default-image

কলেজবেলার কথা। সরস্বতীপূজার আগের দিন। পীযূষ বলল, ‘পালবাড়ি যাচ্ছি সরস্বতী ঠাকুর কিনতে। যাবি নাকি?’ বললাম, ‘চল, যাব।’ গেলাম।

পালবাড়ি সারি সারি সরস্বতীর মূর্তি সাজানো। দু–একজন আসছে, দেখে–শুনে বেছে তাদের পছন্দের মূর্তি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। পীযূষ সেদিকে তাকালই না। পালবাড়ির মুরব্বি গোছের এক লোকের নামের শেষে ‘কাকু’ যোগ করে ডাকতে ডাকতে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। খানিকক্ষণ পর বিরাট একটা ধামায় করে একটা সরস্বতীর মূর্তি নিয়ে বের হলো। খেয়াল করে দেখলাম, বাইরের সাজানো মূর্তিগুলোর সঙ্গে পীযূষের মূর্তির পার্থক্য আছে।

 সাজানো সরস্বতীর মূর্তিগুলো পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘শুক্লবর্ণা, পীতবস্ত্রধারিণী এবং বীণা ও পুস্তকহস্তা’। কিন্তু পীযূষের ধামায় যে সরস্বতী দেবী, তার গায়ের বস্ত্র পীতবর্ণের নয়, তার গায়ে সাদা শাড়ি।

পীযূষ বলল, ‘প্রতিবছর বাবা অর্ডার দিয়ে এই ঠাকুর বানায়। ডিজাইনটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।’ আমি বললাম, ‘রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন। তিনি সরস্বতীর মূর্তির ডিজাইন করতে যাবেন কেন?’ সে বলল, ‘পুরস্কার কবিতা পড়েছিস?’ আমি বললাম, ‘হুঁ, পড়েছি।’ সে বলল, ‘ওই কবিতার মধ্যেই সরস্বতীর চেহারার বর্ণনা দিয়েছেন রবিঠাকুর। আমার বাবা রবিঠাকুরের দেওয়া সেই বর্ণনা অনুযায়ী পালকে মূর্তি বানানোর অর্ডার দেন।’

 ‘পুরস্কার’ কবিতার মধ্যে যে গল্প আছে তাতে দেখা যায়, একজন কবি তাঁর স্ত্রীর চাপাচাপিতে পড়ে রাজাকে নিজের লেখা কবিতা শোনাতে যান। রাজার সামনে নিজের রচনা পড়ার আগে সেই কবি সরস্বতীর বন্দনা করেন—

‘প্রকাশো, জননী, নয়নসমুখে

প্রসন্ন মুখছবি

বিমল মানসসরসবাসিনী,

শুক্লবসনা শুভ্রহাসিনী,

বীণাগঞ্জিত মঞ্জুভাষিণী

কমলকুঞ্জাসনা,

তোমারে হৃদয়ে করিয়া আসীন

সুখে গৃহকোণে ধনমানহীন

খ্যাপার মতন আছি চিরদিন

উদাসীন আনমনা’

পীযূষের বাবা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস স্থানীয় একটি কলেজের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথ সরস্বতীর যে বর্ণনা দিয়েছেন, হুবহু সেটা মেনে তিনি এই মূর্তির অর্ডার দিয়েছেন। দেখলাম, পীযূষের ধামায় ‘বিমল মানসসরসবাসিনী, শুক্লবসনা শুভ্রহাসিনী, বীণাগঞ্জিত মঞ্জুভাষিণী কমলকুঞ্জাসনা’ হিসেবেই সরস্বতী একটি পদ্মফুলের ওপর বীণা হাতে সাদা শাড়ি পরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বসে আছে।

পদ্মপুরাণের সরস্বতীস্তোত্রম্-এ যে বর্ণনা আছে, সেখান থেকেই সম্ভবত রবিঠাকুরের ডিজাইনটি এসেছে। সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বলা হচ্ছে:

শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।

শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা।

শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।

শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা।

অর্থাৎ, ‘দেবী সরস্বতী আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা।’

বোঝা যাচ্ছে, ‘শ্বেত’, অর্থাৎ সাদাকে ঘিরেই সরস্বতীর অধিষ্ঠান। এই সাদা রঙের বিশেষ তাৎপর্য আছে। শান্তি ও যাবতীয় শুভর প্রতীক সাদা রং। সরস্বতী সনাতন ধর্মবিশ্বাসীদের জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার দেবী। এসব সুকুমার শিল্প শান্তির প্রতিনিধিত্ব করে। আর শান্তির প্রতীক হলো সাদা।  

পশ্চিমা দুনিয়ায় ‘মিউজ’ বলে একটি কথা আছে। গ্রিক পুরাণমতে, মিউজ হচ্ছে সংগীত, সাহিত্য এবং কলার নয়জন দেবী। এঁদের মধ্যে প্রধান মিউজের নাম ক্যালিওপি, যিনি ছিলেন মহাকাব্য বা বীরত্বগাথার দেবী। ক্লিও ছিলেন ইতিহাসের দেবী। এরাতো ছিলেন প্রেমের কবিতা, গীতিকবিতা ও বিয়ের গানের মিউজ। এ ধরনের আরও ছয়জন মিউজ ছিলেন। পুরাণমতে, টাইটান দেবী নেমোসাইনের সঙ্গে দেবরাজ জিউসের মিলনের ফলে এই মিউজদের জন্ম হয়। এই মিউজ থেকেই ‘মিউজিক’ কথাটি এসেছে।

হোমারের ইলিয়াড এবং অডিসি থেকে শুরু করে জন মিল্টনের প্যারাডাইসলস্ট—এ রকম সব মহাকাব্যের শুরুতে কাব্যদেবী হিসেবে মিউজদের বন্দনা করা হয়েছে। আধুনিক অনেক ইংরেজ কবির কবিতায়ও এসব কাব্যদেবীর বন্দনা আছে।

রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় অমিত মনে মনে এক অদৃশ্য নিবারণ চক্রবর্তীকে কাব্যদেবতা হিসেবে ধরে নিয়ে তার কাছে বাণী প্রার্থনা করে। যখন মনের কাব্যস্রোত থেমে যায়, যখন কবিতা আসতে চায় না, তখন ‘বারান্দায় ঘন ঘন পায়চারি করতে করতে অমিত মনে মনে বলে ওঠে, ‘‘কোথায় আছ নিবারণ চক্রবর্তী। এইবার ভর করো আমার পরে, বাণী দাও, বাণী দাও!”’ পশ্চিমের মহাকবিরাও অমিতের মতো কাব্যদেবীদের তুষ্ট করতে  ‘ও হেভেনলি মিউজ!’-বলে মহাকাব্যের প্রেল্যুড বা গৌরচন্দ্রিকা শুরু করেছেন।

লক্ষ করার বিষয় হলো, পশ্চিমের এই মিউজদের বন্দনা হতো উচ্চশিক্ষিত সমাজে। উচ্চমার্গীয় সাহিত্য ও ধ্রুপদি সংগীতচর্চার সঙ্গে
সংশ্লিষ্ট লোকজন ছাড়া এই মিউজদের কেউ চিনত না। অর্থাৎ সমাজের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশের
দেবী হিসেবে এঁরা পূজিত হতেন। সমাজের একেবারের নিচের তলার মানুষের কাছে মিউজদের কোনো মূল্য ছিল না।

কিন্তু সরস্বতীর ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা গেল না। জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার দেবী মেনে প্রতিবছর বসন্তপঞ্চমী (মাঘ মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথি) তিথিতে এ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব শ্রেণির সদস্য গভীর শ্রদ্ধায় সরস্বতীপূজা করে থাকেন। এই দিনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতেখড়ি দেওয়া হয়। এই দিনে সরস্বতী ধনাঢ্য থেকে হতদরিদ্র, ব্রাহ্মণ থেকে নমশূদ্র—সবার কাজে সর্বজনীন ‘মিউজ’ হয়ে ওঠে। সরস্বতীর এক হাতে বীণা এবং অন্য হাতে পুস্তক থাকলেও বহু আগে তাকে প্রধানত সংগীতের দেবী হিসেবে পুজা করা হতো। কিন্তু এখন বিশেষত বাংলা ভাষাভাষীদের এই অঞ্চলে সরস্বতী কার্যত ‘মিউজ অব এডুকেশন’। যাকে বলে একাডেমিক ও পুঁথিগত বিদ্যার দেবী। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই সেদিন তাঁর কাছে বিদ্যা প্রার্থনা করে। নাম সই করতে পারে না, এমন লোকেরাও এই দিন সমস্বরে আওয়াজ তোলে—
‘নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল লোচনে।’
এই দিক থেকে দেখলে সরস্বতীই হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সাম্যবাদী দেবী।

সারফুদ্দিনআহমেদ, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0