default-image

১.
বদলায়নি চিরচেনা ঢাকা, আছে আগের মতোই। শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টিতে এখনো হাঁটুপানি জমে জলাবদ্ধ হয় গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। এখনো উল্টো পথে ছুটে চলে রিকশা, সিএনজিচারিত অটোরিকশা কিংবা মোটরবাইক! বৃষ্টি নামলে সৃষ্টি হয় জ্যাম। অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিসর্জন দিতে হয় মূল্যবান সময়। করোনার মধ্য দিয়ে মানুষের অবিরাম ছুটে চলা যেন জীবনের গতিময়তাকেই নির্দেশ করে। জীবন থেমে থাকে না। আর কত সময় ধরে ঘরে আবদ্ধ রবে মানুষ? অপরের সাহায্য প্রার্থনা কিংবা মজুত সঞ্চয় ভেঙে আর কত চলবে মানুষ? তাই তো করোনাকে পাশে রেখে, বুকে অসীম সাহস নিয়ে সাধারণ জনগণ জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

২. 
চার মাস ধরে চলছে করোনা সংক্রমণ। লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টিন, নিয়মিত মাস্ক পরিধান, স্যানিটাইজার কিংবা সামাজিক দূরত্ব—এই শব্দগুলো দেশের একটি বিরাট জনসাধারণের কাছে অপরিচিত থাকলেও এখন এগুলোই নতুন স্বাভাবিকতা। এই চার মাসে পাল্টে গেছে জীবনচিত্র; বদলে গেছে অনেক কিছুই। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে সবাই কিছু না কিছু হারিয়েছেন। কেউ আত্মীয়স্বজন হারিয়েছেন, কেউবা চাকরি, কেউ আবার নিজেই শিকার হয়েছেন মরণব্যাধি করোনার। প্রত্যেকের জীবনেই এসেছে পরিবর্তন। শুধু ঢাকায় কোনো পরিবর্তন আসেনি! ঢাকায় পা ফেলতে তেমনটাই মনে হলো। ব্যস্ত নগরী চার মাসের একটু অবসর পেয়েছিল মাত্র। ক্লান্তিকর সময়টুকু যে খুব বেশি ভালো কেটেছিল তাও কিন্তু না। অ্যাম্বুলেন্স, সাইরেন, জরুরি অবস্থা, স্বজনদের আহাজারিতে প্রকম্পিত হয়েছে প্রতিটি অলিগলি। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ চলছে এখনো। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা যেমন একটা সময় গিয়ে প্রশমিত হয়, উভয় পক্ষ যেমন বুঝতে পারে নিজের ও শত্রুপক্ষের অবস্থান, সে হিসাবে পদক্ষেপ নেয়, তেমনই প্রশমিত হচ্ছে করোনার সঙ্গে জনসাধারণের বোঝাপড়া। তারা বুঝতে পেরেছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এসে আঘাত করতে পারে এবং সেটি বাকি সবকিছুর মতোই স্বাভাবিক। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তাই মানুষ আগের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করার চেষ্টা করছে। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন; হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক, আর কিছুক্ষণ পরপর স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করছে, এ যেন করোনার বিরুদ্ধে এবং নিজের সঙ্গে নিজের একধরনের মানসিক চুক্তি!

default-image

৩. 
মাইক্রোবাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছি সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য। রামপুরা ব্রিজের ওপর। গন্তব্য গ্রিন রোডে বন্ধুর বাসা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। হাতে ছাতা নেই, তাই ভিজতে হচ্ছে। অনেকগুলো অটোরিকশাচালককে ইশারা করেও কিছু হলো না। শেষে স্থান পরিবর্তন করতে একটা জোগাড় হলো, কিন্তু ভাড়া শতকরা ২০ ভাগ বেশি। করোনার ভয়, কি জানি কি হয়, তাই বচসা না করে উঠলাম অটোরিকশায়। হাতিরঝিল পার হয়ে কারওয়ান বাজার-মালিবাগ সড়কে আসতেই পড়তে হলো জ্যামে। আহা, কত দিন পর ঢাকা স্বাভাবিক হলো! এমনটা মনে হলেও বিরক্ত হচ্ছিলাম যখন এর মাত্রা ক্ষণে ক্ষণে বেড়েই চলছিল। সার্ক ফোয়ারা মোড়ে বসে ছিলাম টানা ১৫ মিনিট; ইতিমধ্যে একজন চালক তাঁর অটোরিকশার অকার্যকর চাকা বদলেও ফেলেছেন। পাশেই একটা কালো পাজেরো দাঁড়িয়ে ছিল। একজন ভিক্ষুক এসে কালো গ্লাসে টোকা দিচ্ছিল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় ‘বাবা, একটু দয়া করো’, বলে আমার দিকে ফিরতেই মাথা নাড়িয়ে ‘না’ করে দিলাম, সে চলে গেল। এই শহরের অন্যতম প্রধান উপাদান ভিক্ষুক। করোনায় অর্থনীতি ধসে সে সংখ্যা কি বাড়বে? প্রান্তিক মানুষেরা কি ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় শহরে ভিড় করবে? কে জানে? কিছুক্ষণ পর সিগন্যালের সবুজ বাতি জ্বলে উঠল, গন্তব্যে যেতে আর অল্প কিছু সময়।

৪. 
গ্রিন রোডে পৌঁছাতেই একটা পরিচিত দৃশ্য নজরে এল। গ্রিন লাইফ হাসপাতালের সামনে ১০০ মিটার রাস্তাজুড়ে পানি জমে। একটু ভারী বর্ষণেই এই অবস্থা হয়। টানা তিন বছর বর্ষাকালে এই দুর্ভোগের শিকার ছিলাম। কিন্তু অনেক দিন পরে আজ দেখা পেয়ে আনন্দিত হলাম। ভাবতেই পারেন এ আবার কেমন আনন্দ? এ এক বীভৎস আনন্দ! পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল; প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে জলাবদ্ধ এই ১০০ মিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে সকাল আটটায় ঘুমকাতুর চোখে ক্লাস ধরতাম। সায়েন্স ল্যাবের জ্যামে আটকে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসে গিয়ে চড়তে হতো। সেসব পুরোনো স্মৃতি হাতড়াতেই মনে পড়ে গেল একটি ঘটনা। একবার আমি আর আমার এক বন্ধু মিলে এমন করে রাস্তা পার হচ্ছিলাম। দুজনের হাতই ব্যস্ত; এক হাতে ছাতা, অপর হাতে জুতা, কাঁধে ব্যাগ, হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটানো। ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছি।

পানির নিচে রাস্তা কেমন, সেটা তখনো আমাদের আয়ত্তে আসেনি। হাঁটছি তো হাঁটছি, হঠাৎ আমার বন্ধুর পা পিছলে যায়। একটা খাদে পড়ে ওর একটি পা ভারসাম্য হারায়, বন্ধু আমার এই ময়লা পানিতে তার সর্বস্ব নিয়ে ধপাস! চারদিকে প্রাণিকুলের সব জীবের সময়ের কাঁটা তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায়; কতিপয় কাক ময়লার ভাগাড়ের ওপর থেকে তিরস্কারের হাসি হাসে। মুহূর্তেই হাসির রোল ফেটে পড়ে চারদিকে। একজন রিকশামামা ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেন। আমিও হো হো করে উচ্চ স্বরে হেসে উঠি। মনে পড়ে, শুধু আমার হাসির জন্যই আমার সে বন্ধু আমার সঙ্গে পুরো এক সপ্তাহ কথা বলেনি। আচ্ছা আপনারাই বলেন, সে মুহূর্তে আপনি আপনার বন্ধুর এহেন দুর্দশায় না হেসে পারতেন? যা–ই হোক, আমি এখন এই বিপদাপন্ন সময় সেই বন্ধুর বাসাতেই এসে উঠেছি।

৫. 
ঢাকায় আসা মূলত বাসা বদলের জন্য। এই করোনা পরিস্থিতিতে এই নিয়ে মোট দুবার বাসা বদলাতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে বন্ধুর ফোন পেলাম। বাসা ছেড়ে দিচ্ছে অনেকেই। কারণ, বাড়িভাড়া সাধ্যের বাইরে। ভাড়া কমাতে রাজি হচ্ছেন না বাড়িওয়ালা। সাথের অনেকেই বাসা ছেড়ে দেওয়ায় এখন সবার ভাড়ার গড় বর্ধিত অংশের চাপ কতিপয়ের ওপর পড়ছে, যা ব্যয় বহনের অসাধ্য। জীবনের একটা লম্বা সময় ধরে যাঁরা ঢাকায় বসবাস করেন, তাঁদের জন্য ঢাকা প্রাণের শহর। আর আমরা যাঁরা গ্রাম বা মফস্বল থেকে অল্প সময়ের জন্য এসেছি, তাদের জন্য এটি স্বপ্নপুরী। এ শহরে হাজার মানুষের ভিড়ে আমাদেরও কিছু স্বপ্ন থাকে, চাওয়া থাকে; কতটুকু পেয়ে থাকি, সে হিসাব কখনো মিলিয়ে দেখিনি। তবে সে চাওয়া-পাওয়া সব সময় পূর্ণতা পায় না। গত জুন মাসে পূর্ববর্তী ভাড়া বাসার মালিক ফোন করে জানালেন, বাসা ছেড়ে দিতে হবে। তাড়াহুড়ো করে ঢাকায় এলাম। বাসার জিনিসপত্র নিয়ে তুললাম এই বন্ধুর বাসায়। করোনা থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ফিরে গেলাম গ্রামে। এখন আবার বাসা ছেড়ে দিচ্ছি। তবে এবারের গন্তব্য গ্রাম, নিজের স্থায়ী বাসা। আবার কখনো পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তবেই আসা হবে এই স্বপ্নপুরীতে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকট শুধু মধ্যবিত্তরাই বোঝে। এই নতুন সংকটে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা বর্ণনাতীত। পড়ালেখা কিংবা চাকরির সন্ধানে স্বপ্ন নিয়ে ভিড় জমানো এমন হাজারো মধ্যবিত্ত প্রতিদিন শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। মাসান্তে সেই সংখ্যা আরও বাড়ে বই কমে না। এই গল্পগুলো লেখা হচ্ছে কখনো অশ্রু দিয়ে, কখনো মৃত্যু দিয়ে, কখনোবা রক্ত পানি করা ঘাম দিয়ে। এই সমাজে মধ্যবিত্তের যেন কেউ নেই!

*লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন