত থাকা (বাফার স্টক) বই থেকে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে।

কালো তালিকাভুক্ত হওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সূত্রাপুরের মেসার্স রেজা প্রিন্টার্স, মেসার্স মিলন প্রিন্টিং প্রেস, নিহাল অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, সিফাত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস, মিলেনিয়াম প্রিন্টার্স, খন্দকার মুদ্রণালয়, বাংলাবাজারের টাইমস প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস, গেন্ডারিয়ার মানিক প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস, নারিন্দার দি ইউনিক প্রিন্টার্স অ্যান্ড প্যাকেজার্স, শ্যামপুরের নাইমা আর্ট প্রেস ও রংপুর সদরের মেসার্স কমটেক কম্পিউটার অ্যান্ড প্রিন্টার্স। এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, কালো তালিকাভুক্ত হওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই ঠিক সময়ে বই না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কালো তালিকাভুক্ত সূত্রাপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আসলে করোনাকালে মুদ্রণ খাতের অনেক কর্মী এই কাজ ছেড়ে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে গেছেন। এ কারণে কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ থাকলেও কালো তালিকাভুক্ত না করে যে চারটি প্রতিষ্ঠানকে কেবল সতর্ক করা হয়েছে সেগুলো হলো মাতুয়াইলের অনুপম প্রিন্টার্স, শ্যামপুরের কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস, ঢাকার মেসার্স কমলা প্রিন্টার্স এবং চট্টগ্রামের সাগরিকা প্রিন্টার্স। এর মধ্যে ছাপার সময়েই দরপত্র অনুযায়ী না হওয়ায় রাজধানীর মাতুয়াইলের অনুপম প্রিন্টার্সের ৩০ টন হোয়াইট প্রিন্টিং পেপার বাতিল করা হয়েছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুদ্রণকারীদের এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, এনসিটিবির উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার নির্দেশে এই চারটি প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এনসিটিবি জানিয়েছে, সবকিছু পর্যালোচনা করে এই চার প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রতিবছর ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা সব বই পেলেও এবার সব শিক্ষার্থী প্রথম দিকে সব বই পায়নি। আর কাগজ কিনবে না এনসিটিবি আগামী বছরের জন্য প্রায় ৩৬ কোটি বই ছাপা হবে। এত দিন মাধ্যমিক পর্যায়ে কাগজের একটি অংশ এনসিটিবি কিনে মুদ্রণকারীদের দিত। আরেকটি অংশ মুদ্রণকারীরা কিনে ছাপাতেন। এতে একটা ভারসাম্য থাকত। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে এনসিটিবি আর কাগজ কিনবে না। মুদ্রণকারীরাই কাগজ কিনে বই ছাপাবেন।

বিজ্ঞাপন

এনসিটিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে, গত বছর প্রায় ১৪ হাজার মেট্রিক টন কাগজ কিনেছিল এনসিটিবি। এর মধ্যে উদ্বৃত্ত থাকা ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন কাগজ ছাপার কাজে ব্যবহার করা হবে। নতুন করে আর কোনো কাগজ কিনবে না এনসিটিবি।

এনসিটিবির সূত্রমতে, চলতি বছরের মাধ্যমিকের বই ছাপায় ব্যয় হয় প্রায় ৪৮৩ কোটি টাকা। আর আগামী বছরের মাধ্যমিকের বই ছাপার জন্য ৮০০ কোটি টাকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এ বছরের প্রাথমিকের বই ছাপায় খরচ হয়েছে ১৭৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। নতুন বছরে কত খরচ হবে, সেটি এখনো বলা যাবে না।

এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পাল প্রথম আলোকে বলেন, সব কাগজ মুদ্রণকারীদের মাধ্যমে কেনা হলে দুই ধরনের আশঙ্কা আছে। প্রথমত, কাগজের গুণমান খারাপের আশঙ্কা আছে। আবার ক্ষুদ্র মুদ্রণকারী যাঁরা মাধ্যমিকের বেশির ভাগ বই ছাপান, তাঁরা কাগজ কিনে বই ছাপার কাজ পাবেন না। তখন পুরো

কাজ কিছুসংখ্যক বড় মুদ্রণকারীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তাই সবকিছু বিবেচনা করে এনসিটিবির উচিত আগের মতো নির্ধারিত কিছুসংখ্যক কাগজ কিনে দেওয়া।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন