default-image

সর্দি-জ্বর, গলাব্যথা ও কাশি নিয়ে কাজী ফেরদৌস (৩৫) কুমিল্লা থেকে বাড়ি ফিরে আটকা পড়েছিলেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যদের মুখোমুখি হননি। আসার সময় কারখানার মালিক পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। গাড়িভাড়া আর ওষুধ কিনতেই তা ফুরিয়ে যায়। সেই ওষুধেও কোনো কাজ হয় না। আবার ডাক্তার দেখাবেন, সেই টাকাও নেই। এই সময় একদিন হাসপাতালের চিকিৎসকেরাই তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। করোনা পরীক্ষার নমুনা নিয়ে যান। তাঁদের চিকিৎসাতেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। শুধু এক কাজী ফেরদৌস নন, করোনা পরিস্থিতির শুরুর সেই অতিমারির দিনগুলোতে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা নিজেরাই ৩৬২ জন রোগীর বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দেন।

সাধারণত টিকিট কেটে সারিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর হাসপাতালে চিকিৎসকের সাক্ষাৎ মেলে। এটি দেশের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থার একটি সাধারণ চিত্র। করোনাকালে কোথাও কোথাও এ অভিজ্ঞতা ছিল আরও তিক্ত। সেই সময়ে প্রথাগত এই চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্র পাল্টে দিয়েছিলেন এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা। গত ৪ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তাঁরা এই সেবা দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে শুরু

করোনা পরিস্থিতির একদমই শুরুর দিকের কথা। সরকারিভাবে নির্দেশনা তৈরি হলেও লিখিতভাবে মাঠপর্যায়ে এসে পৌঁছায়নি। আসেনি স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীও। যেভাবে করোনাপীড়িত এলাকা থেকে মানুষ আসছেন, তাঁরা যদি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসতে শুরু করেন, তাহলে তাঁদের মাধ্যমে অনেক মানুষ ঝুঁকিতে পড়বেন। পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও নিরাপত্তার প্রয়োজন। তাঁদের সুস্থ রাখতে হবে। সেই তাগিদ থেকে তাঁরা নিজেরাই স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ করলেন। এমনটাই জানালেন বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানী।

এরপর তাঁরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি করোনা সেলও গঠন করেন। এই সেলের মাধ্যমে প্রচার করা হয় সর্দি, কাশি, জ্বর, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের কোনো রোগীকে হাসপাতালে আসতে হবে না। চিকিৎসকেরাই তাঁদের বাড়িতে যাবেন। নমুনা নেবেন।

default-image

গঠিত হলো ভ্রাম্যমাণ দল

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি ভ্রাম্যমাণ দল গঠন করে দেওয়া হয়। এই দলে ছিলেন চিকিৎসক নূরুন্নাহার, ফয়সাল আহমেদ, গোলাম সারোয়ার, মার্জিয়া আহসান, আবদুল মোত্তালেব ও জাফরিনা জান্নাত, ল্যাব টেকনিশিয়ান আবুল কালাম, সাইদুর রহমান, ইপিআই টেকনিশিয়ান গোলাম মোস্তফা এবং অ্যাম্বুলেন্সের চালক সাইফুল ইসলাম। হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এই দল উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটে গেছে। এই সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক নূরুন্নাহার, ফয়সাল আহমেদ ও মার্জিয়া আহসান করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

default-image

ভালো আছেন এখন

বাগমারা উপজেলার প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী জাহাঙ্গীর হোসেন (২৫) নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছিলেন। তাঁর বাড়ি যাত্রাগাছী গ্রামে। তিনিও সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। মুঠোফোনে বলেন, অনেক ভয় ছিল। পরিবারের সদস্যদের থেকে আলাদা হয়ে থাকতে হয়েছে। এ অবস্থায় চিকিৎসকেরা বাড়িতে এসে চিকিৎসা দিয়েছেন। এটা ছিল অনেক বড় ব্যাপার।

আমাদের জন্য ছিল বিরল অভিজ্ঞতা আমিরুল ইসলাম, আবাসিক চিকিৎসক, বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আমরা একদিন বড়বিহান আলী গ্রামে যাচ্ছিলাম। অ্যাম্বুলেন্স রোগীর বাড়ি পর্যন্ত আর যায় না। রাস্তা নেই। অনেক দূর আমরা হেঁটে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তি ভর করল ঠিকই, কিন্তু ভালো লাগছিল। কারণ, দল বেঁধে মানুষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলাম। এ আমাদের জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা। আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল, এ কাজের পাশাপাশি হাসপাতালের জরুরি বিভাগটাও আমাদের সামলাতে হয়েছে।

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

মামুনুর রশীদ বাগমারা (রাজশাহী) প্রতিনিধি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0