বিজ্ঞাপন

কিছু কেসস্টাডি

সাতক্ষীরার কুকরালির বাসিন্দা শেখ আবেদ আলী (৬৫) মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন। ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে তাঁর মৃত্যু হয়। অথচ ওই দিন বিকেলেই আবেদ আলীর খালাসের রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছেছিল।

default-image

পুলিশের অভিযোগ ছিল, আবেদ আলী ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার ইটাগাছা পুলিশ ফাঁড়ির দুই সদস্যকে ছুরিকাঘাতে হত্যার সঙ্গে জড়িত। ওই মামলায় ২০০৬ সালে আবেদ আলীসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন নিম্ন আদালত। এই রায়ের পর আপিল করলে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে আবেদ আলীকে খালাস দেন। এরপর লম্বা সময় ধরে চলা রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল ওই খালাসের রায়ই বহাল থাকে।

আবেদ আলীর দুর্ভাগ্য, সময়মতো রায়ের কপি জেলা কারাগারে না পৌঁছানোয় তাঁকে ছয় মাসের বেশি সময় কনডেম সেলে কাটাতে হয়েছিল। এরপর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় পরিবার যখন সেই রায়ের কপি নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রিজন সেলে যান, ততক্ষণে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যান। মৃত আবেদ আলীর এতটুকুই পাওয়া, তাঁর কবরকে কুকরালির বাসিন্দারা খুনির কবর বলছেন না। আম্বিয়া খাতুন খুনির স্ত্রী উপাধি পাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছেন।

২০২০ সালের ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের বাসা থেকে বের হয়ে খোঁজ হয় এক কিশোরী। পরে ৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ থানায় কিশোরীর বাবা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার রকিব, আবদুল্লাহ ও খলিল নামের তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। জবানবন্দিতে তাঁরা বলেন, কিশোরীকে তাঁরা অপহরণের পর গণধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়েছেন।

অথচ ঘটনার ৫১ দিন পর ওই কিশোরীকে পাওয়া যায়। সে অন্য এক ছেলেকে বিয়ে করে একই শহরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল। তাহলে ওই তিনজন কাকে খুন করলেন? আর ১৬৪ ধারার জবানবন্দিরই–বা কী হবে?

২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের একটি শিরোনাম ছিল, ‘অবশেষে ২৫ বছর পর মুক্তি পেলেন তিনি’। এই তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত ইউনিয়নের বাখরনগরের বাবুল মিয়া। ১৮ বছর বয়সে গ্রেপ্তার বাবুল মিয়া ডাকাতির এক মামলায় বিনা বিচারে ২৫ বছর কারাগারে ছিলেন। অথচ ওই মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেও সর্বোচ্চ কারাদণ্ড হতো ১০ বছরের।

‘ছেলে ডাকাত’, এমন অভিধা মাথায় নিয়েই ১৯৯৫ সালে বাবুল মিয়ার বাবা বিমানবাহিনীর সদস্য আনোয়ার হোসেন ও মা নিলুফা বেগম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ঘটনার পরিণতি দেখার আগেই অনেকে বাবুল মিয়াকে ডাকাত বলতে দ্বিধা করেননি।

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের হালিশহরে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা করে পুলিশ। এরপর ২৫ এপ্রিল জীবন চক্রবর্তী ও দুর্জয় আচার্য নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ দাবি করে, পুড়িয়ে ফেলা লাশটি দিলীপ রায় নামের এক কিশোরের। গাঁজা সেবন নিয়ে বিরোধের জেরে জীবন, দুর্জয়সহ কয়েকজন দিলীপকে হত্যা করেন। জীবন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

অথচ ২০১৯ সালের ২ মে পুলিশ জীবিত দিলীপকে খুঁজে পায়। তাহলে জীবন ও দুর্জয় কার খুনি? আর দিলীপ যে নিহত হয়েছেন, সেই খবরেরই–বা কী হবে?

বাগেরহাটের বাদল ফরাজী ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ভারতে বেড়াতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। এরপর দিল্লির নিম্ন ও উচ্চ আদালত তাঁকে একটি হত্যা মামলায় দোষী প্রমাণিত করে যাবজ্জীবন দেন। বন্দী বিনিময় চুক্তির আওতায় তাঁকে ২০১৮ সালের ৬ জুলাই বাংলাদেশের কারাগারে আনা হয়।

default-image

দিল্লির অমর কলোনির এক বৃদ্ধ হত্যায় এই বাদল জড়িত ছিলেন না। ছিলেন ‘বাদল সিং’ নামের একজন। পরে প্রমাণিত হয়, প্রকৃত খুনিকে ধরতে গিয়ে বিএসএফ ভুলে বাংলাদেশের পর্যটক বাদল ফরাজিকে গ্রেপ্তার করে। আর ইংরেজি বা হিন্দি ভাষা জানা না থাকায়, তখন বাদল তাঁর কথা কাউকে বোঝাতেও পারেননি। এই ঘটনা পরিষ্কার হওয়ার আগে বাদলও ছিলেন খুনি।

২০১৪ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে আবু সাঈদ নামের এক কিশোরকে গুমের অভিযোগ ওঠে। পরে ২০১৯ সালের ৩০ আগস্ট তাকে জীবিত পাওয়া যায়। অথচ ওই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জনের দুজন আদালতে জবানবন্দিও দেন। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁরা সাঈদকে হত্যার পর লাশ বরিশালগামী লঞ্চ থেকে নদীতে ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু সাঈদকে পাওয়ার পর এই জবানবন্দির মান নিয়ে কি প্রশ্ন ওঠেনি? অথচ এর আগপর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবেই আমরা ফলাও করেছি।

২০১৭ সালের মে মাসে রাজধানীর কদমতলীতে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার হয়। পুলিশ ওই লাশ আজমল হোসেন, ওরফে ইমরান নামের এক ব্যক্তির বলে শনাক্ত শেষে হত্যা মামলা করে। অথচ ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা গ্রামের সেই আজমল গত ১৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন। পুলিশ বলছে, ওই সময় করা মামলার সন্দেহভাজন ১১ আসামির পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে তিনজন আজমলকে হত্যার স্বীকারোক্তিও দেন। আর মামলার ৫ নম্বর আসামি মজিবর ‘পলাতক’। এখন পুলিশ বলছে, তারা অনেকটাই নিশ্চিত আজমল নয়, খুন হয়েছেন ‘পলাতক’ মজিবরই। আর এমন স্বীকারোক্তির ঘটনার সঙ্গে আগের তদন্ত কর্মকর্তারা জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে জোরালোভাবে। খালিচোখে এখানে একটা নামের ভুল মনে হলেও ঘটনার লেজ অনেক গভীরে। কারণ, পরিবারের কাছে নিখোঁজ মজিবর পুলিশের খাতায় খুনের পলাতক আসামি। গড়পড়তা সমাজের একটা অংশ মজিবরের ‘সর্বনাম’ খুনিই দিয়ে আসছে।

আদালতের বিধান

কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলে তাঁকে ওই ঘটনায় অপরাধী বলা যাবে কি না, তা নিয়ে আদালতের স্পষ্ট বার্তা আছে। যেমনটা আমরা দেখেছি বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে।

২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট মিন্নির এক জামিন পর্যবেক্ষণে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, ‘ইদানীং দেখা যায়, অনেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে ধরে নিয়ে এসে গণমাধ্যমে হাজির করে সংবাদ সম্মেলন করে। অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে মামলার তদন্ত নিয়ে উৎসাহী বক্তব্য দিতে দেখা যায়। গণমাধ্যমে হাজির করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিচারে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। তদন্ত পর্যায়ে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে গণমাধ্যমে কতটুকু প্রচার করা যাবে, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকা দরকার।’ নীতিমালা যাতে প্রণয়ন করা হয়, সে জন্য স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশের আইজিকে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন ওই হাইকোর্ট বেঞ্চ।
default-image

ওই পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেছিলেন, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আয়েশা সিদ্দিকা দোষ স্বীকার করেছেন বলে গণমাধ্যমে সেখানকার পুলিশ সুপার যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা অযাচিত-অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়; ন্যায়নীতির পরিপন্থীও। হাইকোর্ট বলেছেন, ‘তদন্ত চলার সময়ে পুলিশ সুপারের (বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন) এ ধরনের বক্তব্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। এটা কাম্য নয়। আমরা আশা করি, দায়িত্বশীল পদে থেকে পেশাদারির পরিচয় দেবেন।’

আমাদের করণীয়

আয়েশা সিদ্দিকার ঘটনায় হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে পেশাদারির কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি গণমাধ্যমের কর্মীদের দায়িত্ব অনেক। অন্তত বিচার বিভাগের রায় কার্যকরের আগপর্যন্ত আমরা কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে প্রচার করতে পারি না, সর্বোচ্চ তাঁকে সন্দেহের তালিকায় রাখা যেতে পারে। কিন্তু বাবুল আক্তারের ঘটনায় গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদন চোখে পড়েছে, যেখানে ‘স্ত্রী হত্যায়’ বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা এমনভাবে বর্ণনা করা হলো যে এটাই শেষ কথা। কিন্তু আসলে তা নয়, এখনো বহু পথ বাকি।

সাধারণত ব্রিটিশ ‘কমন ল’–এর আদলে ভারতীয় উপমহাদেশের বিচারব্যবস্থা চলে আসছে। এ আইনের একটা দার্শনিক ভিত্তি হলো, ১৭৬০ সালের ব্ল্যাকস্টোন ফরমুলেশন।

ব্ল্যাকস্টোন ফরমুলেশনে বলা হয়, ‘একজন নিরপরাধকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে ১০ জন অপরাধীর ছাড়া পেয়ে যাওয়া বেশি গ্রহণযোগ্য।’ মনে রাখার বিষয়, প্রতিটি অপরাধের দুটি ভাগ রয়েছে। এর একটি হলো, অপরাধমূলক কাজ। অন্যটি অপরাধের অভিসন্ধি। অভিযুক্তকে শাস্তির উপযুক্ত করতে বাদীপক্ষকে অপরাধমূলক কাজটিকে সংশয়ের ঊর্ধ্বে প্রমাণ করার পাশাপাশি ওই কাজের পেছনে থাকা অভিসন্ধিও প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

মাহমুদা খাতুন মিতু হত্যা মামলায় নাটকীয় মোড় সামনে এসেছে। আমরাদের করণীয় হলো, এর শেষ পরিণতি পর্যন্ত অপেক্ষা করা। আপাততদৃষ্টিতে এটা একটা থ্রিলার। সুতরাং, শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। নতুন মামলার ২ নম্বর আসামি যে কামরুল ইসলাম মুসা, তাঁরও একটা বিহিত দরকার। তিনি নিখোঁজ না মৃত, তা জানা জরুরি। কারণ, ইতিমধ্যে তাঁর স্ত্রী গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, তিনি জানতে পেরেছেন, মিতুকে হত্যার জন্য মুসাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন বাবুল। এখন পিবিআই প্রকাশিত ‘প্রেস রিলিজ’ অনুসন্ধানী ঢঙে প্রকাশের চেয়ে গণমাধ্যমের বড় কাজ হবে মুসাকে নিয়ে কিছু একটা করা। তাঁকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেছে, মুসার স্ত্রীর এমন দাবির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

মিতু হত্যাকাণ্ডের জট খুলুক। দ্রুত আদালতের মাধ্যমে এমন অপরাধের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হোক, তা আমাদের সবারই চাওয়া। তত দিনে আমরা না হয় বাবুল আক্তারকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবেই রাখি। তিনি তো আর ছলিমুদ্দি-কলিমুদ্দি নন যে ‘পুলিশের ধমকে’ই আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে বসবেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমরা সবাই ‘নার্ভ’ শক্ত বাবুল আক্তারের শেষ অবস্থান দেখার অপেক্ষায়...। আর আমাদের ‘ফেলুদা’, ‘ব্যোমকেশ’দের জন্য রইল শুভকামনা!

লেখক: প্রথম আলোর সহসম্পাদক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন