প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার শুরু থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৭৯৮ মেট্রিক টন চাল, ১ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং ৭ হাজার ১৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। নগদ অর্থসহায়তা ৫৩ লাখ টাকা। আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া ৫০ লাখ টাকা রয়েছে৷

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকে সাড়ে ১৮ টাকা এবং ১ কেজি ৪৩৬ গ্রাম চাল পেয়েছেন৷ বানভাসি মানুষেরা বলছেন, বন্যা পরিস্থিতির ২০ দিনে সরকারের এই বরাদ্দ একেবারেই অপর্যাপ্ত। পাঁচ-ছয়জনের একটি পরিবারের জন্য দুই-তিন দিনের খাবারও দেওয়া হয়নি। আর চাল ছাড়া অন্য কোনো খাদ্যসামগ্রী না দেওয়ায় তাঁরা কষ্টে আছেন৷

কলমাকান্দা উপজেলার বাহাদুরকান্দা গ্রামের বাসিন্দা জুলেখা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘরে কোমরপানি উঠছিল। আয়রোজগার নাই৷ এখন পর্যন্ত কেউ কোনো সাহায্য দেয় নাই৷ একবার খোঁজও নেয় নাই৷ চেয়ে-চিন্তে চলতেছি।’

এবারের বন্যায় কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িসহ সরকারি–বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। এখন বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না। বন্যায় কারও ঘর ভেঙে গেছে, কারও ফসল নষ্ট হয়েছে। কাজ বন্ধ থাকায় হাতে টাকা নেই। গবাদিপশুরও খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।।

জেলা-উপজেলার মূল সড়কগুলো থেকে পানি নামলেও ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়ক এখনো পানিতে প্লাবিত। সব উপজেলায় এখনো সড়ক যোগাযোগ সচল হয়নি। যেসব সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে, তা স্থানে স্থানে বিধ্বস্ত। অনেক সড়কে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়নটি দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকা। ইউনিয়নের ফুলবাড়ি গ্রামের ৫০০ গজ দূরে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়। গত ১৬ জুন পাহাড় থেকে হঠাৎ নেমে আসা ঢলে গ্রামের অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। গ্রামের বাসিন্দা সুমন মিয়ার ঘরও ভেঙেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পরিবার নিয়ে ফুলবাড়ি বাজারের একটি দোকানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাহায্য পাননি৷

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলার ৬১টি ইউনিয়নে ২২ হাজার ৫১৫টি পরিবার এখনো পানিবন্দী রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলার ২৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার ৭১০ জন রয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৭৮ জন নারী, ৪ হাজার ৭৭ জন পুরুষ, ৯৯১ জন শিশু ও ৬৪ জন প্রতিবন্ধী। মানুষের পাশাপাশি এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার গবাদিপশুসহ বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণী রয়েছে।

জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ প্রথম আলোকে বলেন, ত্রাণের জন্য বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই ইউনিয়ন পরিষদে ভিড় করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যারা সবচেয়ে হতদরিদ্র, তাদের ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। চাল ও নগদ অর্থের বাইরেও ৫০ হাজার প্যাকেট গুঁড়া দুধ, ১০ লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও ১০ লাখ টাকার গোখাদ্য দেওয়া হয়েছে। ত্রাণের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বেসরকারি উদ্যোগেও অনেক ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগ ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।

লেঙ্গুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড় থেকে ঢল নেমে তাঁর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ২৭০টি বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এলাকার লোকজন অসহায় অবস্থায় আছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ দেওয়া যায়নি।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বন্যার পানি ওঠায় নেত্রকোনা জেলায় ছয় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫০৩। মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে শ খানেক।

জেলা-উপজেলার মূল সড়কগুলো থেকে পানি নামলেও ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়ক এখনো পানিতে প্লাবিত। সব উপজেলায় এখনো সড়ক যোগাযোগ সচল হয়নি। যেসব সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে, তা স্থানে স্থানে বিধ্বস্ত। অনেক সড়কে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক নেত্রকোনা কমিটির সভাপতি শ্যামলেন্দু পাল প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। ত্রাণের জন্য মানুষ এখন রীতিমতে হাহাকার করছেন। প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করে ত্রাণ দিতে হবে। ত্রাণ বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন