default-image

দিবসের হিসেবে ১৬ উচ্চারণ করতেই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে যেন বিজয়ের ঢেউ খেলে। ১৬ ডিসেম্বর যে বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটীয় জীবনে ১৬ মার্চ একই সঙ্গে বিজয় এবং বেদনার দিবস। দিন-পঞ্জিকার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের দুটি অসাধারণ বিজয় রয়েছে মার্চের ১৬ তারিখ। একই সঙ্গে আছে হারানো বা কান্নার স্মৃতি। স্মরণীয় ১৬ তারিখের ৪টি উল্লেখযোগ্য ক্রিকেটীয় ঘটনা আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো—

১.
মানজারুল ইসলাম রানা, বাংলাদেশের এককালের বিশেষজ্ঞ অলরাউন্ডার। খুলনায় জন্ম নেওয়া এই খেলোয়াড় বাঁহাতি অর্থডক্স বোলার হিসেবে বেশ সুপরিচিত ছিলেন। ঘরোয়া লিগে নিয়মিত খুলনার হয়ে খেলতেন।

২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ওয়ানডেতে অভিষেক হয় মানজারুল ইসলাম রানার। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ৬টি টেস্ট, ২৫টি ওয়ানডে খেলেছেন তিনি। ৩১ ম্যাচে ব্যাট হাতে ৫৮৮ রান করার পাশাপাশি বল হাতে প্রতিপক্ষের ২৮টি উইকেট তুলে নেন তিনি। ২০০৭ সালের ১৬ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এই তারকা ক্রিকেটার। দলে রানাকে সবাই মাশরাফি বিন মুর্তজার সহোদর হিসেবে চিনতেন। একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটতেন দুজন। অধিনায়ক রানার মৃত্যুর খবর যখন দলে জানা যায়, ম্যাশ তখন রুমের দরজা বন্ধ করে অঝোরে কাঁদছেন। রানার মৃত্যুর পরের দিন বাংলাদেশ দৃঢ়প্রত্যয়ে মাঠে নামে। ‘রানার জন্যই খেলবেন আজকের ম্যাচ’। ভারতের সঙ্গে বোলিংয়ে কী ঝলকটাই না দেখিয়েছেন ম্যাশ। ৩৮ রানে তুলে নিয়েছেন ৪টি উইকেট। ব্যাটিংয়ে নবীন তামিম, মুশফিক, সাকিবের কাছে বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে পাত্তাই পেল না ভারত। রানার প্রয়াণদিবস আজও বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা স্মরণ করেন, হয়তো মাশরাফির একটু বেশিই মনে পড়ে।

২.
ক্যারিয়ারের শেষ দিকে যখন শচীন টেন্ডুলকার সেঞ্চুরি করতেন, অনেকে ভেবে বসতেন আজ ভারত হারবে। এটা নিছক কুসংস্কার ছাড়া বৈকি! অবশ্য ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শচীনের শেষ দুই সেঞ্চুরির দিনে হেরেছে ভারত। ২০১২ সালের ১৬ মার্চ লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার, ক্যারিয়ারের সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি গড়েন। এশিয়া কাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ১১৪ রান করে মাঠ ছাড়েন শচীন। কিন্তু তামিম-মুশিদের ব্যাটিং তাণ্ডবে ম্লান হয়ে যায় শচীনের সেরা দিন। ২৯৩ রানের টার্গেটে মাঠে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। শুরুতে নাজিমুদ্দিন বিদায় নিলেও জয়ের ভিতটা শক্ত করে দেন তামিম, জহুরুল, নাসিররা। আশোক দিন্দার ফ্রি হিট বলে সাকিবের লম্বা ছক্কাটা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মুশফিক তখন নবীন ক্যাপ্টেন। তাতে কী, নতুন অধিনায়ক তাঁর দায়িত্ব পুরো পালন করেছেন। ইরফান পাঠানকে কর্নারে পাঠানো ছক্কাটা এখনো ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে ভাসে। ২৫ বলে ৪৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন মুশফিকুর রহিম। বাউন্ডারির মাধ্যমে ম্যাচের সমাপ্তি ঘটান মাহমুদউল্লাহ। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠে।

৩.
গম্ভীর মুশফিককে কয়জন দেখেছেন? হয়তো ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ দেখে থাকবেন। কিন্তু পরিবার আর খেলার মাঠে মুশি যেন হাসিতে নিহিত। বোলাররা উইকেট পেলেন, সতীর্থ ব্যাটসম্যান কোনো মাইলফলক স্পর্শ করলে মুশির মুখে ফুটে চওড়া হাসি। গণমাধ্যমে, গুগলে মুশফিকের হাসির ছবি ছড়িয়ে–ছিটিয়ে। সেঞ্চুরির উদযাপনে মুশির হাসি মুখে লেপ্টে থাকবে। কিন্তু ভীত মুশফিকের চেহারা কিংবা আতঙ্কিত মুশিকে কয়জন দেখেছেন? ২০১৯ সালের ১৬ মার্চ বাংলাদেশ বিমানবন্দরে বাকহীন, ভীতিগ্রস্ত এক ভিন্ন মুশফিককে দেখা গেছে। শুধু মুশফিক নন, দলের সবার মধ্যে এক আতঙ্ক বিরাজ করছিল তখন। সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল, খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতা। যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছেন। ১৫ মার্চ বাংলাদেশ দল ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিল। খেলার সময় সাধারণত দলের সবাই একত্রেই জুমার নামাজ পড়ে থাকেন। সেদিন বাকিদের সঙ্গে টিম বাসে ছিলেন সৌম্য সরকারও। বাস যখন একেবারে মসজিদের পাশে পৌঁছে গেছিল, তখন মসজিদের ভেতর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিলেন এক বন্দুকধারী। একে একে হত্যা করেন অর্ধশতাধিক মুসল্লিকে। সংবাদ সম্মেলনে রিয়াদের দেরি না হলে হয়তো বিরাট দুর্ঘটনার শামিল হতো টিম বাংলাদেশ। গুলির শব্দ, রক্তাক্ত শরীর, নিথর লাশ দেখার এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল না বাংলাদেশ দলের। হোটেলে ফিরে মুশফিক অঝোরে কেঁদেছেন। ১৬ মার্চ যখন দেশে ফেরেন, তখনো যেন মুশির চোখগুলো ফুলে আছে। সেদিনের ভয়ংকর ঘটনা আর মনে রাখতে চাচ্ছেন না কেউই। তবু দুঃস্মৃতি বারবার হানা দেয় মনের দরজায়। তখন হয়তো ক্রিকেটারদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া সেদিনের জন্য খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ বৃদ্ধি পায়।

default-image

৪.
বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টির একেবারে নিচু সারির দল। শীর্ষ ১০ দলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। বাংলাদেশের ঠিক আগে, অর্থাৎ অষ্টম স্থানে আছে শ্রীলঙ্কা। ২০১২ সালে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ দল সর্বোচ্চ ১৯০ রান গড়ে। দীর্ঘ ছয় বছর টিকে ছিল এই রেকর্ড। ২০১৮ সালের শ্রীলঙ্কা সিরিজে রেকর্ডের সঙ্গে আরও তিন রান যোগ হয়। দেশের মাটিতে দলীয় সর্বোচ্চ ১৯৩ রানের নতুন রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। কিছুদিন পরেই, নিদাহাস ট্রফিতে এই রেকর্ড ভাঙে তামিম-লিটন, মুশফিকের ব্যাটিং–ঝড়ে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে দুই শতাধিক রান করে। ২১৫ রানের টার্গেটে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেয়।

নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে উঠতে চার ম্যাচের দুই ম্যাচ জিততে হতো বাংলাদেশকে। ২০১৮ সালের ১৬ মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টুর্নামেন্টের চতুর্থ ম্যাচে মাঠে নামে দল। মাত্র ১৬০ রানের টার্গেটে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ। কিন্তু তামিম ছাড়া টপ অর্ডারের কেউই নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। মিডল অর্ডারে অধিনায়ক সাকিব ৭ রানে ফিরে গেলে শ্রীলঙ্কার দিকেই ম্যাচ অনেকটা হেলে পড়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুঃসময়ের বন্ধু মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ তখনো মাঠে। মিরাজকে নিয়ে মাহমুদউল্লাহ যখন ম্যাচ শেষ করার চিন্তা করছিলেন, মিরাজও তখন রান আউটের কবলে কাটা পড়েন। মিরাজের আউটে মাঠেই রাগতে দেখা যায় ঠান্ডা মাথার মাহমুদউল্লাহকে। শেষ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ১২ রান। স্ট্রাইকে মোস্তাফিজুর রহমান। বোলার উদানা যখন হেলমেট বরাবর পরপর দুটি শর্ট বল করলেন, তাতে কোনো ওয়াইড সিগন্যাল দেননি ফিল্ড আম্পায়ার। ডাগআউট থেকে তখনই ক্ষোভে ফেটে পড়েন কাপ্তান সাকিব আল হাসান। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মানতে পারছিলেন না মাঠে থাকা মাহমুদউল্লাহও। শুরু হয় নাটকীয়তা। আম্পায়ারদের সঙ্গে কথোপকথন। অতিরিক্ত খেলোয়াড় সোহানও কম যাননি। মাঠে গিয়ে তর্কে জড়িয়েছেন। চোখ রাঙিয়ে বিপক্ষ দলের সঙ্গে কথাও বলেছেন।

default-image

সাকিব ব্যাটসম্যানদের মাঠ ত্যাগ করতে বললেও তাতে তেমন সায় দেননি মাহমুদউল্লাহ। শেষ ৪ বলে বাংলাদেশের প্রয়োজন ১২ রান। রুবেল-মাহমুদউল্লাহরা আবার ব্যাট হাতে ক্রিজে ফেরেন। অপর প্রান্তে বল হাতে উদানা তখন পুরো প্রস্তুত। ১৯ ওভারের তৃতীয় বলে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে মাহমুদউল্লাহর দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি। ওয়াইড বলটাকে খানিকটা টেনেই মেরেছেন। চতুর্থ বলে লং অনের দিকে ঠেলে দিয়ে দ্রুতগতির দুই রান আদায় করেন দুই ব্যাটসম্যান। তবে কিপারের হাতে বল ঠিকমতো পৌঁছলে ডাগআউটের পথ ধরতে হতো সাইলেন্ট কিলারের। শেষ দুই বলে বাংলাদেশের দরকার ৬ রান। এক বলে নিশ্চিত বাউন্ডারি বের করতেই হবে। টান টান উত্তেজনার ম্যাচ। শ্রীলঙ্কান দর্শকদের অবয়বে মেঘ ধারণ করেছে। কেউ কেউ হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেছেন। হার্টবিট বেড়েই চলেছে বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীদের। আম্পায়ারদের ভুল, ক্রিকেট মাঠে অশালীন আচরণের প্রতিশোধ বাংলাদেশি দর্শকদের আরও উত্তেজিত করে তুলছে। এত দর্শকের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছেন টাইগার শোয়েব। ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বলে গ্যালারিতে চিৎকার করছেন গুটি কয়েক দর্শক। ক্রিকেটারদের অনেকেই বাউন্ডারি লাইনের কাছে দাঁড়িয়ে অন্তিম দৃশ্যের অপেক্ষা করছেন। রেডিওতে ধারাভাষ্যকারদের কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ, ‘পঞ্চম বল করার জন্য দৌড়ে আসছেন উদানা’, ‘বল করলেন।’ লেগ সাইডে মাহমুদউল্লাহ ফ্লিক শট খেললেন। বল হাওয়ায় ভাসছে। রিয়াদ নিশ্চিত বল কোথায় যাচ্ছে। নন–স্ট্রাইকে দৌড়ে মাহমুদউল্লাহও উচ্চ লাফে হাওয়ায় ভাসছেন। রুবেল বলের দিকে তাকিয়ে দৌড়াচ্ছেন। টিভি সেটে ধারাভাষ্যকারদের উচ্চ কণ্ঠ, ‘ও মাই গডনেস। হি ফিনিশড ইট অব ইনক্রেডিবল স্টাইল। হোয়াট আ ম্যাগনিফিসেন্ট শট!’ বাউন্ডারি লাইন থেকে দৌড়ে আসছেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা। যেন দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে। একটু পরে সাকিবও দৌড়ে মাঠে প্রবেশ করলেন। জার্সি খুলে সাকিবের ফুটবলারদের মতো উদযাপন। বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের বিজয়ী ধ্বনিতে কম্পিত হচ্ছে প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম। দূর থেকে ভেসে আসছে টাইগার শোয়েব এবং গুটি কয়েক বাংলাদেশি দর্শকদের আত্মচিৎকার, ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ,’ ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ।’

*লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন