default-image

(স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে সর্বজ্যেষ্ঠ বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সদস্যদের নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন এবং সেটা অনুমোদনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে পাঠান। তিনি ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ২৭ মার্চ তাঁকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো নয় মাস পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে দফায় দফায় পৈশাচিক নির্যাতন করে।
২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ব্রিগেডিয়ার মজুমদার মারা যান। তাঁর নিজ হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি ও রেকর্ড করা বক্তব্য অবলম্বন করে তাঁর জবানিতেই সেই আক্রমণ পরিকল্পনার কথা চার কিস্তিতে সংক্ষেপে জানাচ্ছেন লুৎফুল হক। (আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় কিস্তি)

আমার কাছে খবর এল যে প্রায় ১০ হাজার টন অ্যামুনেশন নিয়ে এমভি সোয়াত চট্টগ্রাম পোর্টে আসছে, ডকিং করবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম পোর্টের শ্রমিক সমিতির সভাপতি মান্নান সাহেবকে ডাকলাম। উনাকে বললাম, ‘আপনি এই জাহাজ আনলোডিং করতে দিবেন না।’ উনি বললেন, ‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, যা লেবার আছে ওদেরকে সরিয়ে দিব।’ আমি যত দিন চট্টগ্রাম ছিলাম অর্থাৎ ২৪ মার্চ পর্যন্ত সোয়াত থেকে অ্যামিউনেশন আনলোড করতে দিইনি।
মার্চ মাসের ৫ তারিখ রাত প্রায় একটার সময় আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী আর মান্নান সাহেব আমার সাথে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে দেখা করলেন। মিটিংয়ের ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। আমি মিটিংয়ে বললাম যে বর্তমানে সামরিক বাহিনীতে আমাদের সংখ্যা ও শক্তি পশ্চিমাদের চেয়ে প্রায় আট-দশ গুণ বেশি। এই সময় যদি আমরা তাদেরকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করি তাহলে তাদের সহজেই নিরস্ত্র করতে সক্ষম হব। আমার কথা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী বুঝতে পারলেন। বললেন, ঢাকা গিয়ে শেখ সাহেবকে বিস্তারিত বলব। এরপর এল ৭ মার্চ। ভেবেছিলাম যে আমাদের আক্রমণের ইঙ্গিত দেওয়া হবে। আমি আশা করেছিলাম যে আমাকে ডাইরেক্টলি কিছু বলা হবে। সেই দিন বিকেল পর্যন্ত আমি ইউনিফর্ম পরে ছিলাম।
এমভি সোয়াত থেকে অস্ত্র আনলোড করার জন্য ঢাকা থেকে আমাকে বারবার চাপ দিতে থাকে। আমি ৭ মার্চের পর চট্টগ্রাম বন্দর অকেজো করে ফেলার পরিকল্পনা করি। ক্যাপ্টেন আমীনের মাধ্যমে আমি এম আর সিদ্দিকীর কাছে প্রস্তাব পাঠাই যে তিনি যেন তাঁর একটি জাহাজ মোহনার মুখে ডুবিয়ে দেন। এটা করলে বন্দরে জাহাজ ঢোকা ও বের হওয়া দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি এতে রাজি হন। পরে এ বিষয়ে আমিও এম আর সিদ্দিকীর সাথে কথা বলি।
২১ মার্চ ছিল রোববার, ছুটির দিন। হাঠাৎ টিক্কা খান আমাকে টেলিফোন করে বলল, ‘মজুমদার, চিফ আজকে চট্টগ্রাম সফরে যাবেন। তুমি তাকে প্যারেড গ্রাউন্ডে অভ্যর্থনা জানাবে।’ মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয় কিছু আছে। যাই হোক, বেলা ১১টার সময় আর্মি চিফ জেনারেল হামিদ এবং অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল খোদাদাদ খান হেলিকপ্টার থেকে বের হয়ে আমাকে বলল যে তারা বেলুচ রেজিমেন্টে যাবে। ওখানে গিয়ে দেখি চিফকে রিসিভ করার জন্য বেলুচিরা একেবারে রেডি। কর্নেল ফাতেমির অফিসে বসার আগেই খোদাদাদ আমাকে বলল, ‘মজুমদার তোমার সাথে আমার একটা বিশেষ কথা আছে, চলো আমরা অন্য কামরায় যাই।’
জেনারেল হামিদ কর্নেল ফাতেমির অফিস থেকে বের হয়ে সোজা নেভাল হেডকোয়ার্টার্সে গেল। নেভাল হেডকোয়ার্টার্সে গিয়েও দেখলাম কমোডর মমতাজ চিফকে রিসিভ করার জন্য রেডি আছেন। চিফকে নিয়ে তারা গেল অপারেশন রুমে আর খোদাদাদ আমাকে নিয়ে গেল কমোডর মমতাজের অফিসে। অপারেশন রুমে চিফ এবং কমোডর মমতাজ ১৫-২০ মিনিট আলোচনার পর বের হয়ে আসল। ক্যান্টনমেন্টে ফেরার পথে জেনারেল হামিদ বলল, ‘আমাকে নিয়ে চলো ৮ ইস্ট বেঙ্গলে।’ সেখানে জেনারেল হামিদ আমাদের থেকে সরে গিয়ে জাঞ্জুয়ার সঙ্গে কিছু একটা কানাকানি করল। দুপুরে ওরা চলে গেল ঢাকায়।
জেনারেল হামিদ ফিরে যাওয়ার পরপরই আমি এম আর সিদ্দিকী সাহেবকে ডেকে পাঠালাম। বললাম, ‘এখন আমার মনে কোনো সন্দেহ নাই যে তারা আমাদের বিরুদ্ধে বড় রকমের অ্যাকশন নিবে। আপনি এখনই ঢাকা যান। ঢাকা গিয়ে জেনারেল হামিদের ভিজিট এবং বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া ও কানাকানি করার বিষয়টি জানান। বঙ্গবন্ধুকে বলবেন যে আমি এক শত ভাগ নিশ্চিত যে তারা শিগগিরই আমাদের উপরে বড় রকমের আক্রমণ করবে। আমাদের এক্ষুণি কিছু করা উচিত, আর সময় নাই।’
এম আর সিদ্দিকী সাহেবকে বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকা গিয়ে প্রথমে ওসমানী সাহেবকে নিয়ে গেলেন শেখ সাহেবের বাসায়। উনি সব শুনে বললেন, ‘মজুমদারকে গিয়ে বলো শান্ত থাকতে। সিচুয়েশন আমার নিয়ন্ত্রণে আছে। যখন প্রয়োজন হবে আমি তাকে ইঙ্গিত দিব।’ ওসমানী সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কীভাবে তাকে আপনি ইঙ্গিত দিবেন?’ শেখ সাহেব বললেন, ‘ঢাকা রেডিওর বাংলা সম্প্রচার যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বুঝবে যে আমাদের সংলাপ ভেঙে গেছে।’ ‘আর্মি অফিসারকে ইঙ্গিত দেওয়ার এটা নিয়ম না। আপনি কোনো বিশেষ সংকেত বলে দেন, যেটা উনাকে জানাতে হবে।’ তখন উনি বললেন, ‘আমার মেসেজ টেপ রেকর্ড করে রাখব। একটা রেকর্ড ইপিআরকে দিব, আরেকটা কপি জহুর আহমেদ চৌধুরীকে দিব। সেটা পেলে তার পরে তারা অ্যাকশনে যাবে।’
২১ তারিখ মাগরিবের পর জিয়াউর রহমান আমার বাসায় আসল। বললাম, ‘আমার কোনো সন্দেহ নাই যে এরা শিগগিরই আমাদের ওপরে আক্রমণ করবে। আমাকে তো ওরা সার্ভিলেন্সে রেখেছে। আমাকে হয়তো ধরে নিয়ে যাবে। দায়িত্বটা তো নিতে হবে কর্নেল এম আর চৌধুরী এবং তোমাকে।’ জিয়াউর রহমান আমাকে বলল, ‘মনে হয় অবস্থা খুব সিরিয়াস। আমাদের একটা কিছু করতে হবে।’ আমি তাকে বললাম, ‘বঙ্গবন্ধুর অনুমতি ছাড়া কিছু করতে যাওয়া ঠিক হবে না। দেশের লোক এইটাকে ভুল বুঝবে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন