লাঠিটিলার জৈব-ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য

ভারতের ত্রিপুরায় ধনুকাকৃতির বারামুরা-আথারামুরা-লংথারাই-উনকোটি পার্বত্য এলাকার সবচেয়ে উত্তরে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বনভূমি। এসব বন ঔপনিবেশিক যুগ থেকে সুরক্ষিত এবং ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পটের পশ্চিম প্রান্তের অন্তর্ভুক্ত। পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্ট (পিএইচআরএফ, এলাকা ৮০ বর্গকিলোমিটার) সবচেয়ে উত্তরের একটি এলাকা, যার সীমান্তে লাঠিটিলা বন (২২ বর্গ কিলোমিটার)। পিএইচআরএফ ঢাকা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার ও মৌলভীবাজারের জুড়ী শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। পিএইচআরএফের পূর্ব সীমানা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যসংলগ্ন। পুরো পিএইচআরএফ টিলা (সর্বোচ্চ উচ্চতা ৭০ মিটার), পানিপ্রবাহ ও জলাশয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ফলে বনে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত বেশি। সংরক্ষিত বনটি আপার টারশিয়ারি শিলার ওপর দাঁড়িয়ে। উত্তর-পূর্ব সীমান্তের পাহাড়ে চুনাপাথরের উপাদান পাওয়া যায়। পিএইচআরএফের মাটি অত্যন্ত অম্লীয়। এ বৈশিষ্ট্যের ফলে সেখানে দেশের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় সাইট্রাস ফলের বাগান রয়েছে।

default-image

বন্য প্রাণীর ওপর বিদ্যমান গবেষণা

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চলে সাধারণত কম প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে বলে ধারণা করা হয়। তবে এ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশে বেঙ্গল টাইগারকে ৪৫টি পিয়ার রিভিউ প্রকাশনায় গবেষণার বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের ২৮টি শিকারি প্রাণীর মধ্যে ১৪টি কোনো পিয়ার রিভিউতে স্থান পায়নি। তবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব বনাঞ্চলে ৩৬টি ভিন্ন পরিবারের ১২৬টি স্থলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর তথ্য মিলেছে। গত দুই বছরে এ অঞ্চলে ব্যাঙের দুটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে ক্যামেরায় ছোট নখযুক্ত ভোঁদড় (বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিতে) ধরা পড়েছে। ঢোল বা বন্য কুকুর (বিশ্বব্যাপী বিপন্ন) এবং কালো ভালুক, সোনালি বিড়াল ও হগ ব্যাজার নামের এক প্রজাতির শূকরের (বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিতে থাকা এই তিন প্রজাতি) উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিতে থাকা অর্ধডজন শিকারি প্রাণী (ঢোল, ভালুক, ক্লাউডেড চিতা ইত্যাদি প্রজাতি) থাকা একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যার ওপর কোনো প্রাসঙ্গিক গবেষণা হয়নি। যদিও সুন্দরবন বাঘের কারণে যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তবে গবেষণা হয়েছে খুব কমই। তথ্য-উপাত্তের অভাব ও সচেতনতা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণায় বিনিয়োগের ঘাটতির ফলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে। এসব বনকে ‘বন্য প্রাণীশূন্য’ বলে মনে করা হয়। এ ধারণা এ অঞ্চলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও আঞ্চলিক নীতিতে প্রভাব ফেলছে।

সাফারি পার্ক কী

১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের লংলেটে উন্মুক্ত স্থানে বেষ্টনীর ভেতর সিংহ রাখার মাধ্যমে প্রথম সাফারি পার্কের ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাপী সাফারি পার্কে খোলা জায়গায় প্রাণী রাখা হয়। সেখানে অ্যাকুয়ারিয়াম, উদ্যান, পাখিশালা ও সরীসৃপ ঘর থাকতে পারে। এরপর সাফারি পার্কের ধারণা বিবর্তিত হয়েছে। সাফারি পার্ককে বন্য প্রাণীদের উদ্যান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা গতানুগতিক চিড়িয়াখানার চেয়ে বড়। সাফারি পার্ক শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়। এতে প্রাণীদের খুব কাছ থেকে দেখা যায়। আধুনিক অনেক সাফারি পার্ক প্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর ৭ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার জু সাফারি পার্ক বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর প্রজননে কাজ করে।

default-image

চিড়িয়াখানা ও অ্যাকুয়ারিয়াম নিয়ে কাজ করা ইউরোপীয় অ্যাসোসিয়েশন অব জুস অ্যান্ড অ্যাকুরিয়া (ইএজেডএ) ও ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব জুস অ্যান্ড অ্যাকুয়ারিয়ামের (ডব্লিউএজেডএ) সদস্য নয় বাংলাদেশের কোনো সাফারি পার্ক বা চিড়িয়াখানা। পাকিস্তানের করাচি সাফারি কনজারভেশন পার্ক (আয়তন শূন্য দশমিক ৬০ বর্গ কিলোমিটার) ও লাহোর জু সাফারি (আয়তন শূন্য দশমিক ৯৮ বর্গ কিলোমিটার) রয়েছে। সে দেশে আর কোনো সাফারি পার্ক নেই। ভারতীয় উপমহাদেশের ১১টি সাফারি পার্ক ডব্লিউএজেডএর সদস্য। এর মধ্যে ভারতে নয়টি, শ্রীলঙ্কায় একটি ও নেপালে একটি।

সাধারণত, সাফারি পার্ককে চিড়িয়াখানার বর্ধিত সংজ্ঞায় ফেলা হয়, যাতে বাইরে থেকে প্রাণী এনে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। তবে সংরক্ষিত এলাকার শ্রেণিবিন্যাসের যে সংজ্ঞা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) দিয়েছে, তাতে সাফারি পার্ক পড়ে না। আফ্রিকা ও এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনের অনেকগুলো আইইউসিএনের সুরক্ষিত প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ ক্যাটাগরিতে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক ও ভারতের কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্ক এমন ক্যাটাগরিতে পড়ে।

বাংলাদেশে সাফারি পার্ক

বাংলাদেশ বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের (২০১২) ১৯ ধারা অনুসারে, প্রজনন ও খোলামেলা বিচরণের জন্য দেশি-বিদেশি বন্য প্রাণীদের যে প্রাকৃতিক পরিবেশে সুরক্ষিত রাখা হয়, সেটাকে সাফারি পার্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দেশে দুটি সাফারি পার্ক রয়েছে—কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক (বিএসএমএসপিসি, আয়তন ৯ বর্গকিলোমিটার) ও গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক (বিএসএমএসপিজি, আয়তন ১৫ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার)। এই দুটি সাফারি পার্ক পতিত বনভূমিতে করা হয়েছে এবং এর ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে শহর রয়েছে।

দুটি পার্কে সিংহ, বাঘ, কুমির, ভালুক, বানর, হরিণ ও দেশি-বিদেশি পাখির মতো প্রাণী আছে। পার্কের মূল এলাকায় (প্রায় পাঁচ কিলোমিটার আয়তন) মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীর বসবাস। বিএসএমএসপিসি ও বিএসএমএসপিজির মূল এলাকায় গাড়িতে পর্যটন পরিষেবা দেওয়া হয়।

বন্দী পরিবেশে রোগের ঝুঁকি

বন্দী পরিবেশে দেশি-বিদেশি বন্য প্রাণী রাখায় সাফারি পার্কে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। নয়টি পিয়ার-রিভিউ গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিএসএমএসপিসি ও বিএসএমএসপিজির পশুপাখিতে রোগজীবাণুর সংক্রমণ ও লাঠিটিলায় প্রস্তাবিত সাফারি পার্ক এলাকায় থাকা বন্য প্রাণীর মধ্যে সংক্রামক রোগজীবাণু নিয়ে গবেষণা করেছে। এতে বলা হয়েছে, আমাজন তোতা, মান্দারিন হাঁস ও কালো রাজহাঁসের নমুনায় অ্যাডেনোভাইরাস ও এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পজিটিভ পাওয়া গেছে। এটি শীতে বেশি ছড়ায়। গবেষণায় কক্সবাজার সাফারি পার্কের পুরুষ নীল নু-হরিণের শরীরে জলাতঙ্ক শনাক্ত হয়। বন্দী পরিবেশে প্রাণীদের দেহে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর করা এশেরিকিয়া কোলাই শনাক্ত হয়েছে। এটি প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এক গবেষণায় কক্সবাজারের সাফারি পার্কে শিকারি প্রাণীর ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশের পাকস্থলীতে পরজীবী সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এ ছাড়া ক্যাপিলারিয়া এসপিপি, জুনোটিক নেমাটোডো পাওয়া গেছে, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। সেখানে প্রাণীদের টক্সোকারা এসপিপি শনাক্ত হয়েছে, যা মানুষের শরীরে ক্ষত (বিশেষ র‌্যাশ) ও অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।

default-image

গাদাগাদি করে রাখা এবং মুক্তবিচরণকারী প্রাণী ও পাখির মধ্যে থাকা পরজীবী অন্য প্রাণীদের মধ্যে ছড়ায়। এসব পরজীবীর ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে গবেষণা খুব কম। বন্য প্রাণী জুনোটিক রোগের আঁতুড়ঘর, যেখানে প্রাকৃতিক বা মানুষের কর্মকাণ্ডে রোগের বিস্তৃতি ঘটতে পারে। ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির মধ্যে গাজীপুরের সাফারি পার্কে অ্যানথ্রাক্সে দুই সপ্তাহের মধ্যে ১১টি জেব্রা, ১টি বাঘ ও ১টি সিংহ মারা যায়। সাফারি পার্কের নকশার কারণে বন্দী বন্য প্রাণী থেকে স্থানীয় মুক্ত বন্য প্রাণীতে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি।

প্রস্তাবিত পার্ক

প্রস্তাবিত সাফারি পার্কে লাঠিটিলার বন বদলে যাবে। এর আওতায় রেস্ট হাউস, একটি মহাসড়ক ও পার্কের কর্মীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবনসহ ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পার্কটির আয়তন আনুমানিক ২২ বর্গকিলোমিটার। প্রস্তাবে মূল এলাকা (শূন্য দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার), পর্যটনবান্ধব ইকোভিলেজ (২ দশমিক ৮১ বর্গকিলোমিটার), প্রদর্শনার্থে সাফারি কিংডম (শূন্য দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার) ও বনঘেরা পার্ক (১৮ বর্গকিলোমিটার) স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পার্কের মূল অংশে সিংহ, বাঘ, হায়েনা, চিতা, চিতা (পি পারডাস), জাগুয়ার, এশীয় প্রজাতির হাতি ও আফ্রিকান তৃণভোজী প্রাণী থাকবে। পার্কটির শূন্য দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাইরের পাখিদের বাসস্থান (পাখিশালা), বাগান, ডলফিনের অভয়াশ্রম, সামুদ্রিক অ্যাকুয়ারিয়াম প্রদর্শনী ও একটি কার্প পুকুর খননের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিইটিএস হাতিশালা নির্মাণের প্রস্তাব করেছে। লাঠিটিলা বনের বাকি অংশে পর্যটকদের হেঁটে চলার ব্যবস্থা করাসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণাগার তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতিনির্ভর জনগোষ্ঠী যাতে অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, সেই কথা চিন্তা করেই সংরক্ষণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

default-image

তবে দেশে কোনো সাফারি পার্কে সংরক্ষণ মডেল ব্যবহার করা হয় না। বিইটিএস অনেক অবকাঠামোর মধ্যে একটি সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির অ্যাকুয়ারিয়াম এবং একটি ডলফিন অভয়াশ্রম করার প্রস্তাব করেছে। এগুলো মিশ্র চিরসবুজ বন ও নদীর পাশের বাস্তুসংস্থানে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া কই কার্প (গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়ায় পরিচিত ক্ষতিকর প্রজাতির শৌখিন মাছ) পুকুরে ছাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো সাফারি পার্ক এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও জীববৈচিত্র্যের হটস্পটের কাছাকাছি নির্মিত হয়নি। প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আরও বেশি উপযোগী, দেশে এমন জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ও আইইউসিএন স্বীকৃত সুরক্ষিত এলাকা রয়েছে। সুতরাং বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পর্যটন-সম্পর্কিত বিইটিএসের নেওয়া পরিকল্পনা অস্পষ্ট ও অবৈজ্ঞানিক।

বিইটিএসের প্রতিবেদনে এশিয়া অঞ্চলের কালো ভালুক, ভারতীয় প্রজাতির কুমির, এশীয় হরিণ (সাম্বার), নীলগাই, এশীয় হরিণের (হগ), গৌর (গরুজাতীয় প্রাণী) ও শকুনের জন্য ক্যাপটিভ প্রজনন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। ভারতের ওডিশার সিমিলিপাল টাইগার রিজার্ভে ভারতীয় প্রজাতির কুমিরের প্রজননের জন্য ১ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের অবকাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশে আগে বন্দী অবস্থায় ভারতীয় প্রজাতির কুমিরের বংশবৃদ্ধির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। আসলে ক্যাপটিভ প্রজনন কর্মসূচির জন্য দক্ষতার পাশাপাশি বিস্তৃত এলাকা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ধরনের ক্যাপটিভ প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনা জন্য দেশে পর্যাপ্ত দক্ষতা, অবকাঠামো বা আর্থিক বরাদ্দ নেই। সুতরাং প্রস্তাবিত এলাকার মধ্যে ক্যাপটিভ প্রজনন অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনা অবাস্তব।
প্রস্তাবিত পার্ক নির্মাণে বাজেট ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। তিন বছরে এ অর্থ ব্যয় হবে। পার্ক চালু হলে দর্শনার্থীদের জন্য দিনে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা খোলা থাকবে। মাথাপিছু প্রবেশমূল্য ধরা হবে এক মার্কিন ডলারের কম। এতে বছরে প্রায় ১০ লাখ দর্শনার্থী আসতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ হিসাবে বছরে সাড়ে ১৭ লাখ মার্কিন ডলার আয় হতে পারে। এই আনুমানিক আয়ের ভিত্তিতে পার্কটি লাভজনক হতে এক শতাব্দীর বেশি সময় লাগবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চারটি সাফারি পার্ক ও ভারতের একটি প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে এ সাফারি পার্কের নকশা করা হচ্ছে। ভারতের হায়দরাবাদ জুয়োলজিক্যাল পার্ক, সাফারি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকক, জুরং বার্ড পার্ক ইত্যাদি সাফারি পার্ক রয়েছে। এসব পার্ক তুলনামূলক পর্যটক গন্তব্যের কাছাকাছি অবস্থিত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সীমানা ও সুরক্ষিত অঞ্চল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। এই মডেলের সাফারি পার্ক মূলত চিড়িয়াখানা ও থিম পার্ক। এগুলো থেকে বছরে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় হয়।

তামাং সাফারি ইন্দোনেশিয়া, বালি সাফারি ও মেরিন মার্ক, সাফারি ওয়ার্ল্ডওয়াইড ব্যাংকক নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। পর্যটকদের ছবি তোলার সুবিধার্থে শিকারি প্রাণীগুলোকে ঘুমপাড়ানি ওষুধ প্রয়োগের মতো বিষয় এসব বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। এ ছাড়া বন্য প্রাণীকে এখানে বেশ প্রতিকূল পরিবেশে রাখা হয়। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সাফারি পার্ক বা চিড়িয়াখানা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সহায়ক নয়। সাফারি পার্ক ও সাফারি মৌলিকভাবে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। সাফারি পার্ককে লাভজনক বা নৈতিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তবে এ জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইএজেডএ ও ডব্লিউএজেডএর মতো সংস্থার অধীন নজরদারি থাকতে হবে।

প্রস্তাবিত পার্কের সম্ভাব্যতা যাচাই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা

বিইটিএস লাঠিটিলা বনের ফুল-প্রাণী নিয়ে জরিপ করেছে। তবে জরিপ প্রতিবেদনটি অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ। মাত্র দুই মাসে মাঠপর্যায়ে দুবার গিয়ে এ জরিপ করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সীমিত জায়গায় জরিপ চালানো হয়। ক্যামেরা ব্যবহার করে সেখানকার বন্য প্রাণীদের পায়ের ছাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে সমন্বয় ও জরিপের জায়গার পরিধি সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।
বিইটিএস জানায়, জরিপে ১০টি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কত দিন বা বনের কোন জায়গায় ক্যামেরা বসানো হয়েছে, তার উল্লেখ নেই। ঠিক কোন প্রক্রিয়া মেনে লাঠিটিলায় ক্যামেরা ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ ও জরিপ চালানো হয়েছে, প্রতিবেদনে তা-ও স্পষ্ট নয়। এসব তথ্য ছাড়া বনের জীববৈচিত্র্যের ঘনত্ব কিংবা প্রাচুর্য অনুমান করা সম্ভব নয়। একইভাবে কতজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, ক্যামেরায় কী পরিমাণ বন্য প্রাণীর পায়ের ছাপ ধরা পড়েছে—সেসব তথ্য-উপাত্ত নেই। জরিপ প্রতিবেদনের তালিকায় ভুল লেবেলযুক্ত কিছু প্রজাতির নাম দেখা গেছে। এতে জরিপকারী ব্যক্তিদের মনোযোগে ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে।

লাঠিটিলা বনের জীববৈচিত্র্য

প্রস্তাবিত সাফারি পার্ক লাঠিটিলা বনকে পিএইচআরএফ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। কারণ, পার্কের সীমানাপ্রাচীর, বেষ্টনী নির্মাণ করতে হবে। এ পার্কে বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা কচ্ছপ, কিং কোবরা, বার্মিজ অজগর, সাদা লেজের শকুন, ভারতীয় ইগল, চীনা প্যাঙ্গোলিন, বেঙ্গল স্লো লরিস, কালো মুখের লেঙ্গুর, চিতা, সাম্বার হরিণ ইত্যাদি প্রাণী থাকবে। লাঠিটিলায় বিলুপ্তপ্রায় ২৬ প্রজাতির প্রাণী আগে থেকেই আছে। এর মধ্যে ১৩টি ঝুঁকির মুখে, ৪টি বিপন্ন ও আরও ৩টি বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে।
সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশীয় হাতি ও হুলক গিবনসের (এক প্রজাতির বানর) বসবাসের জন্য বনের যথেষ্ট বিস্তৃতি ও গভীরতা প্রয়োজন। তাই সাফারি পার্ক করতে গিয়ে লাঠিটিলা বন ও পিএইচআরএফকে বিচ্ছিন্ন করা হলে এসব বন্য প্রাণীর অবাধ চলাচলের পথ ব্যাহত হতে পারে।

default-image

লাঠিটিলা বন ও বৃহত্তর পিএইচআরএফ সংরক্ষণের গুরুত্ব

অনেক সময় অন্যান্য বনাঞ্চল থেকে ঘুরতে ঘুরতে বাঘ লাঠিটিলায় আসে। তাই এ বনে বাঘ নিয়ে জরিপ ও বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের অরুণাচল ও মিজোরাম, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল এবং মিয়ানমারের আরাকান পাহাড় নিয়ে গঠিত মানাস-নামধাপার একটি অংশ লাঠিটিলা বন ও পিএইচআরএফ। বাঘ সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও জরিপের জন্য এ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাঘ যাতে অবাধ চলাচল করতে পারে, সে জন্য মানুষের চলাচল সীমিত করাকে মূলত অগ্রাধিকারমূলক ভূখণ্ড বোঝাচ্ছে। এটি একটি বিশাল এলাকা, এখানে অন্তত পাঁচটি বাঘ থাকতে পারে। তবে দেশের পূর্বাঞ্চলের বনের বাঘ নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। শুধু বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল নয়, সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অংশের বনেও এ নিয়ে গবেষণা অপ্রতুল।


আন্তসীমান্ত এলিফ্যান্ট করিডর

এই বন উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশ ও ভারতের দক্ষিণ আসামের হাতির চলাচলের একমাত্র সচল করিডর। একটি গবেষণা মূল্যায়নে বলা হয়, পিএইচআরএফের ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ এলাকা বন্য প্রাণীর বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য। বাকি অংশ (লাঠিটিলার বেশির ভাগ অংশসহ) হাতির বসবাসের উপযোগী।

লাঠিটিলার আশপাশের জনবসতি

সাফারি পার্ক নির্মাণ কেবল জীববৈচিত্র্যের জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষকেও বাস্তুচ্যুত করবে। সরকার সম্প্রতি রোম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তিতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি ঠেকাতে বিধি বা আইন তৈরির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাফারি পার্ক হলে তা রোম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

পর্যবেক্ষণ

প্রস্তাবিত সাফারি পার্কের পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলো। ১. লাঠিটিলা বাঘশুমারির জন্য অগ্রাধিকারে থাকা বন, আন্তসীমান্ত হাতি চলাচলের পথ ও ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্যের হটস্পট। ২. প্রস্তাবিত সাফারি পার্ক আফ্রিকার প্রচলিত সাফারি ধারণা থেকে অনেকটা আলাদা। ৩. বাংলাদেশে চালু অন্যান্য সাফারি পার্ক সংক্রামক রোগপ্রবণ। ৪. পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, অর্থ তহবিল ও প্রাণী পালনের যথাযথ মান না থাকায় দেশের কোনো জুলোজিক্যাল ইনস্টিটিউট বা সাফারি পার্ক ইএজেডএ বা ডব্লিউএজেডএর সদস্য নয়। ৫. বিইটিএস প্রস্তাবিত সাফারি পার্ক আদতে চিড়িয়াখানার ধারণার বর্ধিত রূপ। ৬. বিইটিএসের প্রস্তাবিত সাফারি পার্কে কিছু আকর্ষণীয় (আক্রমণাত্মক প্রাণীসহ) প্রাণী নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। এমন দুর্গম বনভূমি এলাকায় এসব প্রাণী আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে আন্তসীমান্ত সংযোগ রয়েছে। ৭. বনে থাকা দেশি ও ঝুঁকিপূর্ণ বন্য প্রাণীগুলোকে আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা।

লাঠিটিলা বন সংরক্ষণে সুপারিশ

দেশে অবশিষ্ট জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের একটি এলাকা হচ্ছে লাঠিটিলা বন। পার্বত্য বাস্তুসংস্থান বন্য প্রাণীদের একটি আশ্রয়স্থল। সেখানে তাপমাত্রা বাড়লে বন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল সীমিত হবে। তাই এ এলাকায় সাফারি পার্কের পরিকল্পনা বাতিল করা হোক। এখানে পার্ক হলে প্রাথমিকভাবে সেটি হবে বিনোদনের উদ্দেশ্য, যেখানে প্রাণীরা আধা বন্দী থাকবে। সরকার পুরো পিএইচআরএফকে আইইউসিএনের ২ ও ৪ ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করুক। সরকারকে প্রাণীদের আবাসস্থল পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রাণী সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও স্থানীয় আদিবাসীদের জন্য আয়ের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নিতে হবে। পার্কের মূল এলাকায় প্রাণীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে উদ্ধার বা জব্দ হওয়া প্রাণীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে প্রাণীদের প্রজনন সুবিধাও থাকবে। তুলনামূলক ছোট প্রাণীদের জন্য এ সুবিধার প্রয়োজন।

সচেতনতামূলক উপায়ে ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অন্যান্য এলাকায় এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
সর্বোপরি, দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে সাফারি পার্ক যদি করতেই হয়, সেটির জন্য আদর্শ জায়গা শহুরে জনবসতির কাছাকাছি এলাকা। এটা অর্থনৈতিকভাবে যেমন লাভজনক হবে, তেমনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে দূরে থাকবে।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন মিন্টু হোসেন, কামরুজ্জামান ও অনিন্দ্য সাইমুম

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন