বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: ট্রানজিট নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে অনেক আলোচনা হয়েছিল এবং ভারত বারবার বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট চেয়েছিল। ট্রানজিট নিয়ে আজকাল তেমন একটা কথাবার্তা শোনা যায় না।

বিক্রম দোরাইস্বামী: বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট পেতে আমাদের আগ্রহ এখনো অব্যাহত আছে। এ প্রসঙ্গে তিনটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই।

প্রথমত, পরিচালনা এবং প্রবিধানসংক্রান্ত মাত্রাতিরিক্ত খরচ সীমান্তে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে একধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার সৃষ্টি করে, যা দুই দেশের বাণিজ্যের পথে সবচেয়ে বড় অশুল্ক বাধা। এতে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা পণ্যের মূল্য বাড়ে। আবার বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য গেলে তার মূল্যও বেড়ে যায়। বিধিনিষেধমুক্ত বাণিজ্য নিশ্চিত করার স্বার্থে আরও বেশি স্থলবন্দর চালু, রেল, সড়ক ও নৌপথের সংযুক্তি এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন, নতুন করে কাস্টম, ওয়্যারহাউস এবং অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোর মতো অবকাঠামো নির্মাণ ও জনবল নিয়োগ করতে হবে। তা না হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে না।

দ্বিতীয়ত, আমরা এরই মধ্যে নেপাল ও ভুটানে পণ্য আনা–নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিয়েছি। ট্রানজিটের মাধ্যমে এ দুই দেশে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা বাড়তি কোনো মাশুল যোগ করিনি। আমরা এখনো চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দর ব্যবহারের চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে অপেক্ষায় রয়েছি। দুই বছর আগে চুক্তিটির সম্মত কার্যপ্রণালিবিধি চূড়ান্ত হয়েছিল। ১৮ মাস আগে (কোভিড-১৯–এর সময়) এক দফা ট্রায়াল রানও হয়েছিল। এরপর থেকে কোনো অগ্রগতি নেই।

তৃতীয়ত, উপ-আঞ্চলিক সংযুক্তি ওই এলাকার সব কটি দেশের স্বার্থেই হয়ে থাকে। এর ফলে তৃতীয় দেশে এবং উপ-অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ে। বহুমাত্রিক সংযুক্তির চাহিদা অনেক বেশি। এ বছরের মার্চে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্তি প্রতিষ্ঠা হলে বাংলাদেশের জাতীয় আয় ১৭ শতাংশ বাড়বে এবং ভারতের জাতীয় আয় বাড়বে ৮ শতাংশ। সংযুক্তির পাশাপাশি বাণিজ্যের প্রবিধান এবং অবকাঠামোর উন্নতি হলে ভারতে বাংলাদেশের বাণিজ্য ২৯৭ শতাংশ বাড়বে। তাই আমরা সব সময় সংযুক্তি ও উন্নত পরিবহনের ব্যাপারে আগ্রহী রয়েছি। কত তাড়াতাড়ি তা ঘটবে এবং আমরা কতটা নির্বিঘ্নে সেটা করতে পারব, সেটা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়।

default-image

প্রথম আলো: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সংযুক্তিতে জোর দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাধীনতার আগের সংযোগ পুনরায় সক্রিয় করতে চাইছে। চূড়ান্তভাবে আঞ্চলিক সমৃদ্ধির স্বার্থে বাংলাদেশও ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রধান উপায় হিসেবে সংযুক্তিতে জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে আঞ্চলিক সংযুক্তির বিষয়টিকে ভারত কীভাবে দেখে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: উপ-আঞ্চলিক সংযুক্তি সবার জন্য ভালো। এতে সবাই উপকৃত হয়। বাংলাদেশের জনগণকে এটা যথার্থভাবে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত উত্তর–পূর্বাঞ্চলে যেতে চায়। তেমনি ভারত হয়ে নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি এখন মিয়ানমার যেতে চায় বাংলাদেশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এটা স্পষ্ট করেই বলেছেন। আমাদের যেভাবে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, আপনাদেরও তেমনি আমাদের প্রয়োজন।

সড়কপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেপালের সঙ্গে পারস্পরিক চলাচলের চুক্তি থাকায় ভারতীয় ট্রাক নেপালের সড়কগুলোতে চলতে পারে। তেমনি নেপালের ট্রাক ভারতে চলাচলের সুযোগ পায়। কিন্তু ভুটানের সঙ্গে আমাদের সে ধরনের চুক্তি নেই, ভুটানের ট্রাকগুলো বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ভারতের সড়কগুলোতে চলাচল করতে পারে। কিন্তু ভারতীয় ট্রাক ভুটানের ভূখণ্ডে যেতে পারে না। ইতিমধ্যে সমন্বয়ের কাজটা শুরু হয়েছে। তবে চার দেশের সমন্বিত চলাচল এই সহযোগিতাকে অর্থবহ করে তুলবে। এটিকে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব। আসলে এমন কোনো উদ্যোগ নেই, যেখানে শুধু এক পক্ষই লাভবান হয়। কাজটা আপনাকে এমনভাবে করতে হবে, যাতে সবার স্বার্থ সুরক্ষা হয়।

সড়কপথের বাইরে ধরা যাক রেলের সংযুক্তির বিষয়টি। বাংলাদেশের মানুষ হয়তো জানেন না ১৯৭৬ সালে দুই দেশের সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় রেল ওয়াগন ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য নেপালে এবং নেপাল থেকে বাংলাদেশে পরিবহন করা যায়। রেলে পণ্য পরিবহনের প্রক্রিয়াটা ধীরে হচ্ছে; কারণ, বাংলাদেশ মাত্র এক দশক আগে থেকে রেলের অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে শুরু করেছে। রেলের ব্যাপক সংযুক্তি পুরো অঞ্চলের পাশাপাশি বাংলাদেশের চেহারাটাই পাল্টে দিতে পারে। রেলে পণ্য পরিবহন দ্রুততর, পরিবেশবান্ধব, অনেক বেশি পণ্য পরিবহন করা যায় এবং সংযোগটা হয় কার্যকর।

একইভাবে আসে বিমানবন্দরের প্রসঙ্গটি। পণ্য পরিবহনের বিষয়টি মাথায় রেখে আকাশপথে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারি। এমনকি অভ্যন্তরীণ নৌপথের সংযুক্তির বিষয়টিও। আমরা বেনারস পর্যন্ত আমাদের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছি। এর ফলে ভারত-নেপাল নৌপথের সংযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বেনারস হয়ে নেপাল পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করতে পারে। বাংলাদেশের বিস্তৃত নৌপথ ব্যবহার করে আমরাও ত্রিপুরা পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করতে পারি।

প্রথম আলো: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি ভারতের মানবিক সহায়তা প্রশংসিত। নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম অস্থায়ী সদস্য হিসেবে ভারত এই সংকটের সমাধান নিয়ে কী ভাবছে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই যে এই সমস্যার সমাধান নিহিত—আপনাদের এই অবস্থানটা আমরা বুঝতে পারি এবং বিষয়টি আমরা বলছি। চার বছর পেরোনোর পর সমস্যার সমাধানটা টেকসই, নিরাপদ ও যতটা সম্ভব দ্রুততর হতে হবে। বিপুলসংখ্যক লোকজনকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, সে জন্য আমরা সহানুভূতিশীল রয়েছি। এটি বাংলাদেশের জন্য বিরাট বোঝা তৈরি করেছে।

এ সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনাকে আমরা সমর্থন করি। পাশাপাশি মিয়ানমার যাতে তাদের লোকজনকে ফিরিয়ে নেয়, সে জন্য আমরাও তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরির স্বার্থে আমরা সেখানে উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো তৈরি করেছি। তবে এসব কাজের বেশির ভাগই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে থমকে গেছে।

আরাকান আর্মি সেখানে বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠার দরুন গত বছরের তুলনায় সহিংসতা বেড়েছে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে লোকজনকে ফিরে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের জন্য চাপ দেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি জটিল হলেও আমরা দুই পক্ষকে সহায়তার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করছি। আমাদের দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব, এই সমস্যার সমাধান হওয়া জরুরি।

default-image

প্রথম আলো: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। চীনের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বিআরআই), যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (আইপিএস) এবং জাপানের বিগ-বির(বঙ্গোপসাগরে শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল) মাধ্যমে আঞ্চলিক মেরুকরণের বিষয়টিকে ভারত কীভাবে দেখছে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আমরা এর নিজস্ব গুরুত্ব ও কৌশলগত বিবেচনার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখি। আমাদের এই সম্পর্কের নিজস্ব একটা ভিত্তি রয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিককে আমরা বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখি, যেখানে কাউকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গটি নেই। আমরা বারবার এটা বলে আসছি। এই অঞ্চলে বসবাসরত সবার পাশাপাশি এই অঞ্চলের আশপাশে যারা আছে, তাদেরও আমরা এতে রাখছি। আমাদের কাছে এর বিস্তৃতি পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগর, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সব দেশ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশসহ আমাদের প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ।

ইন্দো-প্যাসিফিক যেহেতু কোনো জোট নয়, তাই এ নিয়ে কারও সতর্কতা কিংবা সন্দেহের কোনো কারণ দেখছি না। এটি সামুদ্রিক অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মের সুযোগ তৈরি করেছে। যেখানে নানা ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু নিরাপত্তাই নয়, সামুদ্রিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক পরিবেশসহ নানা ক্ষেত্রে আরও বেশি সহযোগিতামূলক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বকে সামনে এনেছে।

ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশ থাকবে কিংবা থাকবে না, বিষয়টিকে আমরা এভাবে দেখছি না। আমরা এটিকে কোনোভাবে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি না। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে। এ নিয়ে আমরা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী নই।

প্রথম আলো: কেউ কেউ আইপিএসকে চীনকে প্রতিহত করার নীতি মনে করে।

বিক্রম দোরাইস্বামী: আপনি যেখানে সবাইকে যুক্ত করতে চাইছেন, সেখানে প্রতিহত করার প্রসঙ্গটি আসে কোথা থেকে? সবাইকে যুক্ত করাটাই আমাদের ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি। এশিয়া এবং ইউরো এশিয়ার অনেক বন্ধুকে আমরা বলেছি, তোমাদের যদি কারও ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তোমরা সেটা জানাও। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার আমাদের ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি কী, সেটা স্পষ্ট করেছেন। এই অঞ্চলে রাশিয়া, চীন কাউকেই তো আমরা বাদ দেওয়ার কথা বলছি না। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আপনি যখন অন্যকে একই প্ল্যাটফর্মে রাখছেন, তাকে প্রতিহত করছেন কীভাবে?

প্রথম আলো: অর্থনীতির পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেড়ে চলেছে। বিষয়টিকে ভারত কীভাবে দেখছে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আমরা দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের প্রেক্ষাপট থেকে দেখি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অন্যদের কারণে হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের আলাদা নিজস্ব ধরনে গড়ে উঠেছে। এটা আমরা নিজেদের সম্পর্কের নিরিখে মূল্যায়ন করব। কাজেই অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থানটা একেবারেই স্পষ্ট। আমাদের অংশীদারত্বের জন্য যেটা আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি, সে জন্যই আমরা কাজ করব। আমাদের অগ্রাধিকার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই সেটা ঠিক করবে।

প্রথম আলো: আপনি বলছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ক ‘কৌশলগত’ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পর থেকে সীমান্তের দুই পাশেই লেখালেখি ও আলোচনা দুটোই হয়েছে। এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

বিক্রম দোরাইস্বামী: অন্যরা কে, কী লিখছেন, সেটার ব্যাখ্যা দেওয়াটা আমার উচিত হবে না। যাঁরা এ নিয়ে লিখছেন, এ প্রশ্নটা আপনি বরং তাঁদেরই করুন। মুক্তিযুদ্ধ, অভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সর্বোপরি ভৌগোলিক অবস্থানের অনন্য ও অতুলনীয় উৎসের ওপর ভিত্তি করে যে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আমাদের মধ্যে শক্তিশালী ও নিবিড় বন্ধুত্ব না থাকলে কারও জন্য সমৃদ্ধি আসবে না। কোনো পক্ষেরই বলার সুযোগ নেই, এই সম্পর্কটা দূরের কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, তেমনই একটা সম্পর্ক।

প্রথম আলো: দুই দশকের বিরতির পর তালেবান আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরেছে। আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য ধর্মীয় উগ্রপন্থা বিস্তৃতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরাটা ভারত কীভাবে দেখে?

বিক্রম দোরাইস্বামী: আফগানিস্তান নিয়ে ভারতের নীতি কী হবে, তা নিয়ে আমার কথা বলার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে আমাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে আফগানিস্তান নিয়ে আমাদের বিবৃতির মধ্য দিয়ে ভারতের অবস্থানটা স্পষ্ট। সব রাজনৈতিক মতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, নারীর অধিকার এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার মতো প্রশ্নগুলোর সুরাহা হয়নি। জটিল এসব প্রশ্নের একটিরও উত্তর পাওয়া যায়নি।

এটা খুব স্পষ্ট যে আফগানিস্তানে যা ঘটছে, তা পুরো অঞ্চল এবং তার বাইরের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অবস্থান আফগানিস্তান থেকে কিছুটা দূরে হতে পারে। তবে ভারতের মতো বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে।

প্রথম আলো: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবের প্রসঙ্গটি কারও অজানা নয়। জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্বাস করে, ভারতের পছন্দের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে আপনার মতামত কী?

বিক্রম দোরাইস্বামী: এমন প্রভাব যদি থেকেই থাকে, সেটা তো আমার জন্য একটা খবর! আমরা নিকট প্রতিবেশী। কাজেই এক দেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে অন্য দেশের আগ্রহ থাকাটা দুই দেশের দিক থেকেই তো স্বাভাবিক। কাজেই একে অন্যকে বোঝার জন্য অনেক সময় দেওয়াটা আমার কাছে পুরোপুরি যৌক্তিক মনে হয়। যেহেতু এক দেশের পরিস্থিতি অন্য দেশে প্রভাব ফেলে, তাই আমাদের এটা করে যাওয়া উচিত।

গত ৫০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আমরা সব সময় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। কখনো বলিনি, আমরা কারও সঙ্গে কথা বলব না। ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ আমাদের প্রতিবেশী। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ একটি বড় রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের যুক্ত না থাকার সুযোগটা কোথায়? আমরা অবশ্যই আশা করি, বাংলাদেশে যে–ই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশের জনগণ যাদের নির্বাচিত করে ক্ষমতায় পাঠাবে, আমরা তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। বাংলাদেশে অতীতে যারাই ক্ষমতায় ছিল, এমনকি সামরিক শাসনামলেও ভারতের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। কাজেই ক্ষমতায় যারাই আসুক, তারাই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার কথা ভাববে—এটাই আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। আর আমরাও চাই, যে–ই ক্ষমতায় আসুক, সুসম্পর্ক থাকুক।

এটা আমাকে অবশ্যই বলতে হবে যে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে বার্তা দিয়ে গেছে। কাজেই আমরাও তাদের সেই বার্তায় সাড়া দিতে চেয়েছি, যদিও আমাদের বার্তা কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশের প্রতি। জনগণের প্রতি। আমরা এটিকে দুই সরকারের প্রেক্ষাপট থেকে দেখি না।

বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জটিলতা আমরা বুঝতে পারি। ’৭১–এর মূল্যবোধ এবং অন্যান্য কিছু মূল্যবোধসহ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের জনমতের সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারি। কাজেই আমরা বাংলাদেশের সবার সঙ্গে যুক্ত থাকব এবং এই লক্ষ্যে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

default-image

প্রথম আলো: এই ডিসেম্বরে আমরা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্‌যাপন করছি। পরের ৫০ বছরে সম্পর্কটাকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

বিক্রম দোরাইস্বামী: ভারতের বর্তমান সরকার, বিরোধী দলসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা সবাই বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। আশা করি, পরের ৫০ বছরে রাজনৈতিক সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব। রাজনৈতিক স্রোত থাকবেই। এটাও ঠিক যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে আমাদের নৈকট্য বেশি হওয়ার কারণে সম্পর্কের ওঠানামা হয়েছে। তবে আমরা যদি এগুলোকে একদিকে সরিয়ে রেখে ব্যবসা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা যা আমাদের দুই দেশের জনগণকে কাছাকাছি আনে তার ওপর নজর দিই, তবে ভবিষ্যতে সম্পর্ক অনেক শক্তিশালী হবে। আমরা যখন একসঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারব, ধনী হয়ে উঠব, সহযোগিতার ধারাটা বাড়তে থাকবে, তখন রাজনীতি এক পাশে সরে যাবে এবং সেটি আর সম্পর্কের মূল চালিকা শক্তি থাকবে না।

ভারতের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে রাজনীতি সব সময় আমাদের সম্পর্কের মূল নিয়ামক বলে মনে করি না। ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুই দেশের জনগণের মেলবন্ধন, সংস্কৃতি ও শিক্ষাই সম্পর্কের চালিকা শক্তি হওয়া উচিত। এটি করতে পারলে পরের ৫০ বছরের অগ্রযাত্রা অনেক বেশি স্থিতিশীল হবে বলেই বিশ্বাস করি।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

বিক্রম দোরাইস্বামী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

(শেষ)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন