বইটি নিয়ে আলোচনাকালে অধ্যাপক রেহমান সোবহান পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাযুদ্ধের আগপর্যন্ত কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন, তা তুলে ধরেন। রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে ব্যাংক থেকে শুরু করে বিমা, ব্যবসা, বাণিজ্য, কোম্পানি, এমনকি বায়তুল মোকাররমের বড় দোকানগুলো অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে ছিল। তাঁরা এসব ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অর্থনীতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। তখন জাসদের মতো রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখে। এ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু দেশ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনাগুলোর সবটা বাস্তবায়ন করতে পারছিলেন না।

রেহমান সোবহান বলেন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের এই ফারাকের কারণে অনেকে বঙ্গবন্ধুকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু তাঁকে ওই বিশেষ পরিস্থিতির আলোকে বিবেচনা করতে হবে।

default-image

রওনক জাহান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। কিন্তু কোনো বইতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করতে দেখি না। তাই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের তাঁর আত্মজীবনীমূলক তিনটি বইয়ের ওপরই ভরসা করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এই বইয়েও বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডকে বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে আংশিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুর একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ লেখা দরকার, যেখানে রাজনৈতিক নেতা এবং একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সামগ্রিক ভূমিকা পর্যালোচনাসহ উপস্থাপিত হবে।’

রওনক জাহান উল্লেখ করেন, তিনি রেহমান সোবহানের মতো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরাসরি কাজ করেননি। তবে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি বইয়ের মধ্যে শোষণ ও বঞ্চনার বিষয়টিগুলো বারে বারে আসতে দেখি। কিন্তু এখন আমরা দেশের বিভিন্ন স্তরের আলোচনায় শুধু উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে দেখি।’

বঙ্গবন্ধুকে জাতীয়তাবাদী হিসেবে উল্লেখ করে রওনক জাহান বলেন, তিনি স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে মুক্তির কথা বলেছেন। বাক্‌স্বাধীনতার কথা বলেছেন। গণতন্ত্র আর নির্বাচনের কথা বলেছেন।

default-image

বইটি নিয়ে আলোচনাকালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, বঙ্গবন্ধুকে অনেকে জননেতা মানতে রাজি থাকেন। কিন্তু লেনিন বা মাও সে–তুংয়ের মতো তাত্ত্বিক হিসেবে মানতে নারাজ। এটা ঠিক নয়। কারণ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আলোকে গণতন্ত্র ও সমাজকে সাজাতে চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের আলোচনায় প্রকৃতি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।’

default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, বঙ্গবন্ধু বাকশালের মাধ্যমে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের সমন্বয়ে দেশ পরিচালনা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা ছিল তাঁর। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য ছিল না। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস ও মানুষের উপযোগী একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বঙ্গবন্ধু ’৭৪ সালে একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তা ছিল একটি স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচকদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন, ড. হামিদা হোসেন, খালেদ শামস, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, তৌহিদ হোসেন, মনজুর আহমেদ, আহরার আহমেদ, পংকজ ভট্টাচার্য্য, মাহ্ফুজ আনাম, আবুল খায়ের, বদিউল আলম মজুমদার, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ইফতেখারুজ্জামান, মালেকা বেগম, শাহীন আনাম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, লুভা নাহিদ চৌধুরী, নবনীতা চৌধুরী প্রমুখ।

মতিউর রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর দেশের কোন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা আমাদের আরও ভালোমতো জানতে হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল, তা বুঝতে হবে।’

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: ফিলোসফি, পলিটিকস অ্যান্ড পলিসিস বইটিতে বঙ্গবন্ধুর দর্শন, রাজনীতি ও নীতি প্রণয়নের রূপরেখা আলোচিত হয়েছে। লেখকেরা বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা থেকে নির্বাচিত অংশ এবং তাঁর সঙ্গে নিজেদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে বইটি লিখেছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন