default-image

‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’—সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই পঙ্ক্তিগুলো বাজছে বইমেলার বাইরে, মাইকে। আর মেলার দুই প্রাঙ্গণ—বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে দেখা যাচ্ছে অজস্র ফুল, তরুণীদের মাথায় উজ্জ্বল মুকুট হয়ে আছে হলুদ ফুলের টায়রা। সব মিলিয়ে অনুপম বৈপরীত্য। মেলায় আগত অনেকের পোশাকেও গতকাল ছিল হলুদাভ আবহ—ফাগুন জাগিয়ে বসন্ত কি এসেই গেল তবে!
‘হ্যাঁ, বসন্তের আগের দিন থেকেই আমাদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বসন্ত।’—মাথায় হলুদ ফুলের টায়রা পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহা কথাটি বলেই হাসলেন খিলখিল করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁর পাশে দাঁড়ানো বন্ধুরা আরও প্রসারিত করলেন সেই হাসি। এঁদেরই একজন বেনজির বাশার চৌধুরী। তাঁর হাতভর্তি বই—হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক থেকে শুরু করে হরিশংকর জলদাস পর্যন্ত। বললেন, ‘কাল তো বসন্ত। ফাল্গুনের প্রথম দিনে বন্ধুদের বই উপহার দেব।’
বইমেলার ১২তম দিনে গতকাল মানুষের সমাগম যেমন আশা জাগিয়েছে, তেমনি বেড়েছে বিকিকিনিও। দুই প্রান্তেই লোকজনের পদচারণ ছিল আশাব্যঞ্জক। ঋতুরাজ বসন্তকে উদ্যাপন করতে এদিন বই কিনেছেন অনেকেই। কারও হাতে প্রবন্ধের বই, কারও হাতে ছোটগল্প কিংবা উপন্যাস। আবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকিল আশরাফের মতো কারও হাতে বাবুরনামার মতো আত্মজীবনীও শোভা পেয়েছে। বাসাবো বৌদ্ধমন্দির এলাকা থেকে সপরিবারে এসেছিলেন গৃহবধূ মুন্নী বড়ুয়া। বললেন, ‘শুধু বসন্ত কেন, বই তো সব সময়ই কিনি। তবে বিভিন্ন উপলক্ষে বই কিনলে ওই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা যায়—ব্যাপারটা মন্দ নয়।’
মাঘের শেষ দিনে বইমেলায় মানুষের ভালো উপস্থিতিতে খুশি প্রকাশক ও বিক্রেতারাও। রোদেলা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রিয়াজ খানের কথায় তারই আভাস, ‘আজকে বেশ বিক্রি হচ্ছে। সহিংসতার ভয় ভেঙে মানুষ আসছে। আসলে ভয় পেতে পেতে মানুষ ভয়কে জয় করে ফেলেছে। বসন্তের প্রথম দিন ও ভালোবাসা দিবসেও ভালো বেচাকেনা হবে বলে আশা করছি।’ এমন আশার কথা জানালেন ঐতিহ্যর প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান নাইমও।
বইমেলার ১২ দিনে নানা ধরনের বই এসেছে। এর মধ্যে পাঠক-পছন্দের দিক থেকে এখন পর্যন্ত ছোটগল্প, উপন্যাসেরই জয়জয়কার—জানালেন অনন্যার কর্ণধার মনিরুল হক। অন্যদিকে প্রথমা প্রকাশনের বইমেলা বিক্রয়কেন্দ্রের প্রধান মো. ইউসুফের কথায় জানা গেল, ‘উপন্যাসের পাশাপাশি প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইও ভালো বিক্রি হচ্ছে।’ এঁদের সবাই স্বীকার করলেন, হরতাল-অবরোধসহ বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এখনো সেভাবে মেলায় দেখা যায়নি ঢাকার বাইরের পাঠকদের। তাঁরা আসা শুরু করলে মেলা আরও জমজমাট হয়ে উঠবে বলেই প্রকাশকদের ধারণা।
আজ বসন্ত দিনে মেলার দ্বার খুলবে বেলা ১১টায়। ১১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলবে ‘শিশু প্রহর’। এ ছাড়া একটানা মেলা চলবে ঠিক রাত সাড়ে আটটা অবধি।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং এক পশলা অটোগ্রাফ: গতকাল বৃহস্পতিবার মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রান্তে দেখা মিলল জনপ্রিয় সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের। সবে সন্ধ্যা নেমেছে। উদ্যানের খোলা প্রাঙ্গণে খুদে পাঠকদের মাঝখানে একের পর এক অটোগ্রাফ দিয়ে চলেছেন তাদের প্রিয় লেখক। কারও কারও আবদার ছিল লেখকের সঙ্গে ছবি তোলারও। এ সময় পাঠকের সব আবদারই রাখতে চেষ্টা করেছেন জাফর ইকবাল।
নতুন বই ও মোড়ক উন্মোচন: একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বইমেলার ১২তম দিনে নতুন বই এসেছে ১০০টি। নজরুল মঞ্চে ৪টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ ছাড়া একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনারকক্ষে মোড়ক উন্মোচিত হয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বই শিক্ষা অর্জনে যেতে হবে বহুদূর-এর। বইটি বেরিয়েছে চারুলিপি থেকে।
বিকেলে বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘শিশু সংগঠক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খালেক বিন জয়েনউদদীন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মাহবুব তালুকদার, আলী ইমাম, লুৎফর রহমান রিটন ও প্রত্যয় জসীম। সভাপতিত্ব করেন শিল্পী হাশেম খান।
আলোচকেরা বলেন, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ছিলেন অনুপ্রেরণার মানুষ। তিনি সম্ভাবনাময় লেখকদের শিশু-কিশোরদের মাঝ থেকে খুঁজে বের করতেন এবং তাদের ভবিষ্যতের রত্ন হিসেবে নির্মাণে ভূমিকা রাখতেন।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল আবৃত্তি সংগঠন ‘শ্রুতিঘর’-এর আবৃত্তি পরিবেশনা এবং গোলাম কুদ্দুছের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বহ্নিশিখা’-এর পরিবেশনা। গান করেন সাদী মহম্মদ, লিলি ইসলাম, তপন মাহমুদ, ফাতেমা তুজ জোহরা, লীনা তাপসী, ইয়াকুব আলী খান, আজিজুর রহমান তুহিন, সুমন মজুমদার ও মাহবুবা রহমান।
আজ শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা
১৩তম দিনে আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় বইমেলার মূল মঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানের অতিথি অভিনয়শিল্পী শমী কায়সার।
বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘কবি আবুল হোসেন’ শিরোনামের আলোচনা অনুষ্ঠান। এখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তারেক রেজা। আলোচনা করবেন বায়তুল্লাহ কাদেরী, অনু হোসেন ও হিমেল বরকত। সভাপতি মনজুরে মওলা।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন