default-image

তাঁর কথা ভাবতেই চিন্তারা জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। অদ্ভুত এক আঁধারে প্লাবিত হচ্ছিল মন, যেন গুমরে কেঁদে উঠবে এক্ষুনি। তাঁকে ভাবলেই কষ্টগুলো কান্না হয়ে গড়িয়ে পড়েছে কত রাত। আমি তখন হারিয়ে যাওয়া অন্য এক আমাকে খুঁজেছি। খুঁজতে গিয়ে কাগজ-কলম রেখে খোলা জানলার গরাদে হাত রাখি। দেখি দূরের বিস্তৃত সবুজের গভীরে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাণোচ্ছল বালিকা সুলতানা। মনের চোখে দেখি বালিকা সুলতানা বেণি দুলিয়ে পড়ছে, মায়ের কাজে সাহায্য করছে। কখনো মন-প্রাণ ঢেলে অসুস্থ মায়ের সেবা করছে, ছোট ভাই-বোনকে ভাত মেখে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। আবার রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। এই মানুষটি একদিন বহু মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠবেন, হয়তো নিজেও ভাবেননি কখনো।

প্রকৃতি ও রবীন্দ্র কাব্য ভাবনার সঙ্গে সুলতানা সারওয়াত আরা জামানের ছিল ভীষণ সখ্য। হয়তো এগুলোই তাঁকে শিখিয়েছিল দুঃখ জয় করতে, বিনা শর্তে মানুষকে ভালোবাসতে। সে কারণেই হয়তো তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বহু প্রতিবন্ধী বা ‘বিশেষ শিশু’ ও তাদের মা-বাবার পরম আত্মীয়, অভিভাবক। সেটা আজ এক ইতিহাস, গৌরব ও মহানুভবতার ইতিহাস। অথচ রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে অনেক দিন পর্যন্ত প্রতিবন্ধী শিশু ছিল উপেক্ষিত, অনাদৃত। শুধু কি তা-ই? প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে অভিভাবকদের মন ও মগজে কুসংস্কার হিসেবে গেঁথে ছিল—   প্রতিবন্ধী শিশু হলো মা-বাবার পাপের ফসল। যাঁরা এমন শিশুর মা-বাবা হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে কোনো না কোনো অজানা পাপ বা অপরাধ! যার শাস্তি তাঁদের পেতে হবে সারা জীবন।

বিজ্ঞাপন
আপার আত্মদর্শনের সঙ্গে তখন আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হই ‘সবাইকে ভালোবাসো’। যেকোনো অভিযোগ শুনে বলতেন, ‘ক্ষমা করে দাও, ভুলে যাও।’ আপা সব সময় মনে করিয়ে দিতেন, ‘সবাইরে বাসরে ভালো নইলে মনের কালো ঘুচবে না তোর।’ তখনই ঘটল ঘটনাটি।

সুলতানা সারওয়াত আরা জামান সেই বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজে ব্রতী হলেন, যে শিশুরা নিজের জন্মত্রুটির জন্য নিজেরা দায়ী নয়, এমনকি দায়ী নন তাদের বাবা-মায়েরাও। তিনি সমাজ ও মানুষের কাছে পৌঁছে দিলেন এই বিশেষ শিশুদের জন্য সহানুভূতির বাণী, ‘ওরা আমাদেরই সন্তান, অনেকটা অজ্ঞতার ফসল’, ‘কোন জাদুটোনা বা পাপের ফল নয়, নয় এটি প্রকৃতির কোন প্রতিশোধ’, ‘সজাগ হও আগামী প্রজন্মের অভিভাবকেরা, পৃথিবী থেকে ঘোচাও মানসিক প্রতিবন্ধিতা।’ এমন আরও অনেক স্লোগানে তিনি আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন আত্মাকে জাগিয়ে তুলতেন। বলতেন, ‘আমরা নিজেরা “পারফেক্টশনিস্ট” নই, তাহলে অন্যের পারফেকশন কীভাবে আশা করি? সুতরাং আমাদের মানসিকতা, ধ্যান ও ধারণা বদলাতে হবে।’

সুলতানা আপা পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন। দেশ শত্রুমুক্ত হলে তিনি আর বসে থাকেননি। সেই সত্তরের দশকেই প্রতিবন্ধিতা নামের আরেক বিভীষিকা দূরীকরণের যুদ্ধ নিজ কাঁধে তুলে নেন। এই কর্মে আপার শক্তির উৎস ছিলেন তাঁর স্বামী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল নুরুজ্জামান। এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের একাকী পথিক, যোগ্যতম সেনাপতি সুলতানা আপার সে পথে তাঁর অনুসারী ছিলাম আমরা।

সুলতানা আপা যেন শুধু দিতেই এসেছিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন ক্ষণজন্মাদের একজন। অথচ তাঁরও ছিল কিছু গোপন বেদনা। নিজের মা কবি রাহাত আরা খানকে স্মরণ করে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন বহু দিন। তাঁকে ভেবে স্মৃতির ভান্ডার খুলতেই আপা যেন মনের আয়নায় আরেক সুলতানাকে আবিষ্কার করতেন। কখনো কখনো আমাকে ডাকতেন ভোরের হাঁটার সঙ্গী হিসেবে। আপার আত্মদর্শনের সঙ্গে তখন আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হই ‘সবাইকে ভালোবাসো’। যেকোনো অভিযোগ শুনে বলতেন, ‘ক্ষমা করে দাও, ভুলে যাও।’ আপা সব সময় মনে করিয়ে দিতেন, ‘সবাইরে বাসরে ভালো নইলে মনের কালো ঘুচবে না তোর।’ তখনই ঘটল ঘটনাটি। ক্রমেই তিনি শুরু করলেন আমার ভেতরের আমাকে নতুন করে জাগাতে। একদিন তিনি হুকুম দিলেন, ‘মাকসুদা, কাজে নেমে পড়ো।’ এভাবেই হলো আমার নবজন্ম।

default-image

জীবনের বন্ধুর পথে আপা ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলেন প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণের কাজে। দেশ-বিদেশে খুঁজে ফিরেছেন তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রণা লাঘবের সম্ভাব্য সব উপায়। বিশেষ শিশুরা যাতে সমমর্যাদা, সুরক্ষা ও সবার সঙ্গে অংশগ্রহণের অধিকার পায়, সে জন্য বহুবার তিনি ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ‘চিলড্রেন উইথ ডিফারেন্স অ্যান্ড নট ডিজেবল’ বিষয়টি নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন। অগ্রদূত হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে দাবি তুলেছেন। একান্ত চেষ্টায় বিশেষ শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, যেটি আজ স্বমহিমায় সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে হয়ে উঠেছে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা। তারই ধারাবাহিকতায় আপার সুযোগ্য কন্যা ডা. নায়লা খানের হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে ২৩টির বেশি শিশু বিকাশকেন্দ্র। যেসব কেন্দ্রে এসে আজকের নবজাতক শিশুর বাবা-মায়েরা পাচ্ছেন তাঁদের পিছিয়ে পড়া বা বিকাশে বাধাগ্রস্ত শিশুর বৈজ্ঞানিক ও মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষা, নিরীক্ষাসহ প্রাক-প্রতিকারমূলক নানা প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় থেরাপি।

প্রতিবন্ধী শিশুর পরিবার আজ অনেকটাই অভিশাপমুক্ত। কারণ দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময়ের নিরলস পরিশ্রমের ফসল আপা তুলে দিয়ে গেছেন বিশেষ শিশুর পরিবারকে, দেশ-জাতি ও সমাজকে। দেশে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে যাবতীয় মোটিভেশন, মিথস্ক্রিয়া, ইতিবাচক ভাবনাচিন্তা, সভা-সেমিনার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, কনফারেন্সের ফলে আজ এই শিশুরা আর উপেক্ষিত বা অবহেলিত নয়। সব ধরনের শারীরিক, মানসিক, সেন্সরি বা ইন্দ্রিয় ও আবেগীয় সমস্যার সমাধানে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব চিকিৎসা বিভাগ আজ আলাদা করে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে। এটি সুলতানা আপার অধরা স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আজ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ একসূত্রে সমাজের বিশেষ শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, পুনর্বাসনের চিন্তা করে, পরিকল্পনা করে। সংসদে প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন পাস প্রক্রিয়াধীন।

বিজ্ঞাপন
default-image

ব্যক্তি পর্যায়ে আপা কী অদ্ভুতভাবে সবাইকে শক্তি জোগাতেন, যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরাই জানতেন সেসব। কর্মজীবনের একপর্যায় এসে আমি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, শুধু বিশেষ শিশুদের প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনাই আমার কাজের লক্ষ্য হতে পারে না, এর ভেতরে থেকে যাচ্ছিল একটি বড় রকমের শূন্যতা। কারণ, আমি ওই শিশুর অভিভাবকদের কথা সরাসরি জানার সুযোগ পেতাম না। তাঁরা সত্যিকার অর্থে নিজের মর্মযাতনা প্রকাশ করার জন্য পেশাদার কারও সাহায্য পাচ্ছিলেন না, যেটি তাদের জীবনকে সঠিকভাবে চলমান রাখতে খুব দরকার। আমি তাই প্যারেন্ট কাউন্সিলিং শিখতে শুরু করলাম। এভাবে ধীরে ধীরে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, দেশ-বিদেশে কাউন্সিলিং ও সাইকোথেরাপির কাজে জড়িয়ে যাই। আমার Transactional analysis I EMDR practitioner হওয়ার পথে এই বিশেষ শিশুদের বাবা-মায়েদের সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ নিয়ে আপাকে জানাই, কীভাবে আমি সাইকোথেরাপি শিখছি। আপা বলতেন, ‘তুমি নিজের পথ আবিষ্কার করেছো, এখন থেকে এটিই তোমার কাজ, তুমি এ কাজই করবে, আমাকে কথা দাও।’ ব্যক্তিজীবনের চূড়ান্ত দুর্দিনে আপার এই আদেশ ও অনুপ্রেরণা না পেলে হয়তো আমি আজকের আমি হতে পারতাম না। আপা সব সময় আমাদের বলতেন, ‘আমার মেয়েরা!’ জানি না কত জনকে তিনি এই মিষ্টি ডাকে মুগ্ধ আর অনুপ্রাণিত করেছেন। কঠিন কর্মজীবনের পথে আহ্বান করেছেন। হয়তো অসংখ্য!

আমি জানি একটি আলোক শিখাই অন্ধকার অপসারণে বড় ভূমিকা রাখে। সেই আলোর শিখা থেকে অন্যরাও নিজের আলোকে জ্বালিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়, তখন অন্ধকার চিরতরে দূরীভূত হয়। আপা আমাদের মনে ও মননে সেই আলোকশিখা হয়ে বেঁচে আছেন, থাকবেন আজীবন।

লেখক: মাকসুদা বেগম, সাইকোথেরাপিস্ট

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন