পঞ্চগড়ের ২৪টি নদ-নদীর বালুচরে এখন ধান গাছের সবুজ চারা দোল খাচ্ছে। মৃতপ্রায় এসব নদ-নদীতে জেগে ওঠা চরের পতিত জমিতে জেলার কৃষকেরা বোরো চাষ করছেন। বোরো চাষ করে দারিদ্র্যপীড়িত এসব মানুষ সচ্ছলতা পেয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলার করতোয়া, মহানন্দা, চাওয়াই, করুম, টাঙ্গন, পাথরাজ, তালমা, পাঙ্গা, পাম, ভেরসা, ডাহুক, আত্রাই, গোবরা, তীরণই, রণচণ্ডী, বেরং, ছোট যমুনা, ছেতনাই, পেটকি, ঘোড়ামারা, মরা তিস্তা, নাগর, খড়খড়িয়া ও ভুল্লী নদ-নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়। উৎসমুখে ভারত বাঁধ নির্মাণ করায় এসব নদ-নদীতে চর পড়ে যায়।
করতোয়া নদ এবং করুম ও ভেরসা নদীর চরের কৃষকেরা জানান, এসব নদ-নদীর আশপাশের গ্রামগুলোর অধিকাংশ কৃষকই ভূমিহীন। তাঁদের অনেকেই আগে মাছ ধরতেন। নদ-নদী মরে যাওয়ায় আগের মতো আর মাছ পান না। তাই পেশা বদলে ফেলেছেন তাঁরা। অধিকাংশই গত ৮-১০ বছর ধরে জেগে ওঠা চরে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করছেন। নভেম্বর মাস থেকে নদীর পানি কমে এলে বালুচরগুলোয় বোরো চাষের উপযোগী করে তোলার কাজে নেমে পড়েন তাঁরা। মাস দুয়েক পরিশ্রম করে বালু দিয়ে আইল বেঁধে পানি আটকান তাঁরা। এরপর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে চলে রোপণের কাজ। সাধারণত, ব্রি- ২৮ এবং ব্রি- ৩২ জাতের ধানের আবাদ করা হয়। এ জেলার ২৪টি নদ-নদীর বালুচরের ৪৯৪ একর জমিতে বোরো লাগিয়েছেন প্রায় ১ হাজার কৃষক।
করোতোয়া পাড়ের মিঠাপুকুর গ্রামের বশির আহমেদ বলেন, নদীতে এখন মাছ পাওয়া যায় না। করতোয়ার বালুচরের চার বিঘায় ধান লাগিয়েছেন। কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক না হলে তিনি ৮০ থেকে ১০০ মণ ধান ঘরে তুলতে পারবেন।
কয়েকজন কৃষক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকদের ২ থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলন হয় ২৫ থেকে ৩০ মণ করে। খরচ কম হওয়ায় অধিকাংশ কৃষকই লাভবান হয়েছেন। এসব বোরো আবাদে পানি সেচ লাগে না। খুব বেশি সারও ব্যবহার করতে হয় না। তাই লাভ বেশি হয়। শুকনো মৌসুমে নদ-নদীর জেগে ওঠা চরে চাষাবাদ করায় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ, ধানগাছে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার জলজ প্রাণীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রধান ও জেলা পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল বারী বলেন, নদ-নদীর বুকে বোরো চাষ করা যায়। কিন্তু তা করতে গিয়ে জলজ প্রাণীদের ক্ষতি হয়, এমন কিছু করা যাবে না। এ ব্যাপারে জৈব (অর্গানিক) কিছু করা যায় কি না, তা সরকারের ভেবে দেখা দরকার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক স ম আশরাফ আলী জানান, ভূমিহীন কৃষকেরা বালুচরে জমি আবাদ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। আগে জমিগুলো পড়ে থাকত। এখন তাঁরা আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পঞ্চগড় কার্যালয়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রবীন্দ্র চন্দ্র সোম জানান, নদ-নদীগুলোর উজানে ভারত বাঁধ নির্মাণ করায় পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব নদ-নদী খনন করে বাঁধ এবং জলকপাট নির্মাণের মাধ্যমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন