default-image

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের আনুষ্ঠানিক প্যারেডের নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল সম্মানের অধিকারী হলো বাংলাদেশ। প্রতিবেশী এই দেশের তিন বাহিনীর ১২২ জনের সমন্বিত চৌকস দলকে প্যারেডের নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হলো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর শহীদ জওয়ানদের। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনেরও এটি ছিল এক অভিনব নজির। প্যারেডের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ব্যান্ডে বেজেছিল ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি’ গানের সুর–মূর্ছনা, যা ৫০ বছর আগের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি উসকে দিয়েছিল। ঘনিষ্ঠতম বন্ধু প্রতিবেশীর এই বিরল সম্মাননা সত্ত্বেও জেগে থাকছে ৫০ বছরেও বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হতে না পারার বিস্ময়!

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ রাজতন্ত্র থেকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে উত্তরণ ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। সেদিনই সমর্পিত হয় ভারতীয় সংবিধান। সেই দিন থেকেই শুরু এই আনুষ্ঠানিক প্যারেড, যা ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত লালকেল্লা, রামলীলা গ্রাউন্ড অথবা অন্যত্র আয়োজন করা হয়েছে।

প্রশস্ত রাজপথে এই প্যারেড নিয়ে আসা হয় ১৯৫৫ সালে। সেই থেকে দিন দিন এই আনুষ্ঠানিকতার রং, রূপ, জৌলুশ ও ঝলকানি বেড়েছে। প্যারেড হয়ে উঠেছে ভারতীয় শক্তি, সমৃদ্ধি ও বৈভবের গৌরবগাথা, যার সাক্ষী থেকেছেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়কেরা। বাংলাদেশ তৃতীয় দেশ, যার সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত দল এই প্যারেডে অংশ নিল। ২০১৬ সালে ফ্রান্সের পদাতিক রেজিমেন্ট এবং তাদের সেনা ব্যান্ড প্রথম বিদেশি দেশ হিসেবে প্যারেডে অংশ নেয়। ২০১৭ সালে আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের গার্ড ও সেনা ব্যান্ড। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তারা কেউ প্যারেডের নেতৃত্ব দেয়নি। সেই অর্থে বাংলাদেশের এই সম্মান অনন্য। স্বীকৃতিও অভিনব।

প্রথম বছর, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারির প্যারেডে প্রধান অতিথি ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ। পরের বছর নেপালের রাজা ত্রিভুবন বীর বীক্রম শাহ। ১৯৫২ ও ৫৩ সালে বিদেশি অতিথি না এলেও ৫৪ সালে আসেন ভুটানের রাজা জিগমে দোরজি ওয়াংচুক। ৫৫ সালে প্রথম রাজপথে অনুষ্ঠিত হয় প্যারেড। সেখানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মালিক গুলাম মহম্মদ। পাকিস্তানের শেষ অংশগ্রহণ ১৯৬৫ সালে। এসেছিলেন সে দেশের খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী রানা আবদুল হামিদ। ১৯৬৬ সালের প্যারেডও ছিল বিদেশি অতিথিবিহীন। তারপর এবার। কোভিডের জন্য ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আমন্ত্রিত হয়েও আসতে পারলেন না।

আশ্চর্যের এটাই, যার স্বাধীনতায় ভারতের অবদান সবচেয়ে বেশি, যে দেশকে ভারত সবার আগে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী এই ৫০ বছরে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডের প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতে পারেননি। অথচ গত ৭২ বছরে এই বিশেষ দিনে ফ্রান্স ও ব্রিটেন প্রধান অতিথি পাঠিয়েছে পাঁচবার করে। ভুটান, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও রাশিয়া চারবার করে এবং ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও মরিশাস তিনবার করে। জাপান, নেপাল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও পূর্বতন যুগোস্লাভিয়া দুবার করে প্রধান অতিথি হয়েছে। বাকি সব দেশ একবার করে। ২০১৮ সালে আশিয়ানভুক্ত ১০ দেশ একযোগে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ ১৯৭১ সালে। পরের বছর ৭২–এ প্রধান অতিথি হয়ে আসেন মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী সিউসাগর রামগুলাম। দক্ষিণ এশিয়ার অতিথির তালিকায় একমাত্র ব্যতিক্রম সার্ক সদস্য বাংলাদেশ!

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনাররাও এই বিস্ময় চেপে রাখতে পারেননি। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত হাইকমিশনারের দায়িত্বে থাকা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা সত্যিই বিস্ময়কর! এভাবে বিষয়টি ভেবেও দেখিনি কখনো!’ পিনাক রঞ্জন ২০০২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ছিলেন চিফ অব প্রটোকল। পরের বছর থেকে ঢাকায়। এই ছয় বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে তিনি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্য তার আগে বা পরে বাংলাদেশকে ডাকা হয়েছে কি না বা হলেও তাঁরা আমন্ত্রণ রক্ষা করতে অপারগতার কথা জানিয়েছিলেন কি না বলতে পারব না। তবে কেন এত দিনেও ডাকা হয়নি, সেই কারণও আমার জানা নেই।’

সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখোপাধ্যায়ও বিস্মিত। তাঁর কথায়, ‘এর কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে অন্তত নেই। কাকে প্রধান অতিথি করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে। তারা দায়িত্ব এড়াতে পারে না।’

বিজ্ঞাপন

সাবেক হাইকমিশনার মুচকুন্দ দুবের অবশ্য এ–সংক্রান্ত একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বহু বছর পর্যন্ত ভারতের কাছে সামরিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বহীন ছিল। কিন্তু এটাও ঠিক, সেই অবস্থার বদল অনেক দিন হলো ঘটেছে। ভারতের উৎপাদন শিল্প রপ্তানিতে বাংলাদেশের স্থান এখন প্রথম চারটি দেশের মধ্যে। নিরাপত্তার দিক থেকেও এই দেশ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক সূচকের বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় এগিয়ে। কাজেই সেই উপলব্ধি এখনো না এলে তা নেহাতই দুর্ভাগ্যজনক।’ ১৯৭৯ থেকে ৮২ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্ব থাকা এই সাবেক পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের গুরুত্বের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে থাকি বলে অনেকেই আমায় ঠাট্টা করে বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলে ডাকেন। আমার মনে হয়, শেখ হাসিনার আমলে ভারতের অর্জনে বাংলাদেশের যা অবদান, তাতে একবার অন্তত তাঁকে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি করা যেত।’

বীণা সিক্রি ২০০৩ থেকে ২০০৬ ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। তাঁর আমলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ পাননি জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন হয়নি সেটা দুর্ভাগ্যের। কেন হয়নি তা বলতে পারব না। এই না ডাকা অবশ্যই বিস্ময়কর! তবে ভবিষ্যতে নিশ্চিতই হবে বলে আমার বিশ্বাস। দুই দেশের স্বার্থ ও ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সম্পর্কও গভীর।’

বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো ও ভারত–বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত এই প্রসঙ্গে গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন ভেবে দেখিনি, কিন্তু এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের সম্পর্ক দৃঢ়, ঘনিষ্ঠ, অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ও প্রতিবেশী। অথচ এত দিনেও তাদের ডাকা হয়নি! আশ্চর্যের বিষয় এটাই।’ শ্রীরাধা বলেন, ‘এই বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় পার্টনার থেকে ক্রমশ ভারতের আঞ্চলিক পার্টনার হয়ে গেছে। ভারতের আজ সবকিছুতেই বাংলাদেশের সাহচর্য প্রয়োজন। কী কারণে এত দিনেও এমন বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী আমন্ত্রণ পায়নি জানি না। আশা করি, আগামী দিনে সেই সম্মান তারা পাবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন