বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভোরের সূর্যের প্রথম আলোয় অবগাহন করব বলে যখন আশায় বুক বাঁধছি, তখন আমাদের মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁদের কথা, বিগত বছরগুলোয় আমরা যাঁদের হারিয়েছি। প্রথম আলোর দুজন জ্যেষ্ঠ ও সেরা কর্মী মিজানুর রহমান খান ও অরুণ বসু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কোভিডে আক্রান্ত হয়ে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলে গেছেন আরেকজন সহকর্মী আবুল কালাম আজাদ। এই সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও নিয়মিত লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ।

আমাদের সার্বক্ষণিক শিক্ষক এবং পরামর্শক আনিসুজ্জামানকে আমরা হারিয়েছি করোনায়। কত কিছু যে তাঁর কাছ থেকে শিখেছি, জেনেছি। হারিয়েছি আরও অনেককে। তা থেকেই বোঝা যায়, কোভিডের আঘাত কত অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন করেছে জাতিকে।

আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

অশ্রুভেজা চোখ নিয়েই আমরা সামনে তাকাই। বলি, ভোর হচ্ছে, আলো আসছে, আপনাদের দেখিয়ে দেওয়া আদর্শের পথেই আমরা হাঁটব, এগিয়ে যাব সামনে।

আমরা গত দুই বছরে আরও হারিয়েছি জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতো জাতীয় অধ্যাপক, গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির চেয়ারম্যানকে। আমরা হারিয়েছি আমাদের মিডিয়াস্টার লিমিটেড কোম্পানির চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানকে। আমরা বলব, প্রথম আলোর পথ হলো অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর দেখিয়ে দেওয়া পথ, প্রথম আলোর পথ হলো অসলো বিজনেস ফর পিস পুরস্কারপ্রাপ্ত সৎ, নির্ভীক ব্যক্তিত্ব লতিফুর রহমানের প্রদর্শিত পথ। তাঁদের আদর্শের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বলব, আমরা সৎ থাকব, বিনয়ী ও আদর্শবাদী থাকব, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ থাকব, স্বাধীন ও সাহসী থাকব; আমাদের কলম থাকবে শৃঙ্খলমুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা গণতান্ত্রিক, বৈষম্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও একটি মানবিক আধুনিক দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই সব কার্যক্রম পরিচালনা করব।

প্রথম আলোয় আস্থা রাখার জন্য ধন্যবাদ

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গবেষণা প্রতিষ্ঠান কান্তার–এর ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা কাগজ পড়েন ৫০ লাখ পাঠক। সপ্তাহে অন্তত একবার প্রথম আলোর ছাপা কাগজ পড়েন ১ কোটি ৮ লাখ পাঠক। এর সঙ্গে প্রথম আলোর অনলাইনের পাঠক যোগ করলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে বিশাল। প্রথম আলো ডটকম পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা ওয়েবসাইট। বাংলাদেশ থেকে যত ওয়েবসাইট দেখা হয়, তার মধ্যে প্রথম তিনটি হচ্ছে গুগল, ইউটিউব ও ফেসবুক। এরপরই চতুর্থ অবস্থানে আছে প্রথম আলো ডটকম। সে অর্থে, দেখার বিচারে প্রথম আলোই শীর্ষতম বাংলাদেশি ওয়েবসাইট। আর সারা বিশ্বের সব ওয়েবসাইটের মধ্যে প্রথম আলোর অবস্থান ৫৯৯তম। বিশ্বের ২১০টির বেশি দেশ ও অঞ্চল থেকে অনলাইনে প্রথম আলো পড়েন ১ কোটি ৪০ লাখ পাঠক। প্রতি মাসে প্রথম আলো ডটকমের পেজ ভিউ হয় ২৩–২৪ কোটি। আর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজের ফলোয়ার ১ কোটি ৭০ লাখ। বিশ্বে দৈনিক সংবাদপত্র ক্যাটাগরিতে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজের অবস্থান নবম, মিডিয়া ক্যাটাগরিতে দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান পঞ্চম।

এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আমরা কৃতজ্ঞতায় বিনীত হই! ধন্যবাদ, সম্মানিত পাঠক, আপনাদের কারণেই আমরা এই অবস্থানে পৌঁছেছি। আপনাদের কারণেই আমরা সাহসী হই, আরও ভালো কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হই। আপনাদের সমর্থনই আমাদের শক্তির উৎস। আপনারাই প্রথম আলো।

বাধা আসে, পেরিয়ে যাই

করোনার শুরুর দিনগুলোতে আর সবার মতো আমরাও থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। একসময় প্রথম আলোর অফিস বন্ধ করে পুরো কাজ করতে হয়েছে ডিজিটালি। হোম অফিসের মাধ্যমেই প্রতিদিন ছাপা কাগজ ও অনলাইন পোর্টালে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কোভিডে আমাদের কর্মীদের ১৯০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তবু আমরা থেমে যাইনি। একইভাবে বাংলাদেশের অপরাজেয় লড়াকু মানুষও করোনা কিংবা আম্পানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুষড়ে পড়েনি, বাধা এসেছে, মানুষ বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়েছে; একটুখানি থমকে দাঁড়াতে হয়েছে, তারপর আবার মানুষ পথ চলেছে সম্মুখপানে; আঁধার এসেছে, কিন্তু আঁধার পেরিয়ে আসছে আলোর ঝরনাধারা।

চলমান কোভিডের মধ্যেও বাংলাদেশের গড় আয় বেড়ে গেছে, মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেছে ভারতকেও। শুধু কি করোনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত? তা তো নয়! আমরা যেমন স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্‌যাপন করছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আবারও অনুসন্ধান করছি, পাঠ করছি, ধারণ করতে চাইছি গণতন্ত্র, বৈষম্যমুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতার চিরায়ত আদর্শকে; তেমনি আমাদের ওপর আসছে নানা রকমের বাধা, স্বাধীন মত ও চিন্তার প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, মতপ্রকাশের জন্য মানুষকে কারাগারে যেতে হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যিনি দেশে–বিদেশে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সেই রোজিনা ইসলামকেও কারাগারে যেতে হয়েছে! মন্দিরে এবং সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, ঝরে গেছে মূল্যবান প্রাণ; মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার ওপরে মানুষের আস্থা আহত হয়েছে। কিন্তু আবারও মানুষ জাগছে। আবারও আমরা সমবেত হচ্ছি, কথা বলছি, মানুষ মানুষের পাশে আসছে হাত বাড়িয়ে, মানুষ মানুষকে বুকে টেনে নিচ্ছে গভীর মমতায়। রোজিনা ইসলামের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীর বিবেক একসঙ্গে একযোগে কথা বলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন; তা আমাদের আস্থাশীল করেছে, সাহসী এবং অঙ্গীকারবদ্ধ করেছে। রোজিনা ইসলামকে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’–এর পক্ষ থেকে ২০২১ সালের সেরা অদম্য সাংবাদিক হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

শুধু রোজিনা ইসলাম নন, চলমান করোনাকালে প্রথম আলোর সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হয়রানিমূলক মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বারবার আদালতে যেতে হয়েছে, জামিন নিতে হয়েছে। মামলাগুলো চলমান রয়েছে। ঢাকার বাইরে আমাদের অনেক সাংবাদিককে নানা হুমকিতে পড়তে হয়েছে।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও পাঠক প্রথম আলোয় আস্থা রেখেছেন। সর্বশেষ ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভের প্রতিবেদন সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। পাঠকের সমর্থন আর আমাদের চেষ্টার সম্মিলনে আমাদের এগিয়ে যাওয়া অব্যাহত থাকবে। এটাও ঠিক যে সব বাধা আমরা অতিক্রম করতে পারিনি, তাই বলে হতোদ্যম হলে চলবে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বদ্ধ দুয়ার দেখলি ব’লে অমনি কি তুই আসবি চলে—/ তোরে বারে বারে ঠেলতে হবে,/ হয়তো দুয়ার টলবে না॥’ আমাদের কথা বলে যেতেই হবে, কাজ করে যেতেই হবে।

কাগজ থেকে পরিপূর্ণ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান

প্রথম আলো ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর বেরিয়েছিল একটা দৈনিক সংবাদপত্র হিসেবে। তারপর তার সঙ্গে যুক্ত হলো প্রথম আলো ডটকম। এরপর এল ই–পেপার (e-paper)। এখন আমরা বলি, ডিজিটাল ফার্স্ট। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রথম আলো পড়া হবে সবার আগে। প্রথম আলো ডটকম, ই–পেপার, প্রথম আলোর মোবাইল অ্যাপ, ফেসবুক পেজ, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, ভিডিও—ডিজিটাল মাধ্যমের সব কটিতেই প্রথম আলো ২৪ ঘণ্টা সদা সক্রিয়। প্রথম আলো ছাপা পত্রিকা, মাসিক কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা, মাসিক চলতি ঘটনা, ত্রৈমাসিক প্রতিচিন্তা, প্রথমা প্রকাশন, মিডিয়াস্টার লিমিটেড থেকে ভিডিও স্ট্রিমিং মাধ্যম ‘চরকি’, নিয়মিত বর্ণিল ম্যাগাজিন, সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিসি রেডিও—প্রথম আলো এভাবেই আলো ছড়ানোর চেষ্টা করছে চতুর্দিকে। প্রথম আলো ট্রাস্ট দেশের শিশু-কিশোর, তরুণ ও দুর্গতদের জন্য কত কিছু করছে। আর গণিত ও ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, শিক্ষক সম্মাননা, সেরা এসএমই পুরস্কার, তারুণ্যের জয়োৎসব, স্কুল ও কলেজ প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, বিতর্ক পুরস্কার, বর্ষসেরা বই, বর্ষসেরা ক্রীড়া পুরস্কার, দেশের সর্ববৃহৎ আলোকোজ্জ্বল অনুষ্ঠান মেরিল-প্রথম আলো, গোলটেবিল বৈঠক, শিক্ষাবৃত্তি, অ্যাসিড–সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলন, মাদকবিরোধী আন্দোলন, প্রথম আলোর কার্যক্রম যে কত দিকে ছড়ানো! করোনাকালে কয়েকটি অনুষ্ঠান স্থগিত ছিল, কতগুলো করতে হয়েছে ভার্চ্যুয়ালি, কতগুলো সীমিত পরিসরে; তবু কাজ চলছে এবং চলবে। বাধা আসবে, বাধা পেরিয়ে এগিয়েও যেতে হবে।

আমাদের এসব কাজের মূলে একটাই লক্ষ্য, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের একটাই চাওয়া: সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের জয়। দেশের বৃহত্তম গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই লক্ষ্যে আমরা আমাদের কর্তব্যে অটল থাকব। বাধা আসবে, বাধা মানব না; থমকে দাঁড়াতে পারি, তা ক্ষণিকের জন্য, আমরা আমাদের এগিয়ে চলা অব্যাহত রাখব।

প্রথম আলোর ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সকালে আবারও সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। সবাই ভালো থাকুন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন