প্রতিবেদনে, বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার স্বার্থে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

জুন মাসের শুরুতে ‘নিউ ইন্দোপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ: বিল্ডিং অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সিকিউরিটি টাইজ’ শীর্ষক ওই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজ। প্রায় বছর দেড়েক ধরে বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ডেভিড ব্রিউস্টার নীতি গবেষণাপত্রটি তৈরি করেছেন। নিরাপত্তা গবেষক হিসেবে পরিচিত ডেভিড ব্রিউস্টার গবেষণাপত্র তৈরির আগে ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ সফর করেন।

অস্ট্রেলিয়ার নীতি গবেষণাপত্রের সুপারিশ:
-বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নিয়োগ;
-সামরিক শিক্ষাসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা;
-বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর সফরের আয়োজন;
-সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজে অর্থায়ন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশিত বিভিন্ন নীতি গবেষণাপত্রের সুপারিশ সাধারণত অস্ট্রেলিয়া সরকারের নীতিগত অবস্থান হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গৃহীত হয়েছে।

কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের গবেষণাপত্রের সুপারিশ বেশ ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি দ্বিপক্ষীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে বলা চলে, এই প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিষয়ে সরাসরি কোনো মতামত দিয়েছে। আবার নিরাপত্তা, বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশকে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, আইপিএস এবং চীনের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ বা বিআরআইকে ঘিরে বৈশ্বিক মেরুকরণ কিংবা প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া মূলত আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করে এবং উন্নয়ন সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশের যে আরও গুরুত্ব রয়েছে, সেটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের ওই গবেষণাপত্রের সুপারিশে প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা বারবার বলেছি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ যেখানে আছে, সেখানে আমরা যুক্ত হব।’

কিন্তু গবেষণাপত্রে আইপিএসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, গবেষণাপত্রটি মাত্র প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠকেও অস্ট্রেলিয়ার দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সার্বিকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগ্রহ দেখতে পেয়েছি। হুটহাট করে কিছু করার সুযোগ নেই। কারণ নিরাপত্তার উপাদান থাকলে আমরা সতর্কতার সঙ্গে এগোব। আমরা বিভিন্ন উদ্যোগকে কৌশলগত প্রেক্ষাপটের চেয়ে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে চাই।

চার দফার সুপারিশ

‘নিউ ইন্দোপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ: বিল্ডিং অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সিকিউরিটি টাইজ’ শিরোনামের ওই গবেষণাপত্রে চারটি প্রেক্ষাপট থেকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, উত্তর–পূর্ব ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে ভারতের পাশাপাশি এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত করাটা জরুরি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আর ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পরবর্তী এশিয়ার ব্যাঘ্র হওয়ার মতো যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। তৃতীয়ত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাইরের শক্তিকে প্রতিহত করার সামর্থ্য অর্জনে সহায়তাসহ ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার অনেক হিসেব-নিকেশ রয়েছে। চতুর্থত, বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যাপকতর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা উচিত।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের ওই গবেষণাপত্রে নীতিগতভাবে চারটি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নিয়োগ। সামরিক শিক্ষাসহ সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের আদান-প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর সফরের আয়োজন করা। সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা করা উচিত।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্কটা দ্বিপক্ষীয়ভাবে উন্নতি করা উচিত। এ ধরনের যে উদ্যোগকে আমরা দ্বিপক্ষীয় প্রেক্ষাপট থেকে স্বাগত জানাতে পারি। কিন্তু এখানে কথা হচ্ছে দুটি। স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা সব সময় বন্ধু দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি চাইব। তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে এই সম্পর্ক হওয়ার কথা নয়। সেভাবে কোনো সম্পর্কের উন্নতি হবে না। দ্বিতীয় কথা হলো সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয়ভাবে হলে স্বাগত জানাতে পারি। কিন্তু এই সম্পর্ক যদি কোয়াডের হয়ে নতুন কোনো সদস্যকে কাছে আনার প্রচেষ্টা হয়, সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কোয়াডের বা অন্য কোনো সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ হলে সজাগ থাকতে হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তা অনুপস্থিত ছিল। ফলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।


নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গর্ভন্যান্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, অস্ট্রেলিয়া তাদের ভূরাজনৈতিক নীতি যে পুনর্মূল্যায়ন করছে, গবেষণাপত্রের সুপারিশ তার প্রতিফলন। প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে তাদের যে ভূরাজনৈতিক অবস্থান ছিল চীনের উপস্থিতির কারণে তারা সেখান থেকে নিজেদের আরও অবারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন প্রশান্ত মহাসাগরে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, অস্ট্রেলিয়া এখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য পক্ষকে যুক্ত করতে চাইছে। সেখানে শুধু ভারত নয়, আরও অনেক দেশকে যুক্ত করতে চাইছে। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে চলেছে। তা ছাড়া এইচএসবিসির সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার জিডিপির সমান হবে ২০৩৫ সালে। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক অভিবাসী এখন অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছেন। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন। সব কটি বিষয়কে অস্ট্রেলিয়া বিবেচনায় নিচ্ছে। এর চেয়ে বড় কথা, দেশটিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনও সরাসরি না বললেও গত কয়েক বছরে আমাদের গুরুত্ব তাদের কাছে তুলে ধরতে পেরেছে।

ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের নীতি গবেষণাপত্রের আইপিএসের প্রেক্ষাপটে যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে, সেটির ইঙ্গিত মেলে। অস্ট্রেলিয়া তার নিজের স্বার্থেই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে গিয়ে ব্যবসা–বাণিজ্যের বিষয়টি সামনে আনবে। তেমনিভাবে বাংলাদেশও প্রতিরক্ষা, বিশেষ করে সমরাস্ত্র কেনাকাটার ক্ষেত্রে গুটিকয় দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য ফোর্সেস গোল-২০৩০ অনুযায়ী চীননির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো থেকে সমরাস্ত্র কেনাকাটা শুরু করেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামর্থ্য প্রমাণ করে। এরই মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কেনাকাটার আলোচনা চলছে। আবার জ্বালানির প্রেক্ষাপটে দেখলে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদার কারণে অস্ট্রেলিয়া কয়লা বিক্রি করতে চায়। জ্বালানি খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দুই দেশ এরই মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতার একটি রূপরেখা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে গিয়ে বাংলাদেশ কোন কোন ক্ষেত্রে কতটা জোর দেবে। এতে বাংলাদেশ যেন নিজের স্বার্থকে সমুন্নত রাখে, সেটাই প্রধান বিবেচ্য হওয়াটা জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন