পাবনার বেড়া উজেলার যমুনাপাড়ের পেঁচাকোলা গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে গ্রামটিতে বাস করছেন প্রায় ১৫ বছর ধরে। খুব কষ্টে দিন কাটছিল তাঁর। তবে দিন বদলাতে শুরু করেছে তাঁর। বছর পাঁচেক আগে যমুনায় চর জেগে ওঠায় তিনি ফিরে পেয়েছেন নদীভাঙনে হারানো ১৫ বিঘা জমি। সেই জমিতে বাদাম করে পেয়েছেন সুখের দেখা। 
হাফিজুর বলেন, ‘এ বছর প্রতি বিঘায় আট মণ কইর্যাে বাদাম হইছে। বাদামের এমন ফলন জীবনে দেখি নাই। বাজারে দুই হাজার টাকা মণ দরে বাদাম বেইচ্যা সব খরচ বাদ দিয়্যা এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা লাভ হইছে। এ রকম লাভ পালি ভাঙনের কষ্ট ভুলতি বেশি দিন লাগবি না।’
হাফিজুরের এর মতো বেড়া উপজেলার সব বাদামচাষির মুখে এমন সাফল্যের হাসি। এ হাসি ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার প্রায় ২০টি বাদাম কারখানায় কর্মরত সহস্রাধিক নারী শ্রমিকের মধ্যে। এ ছাড়াও উপজেলার চরাঞ্চল ও যমুনাপাড়ের গ্রামগুলোতে বাস করা হাজারো নারী ও শিশু বাদামগাছের শিকড় থেকে বাদাম ছাড়িয়ে পাচ্ছেন বাদামগাছ। এই বাদামগাছ রান্নার জন্য ভালো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, পলি মেশানো বেলেমাটির কারণে বেড়া উপজেলা এখন দেশের অন্যতম বাদাম উৎপাদনকারী এলাকা। এ এলাকার বাদামের মানও বেশ ভালো। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে যমুনার চর। এই সাত ইউনিয়নের চরবাসীর আয়ের প্রধান উৎস বাদাম চাষ।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলার এক হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বাদামের চাষ হয়েছে। ভালো ফলন হওয়ায় এবার প্রতি বিঘায় আট মণ হিসেবে মোট ফলন হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মণ। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এ বছর বেড়ায় উৎপাদিত বাদামের দাম ১৬ কোটি টাকারও বেশি।
পেঁচাকোলা গ্রামের কৃষক আরমান কাই হিসাব দিয়ে বলেন, এক বিঘা জমিতে বাদাম চাষের মোট খরচ সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা। বাদাম চাষ করার পর অন্যান্য ফসলের মতো কীটনাশক, সার ও সেচ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনকি যত্ন নেওয়ারও তেমন প্রয়োজন নেই। বাদাম পরিপক্ব হওয়ার পর খেত থেকে তোলার খরচ বিঘাপ্রতি আরও দুই হাজার টাকা। অর্থাৎ চাষ ও তোলা বাবদ মোট খরচ পাঁচ হাজার টাকা। এবার প্রতি বিঘায় আট মণ ফলন পাওয়া গেছে। দুই হাজার টাকা হিসাবে এর দাম ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘায় লাভ ১১ হাজার টাকা। অথচ বোরো আবাদে বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ করে এ বছর আট থেকে নয় হাজার টাকার ধান পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চরাঞ্চল ও যমুনাপাড়ের প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠোনে বা সামনের আঙিনায় রয়েছে বাদামগাছের স্তূপ। গ্রামের নারী ও শিশুরা সেসব স্তূপ থেকে বাদামগাছ নিয়ে সেগুলোর শেকড়ের সঙ্গে লেগে থাকা বাদাম ছাড়াতে ব্যস্ত।
নাকালিয়া, নগরবাড়ী আর বাঁধেরহাটে গড়ে উঠেছে বাদামের হাট ও বাজার। হাটবারে বাদামচাষিরা বস্তাভর্তি করে বাদাম এনে তোলেন এসব হাটে। নাকালিয়া বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাদামের আড়তদার রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘বেড়ার বাদামের দানা বড়, স্বাদও ভালো। তাই বেড়ার বাদামের সুনাম ও দাম অন্য এলাকার চেয়ে বেশি। বাদাম ওঠার মৌসুমে হাটবারে নাকালিয়ায় চার থেকে পাঁচ হাজার মণ বাদামের আমদানি হয় এবং আট থেকে দশ ট্রাক বাদাম দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।’
এদিকে চরে উৎপাদিত বাদামের ওপর ভিত্তি করে উপজেলার নগরবাড়ী, নাটিয়াবাড়ী, কাশীনাথপুর প্রভৃতি এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি বাদাম কারখানা। এসব কারখানায় বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দানা বের করা হয়। এরপর সেই দানা পাঠানো হয় স্কয়ার (রুচি), প্রাণ, ইউনিভার্সালসহ বিভিন্ন খাদ্যপ্রস্তুত ও প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানে। উপজেলার বাদাম বিভিন্ন কারখানায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে অন্তত এক হাজার নারীর।
নগরবাড়ীতে অবস্থিত একটি বাদাম কারখানার মালিক আবদুর রউফ বলেন, ‘আমার কারখানায় প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মণ বাদামের খোসা ছাড়ানো হয়। কাজটি করে থাকেন ৫০ থেকে ৫৫ জন মহিলা শ্রমিক।’
কারখানায় কাজ করা মরিয়ম বেগম (৪৫), তারাবানুসহ (৪০) চার-পাঁচজন শ্রমিক জানান, বাদাম কারখানায় কাজ করে দৈনিক ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা করে মজুরি পানা তাঁরা। এতেই চলে তাঁদের সংসার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0