পরে মামলায় পক্ষভুক্ত হন জমত আলীর ছেলে নুরুল হক (৫০) ও তাঁর ভাইয়েরা। এখনো এই আপিল মামলা নিষ্পত্তি হয়নি।

গত ৯ জুন এখনকার মূল বাদী নুরুল আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। বছরের পর বছর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

নুরুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জমির কাগজপত্র আদালতে জমা না দেওয়ায় আব্বার মামলা খারিজ হয়ে যায়। পরে আব্বা অন্য উকিল ধরে আপিল করেন। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমরা মামলায় পক্ষভুক্ত হই। মামলার তারিখ পড়ে। আদালতে আসি। কিন্তু মামলা আর নিষ্পত্তি হয় না।’

নুরুল জানান, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থেকে ঢাকার আদালতে আসতে তাঁর খরচ হয় ছয় থেকে সাত শ টাকা। বাবার মৃত্যুর পর মামলার পেছনে তাঁর অনেক টাকা খরচ হয়েছে।

নুরুল বলেন, ‘আমি চাষবাস করি। চাষাবাদ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালাই। মামলার খরচ চালাতে কষ্ট হয়ে যায়।’

জমত আলীর মামলা ও আপিল

জমত আলী পেশায় কৃষক ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার রাধানগর গ্রামে। জমত আলীর বাবার নাম আবদুল করিম ব্যাপারী। তিনিও কৃষক ছিলেন।

মামলায় দাবি করা হয়, জমত আলীর বাবা আবদুল করিম বালিয়াটির জমিদারের কাছ থেকে ৩২ শতাংশ জমি পত্তন নিয়ে ভোগদখল করেন। তাঁর নামে এসএ রেকর্ড হয়।

আবদুল করিম মারা গেলে তাঁর দুই ছেলে জমত আলী ও ফটিক আলী এই জমি ভোগদখল করতে থাকেন। তাঁদের নামে আরএস রেকর্ড হয়।

মামলায় দাবি করা হয়, ১৯৮২ সালে জমত আলী ক্রয়সূত্রে ৪৭ শতাংশ জমির মালিক হন। তবে তাঁর ৪৩ শতাংশ জমি ভুলবশত সরকারের নামে রেকর্ড হয়।

১৯৯৩ সালে ৫৭ শতাংশ জমি এওজবদল করেন জমত আলী। পরে জমত আলীর এই জমি শ্মশানঘাটের বলে দাবি করা হয়। এই জমির মালিকানা ঘোষণা চেয়ে জমত আলী ঢাকার ধামরাইয়ের সহকারী জজ আদালতে (দেওয়ানি) মামলা করেন।

মামলায় জমত আলী দাবি করেন, যে জমি সরকারি বলে দাবি করা হয়েছে, তা ঠিক নয়।

বিবাদীপক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই জমি সরকারের।

দেওয়ানি আদালত ডিক্রিতে বলেন, জমত আলীর বাবা করিম বালিয়াটির জমিদার থেকে জমি পত্তন নেওয়ার দাবি করেন। কিন্তু জমত আলী আদালতে কোনো পত্তননামা প্রদর্শন করেননি। আবার জমি এওজবদল করে ভোগদখল করলেও এ–সংক্রান্ত দলিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি জমি কেনার দলিলপত্রও আদালতে উপস্থাপন করেনি বাদীপক্ষ। আবার শ্মশানঘাটের জমির মধ্যে জমত আলীর কত শতাংশ, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

ডিক্রিতে আদালত বলেন, জমির মালিকানা প্রশ্নটি প্রথমে দালিলিক সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। জমির খাজনা দেওয়ার দাবি করা হলেও দাখিলা আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।

তবে নালিশি জমিতে বাদীর দখল রয়েছে বলে ডিক্রিতে উল্লেখ করা হয়।

বিবাদীপক্ষ থেকেও সরকারি জমির সমর্থনে কাগজপত্র দাখিল করা হয়নি।

এসব যুক্তিতে জমত আলীর মামলা খারিজ করেন আদালত।

দেওয়ানি আদালতের ডিক্রিকে চ্যালেঞ্জ করেন জমত আলী। তিনি ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ২০০৪ সালে আপিল করেন।

মামলার নিষ্পত্তি চান নুরুল

মামলার নথিপত্রের তথ্য বলছে, ২০০৪ সালের ২২ মে জমত আলীর আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন আদালত। পরে নিম্ন আদালতের নথি তলব করেন আপিল আদালত।

গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত এই আপিল মামলায় ১৫৩ কার্যদিবস শুনানি হয়। মামলায় আপিলকারীপক্ষ নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেয়। তবে বিবাদীপক্ষ শুনানির সব তারিখে হাজিরা দেয়নি।

২০১৪ সালের ২ মার্চ আপিলকারী পক্ষ সময় চায়। সময় চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এক আদেশে বলেন, নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটা ১০ বছরের ঊর্ধ্বের দেওয়ানি আপিল মামলা। এই আপিল শুনানিতে নানা অজুহাতে আপিলকারীপক্ষ সময় চেয়ে আবেদন করে।

আদালতের নথিপত্রের তথ্য বলছে, আপিল মামলা শুনানিকালে নুরুলের পক্ষে ২০১৮ সালে মামলার আরজি সংশোধনের পাশাপাশি রেকর্ডপত্র তলবের আবেদন করা হয়।

আদালত খরচ দেওয়া সাপেক্ষে আরজি সংশোধনের আদেশ দেন। এ ছাড়া মামলা–সংশ্লিষ্ট ভলিউম তলব করেন আদালত।

আপিল মামলার বিচার বিলম্বের বিষয়ে নুরুলের আইনজীবী রাম নারায়ণ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মামলার মূল ডকুমেন্টস প্রদর্শন না করার কারণে নিম্ন আদালত জমত আলীর মামলাটি খারিজ করেন। আপিল আদালত মানিকগঞ্জ থেকে ভলিউম তলব করেন। আরও কিছু খতিয়ান, আরএস খতিয়ান—যেগুলো দাখিল করা হয়েছে, সেগুলো প্রদর্শনের জন্য নুরুলের সাক্ষ্যগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। আদালতে অনেক দিন বিচারক ছিলেন না। দেউলিয়াবিষয়ক আদালতের বিচারক এই কোর্টে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। নানাবিধ কারণে আপিল মামলার শুনানি বিলম্বিত হয়েছে।

গত ৯ জুন নুরুল আদালতে সাক্ষ্য দেন। সেদিন নুরুল জমির মালিকানার সপক্ষে আরএস খতিয়ানসহ অন্যান্য দলিলপত্র আদালতে উপস্থাপন করেন।

দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় নুরুল বলেন, ‘আমরা সাদাসিদে মানুষ। আইনের মারপ্যাচ বুঝি না। আমার আব্বায় জমির মালিকানার স্বত্ব চেয়ে মামলা করেছিলেন। উকিলের ভুলে তাঁর মামলা খারিজ হয়। আব্বা আবার অন্য উকিল ধরে আপিল করেন। তবে তিনি আর মামলার নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারেননি। আমারও বয়স হয়েছে। আপিল মামলা কবে নিষ্পত্তি হবে, তা জানি না।’

আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নুরুল বলেন, ‘উকিল সাহেব যেদিন কোর্টে আসতে বলেন, সেদিন ফজরের নামাজের পর বাড়ি থেকে বের হই। কোর্টে আসতে আসতে সকাল ৯টা থেকে ১০টা বেজে যায়। বাবার রেখে যাওয়া কিছু জমি আছে। তাই চাষাবাদ করে খাই। আর কত বছর কোর্টে আসা লাগবে, তা জানি না। আমার আপিল মামলাটি আদালত নিষ্পত্তি করে দিন—এটুকুই আমার চাওয়া।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন