default-image

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার ঠিক আগে আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইন থেকে ছুটিতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন তিন হাজারের বেশি প্রবাসী। বাহরাইন ও বাংলাদেশের মধ্যে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় এরই মধ্যে কারও কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। তবে ২৪ জুন বাহরাইন থেকে বাংলাদেশে বিশেষ ফ্লাইট যাওয়া এবং পরদিন ২৫ জুন এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুজন বাংলাদেশি বাহরাইন ফিরে আসার পর আশার আলো দেখতে পান দেশে আটকে পড়া বাংলাদেশিরা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কিছু অসাধু ট্রাভেল ব্যবসায়ী টিকিটের দাম ৫ থেকে ৭ গুণ বাড়িয়ে দেওয়ায় বিপদে পড়েছেন তাঁরা।

এ অবস্থায় প্রবাসীদের স্বার্থে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন প্রবাসীরা।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২১ মার্চ প্রথমে ১০টি দেশে বিমান চলাচল স্থগিত করে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এরপর লকডাউনের সময়সীমা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধের সময়সীমাও বাড়তে থাকে। এরপর ১ জুন থেকে অভ্যন্তরীণ এবং ১৬ জুন থেকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি রুটে সীমিত পরিসরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে বাহরাইন রুটে শুধু এমিরেটস ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
এর আগে জরুরি চিকিৎসা ও পারিবারিক প্রয়োজনে দেশে ফেরা দরকার এমন প্রবাসীদের দেশে ফেরাতে বাহরাইন দূতাবাস ব্যবস্থা করে বিশেষ ফ্লাইটের। ওই ফ্লাইটে ৪১৪ যাত্রী বাংলাদেশ ফেরেন। পরদিন ২৫ জুন বাহরাইন সময় বিকেল ৫টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুজন বাংলাদেশি বাহরাইনে ফিরে আসেন। দেশে আটকে পড়া অন্য প্রবাসীরাও এখন দ্রুত বাহরাইনে ফিরতে চান।
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা দেশে ছুটিতে আছেন বা যাঁরা দেশে যেতে চাচ্ছেন, তাঁরা এখন থেকে স্বাভাবিক ফ্লাইটে যাতায়াত করতে পারবেন। এ ব্যাপারে বাহরাইনের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে একটি কনফারমেশন লেটার আমরা পেয়েছি। এ দেশে আসতে ইচ্ছুক প্রবাসীদের অবশ্যই ভিসার মেয়াদ থাকতে হবে। আর যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাঁদের ব্যাপারটা এখনো প্রক্রিয়াধীন। বাংলাদেশ দূতাবাস এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং কাজ করে যাচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাহরাইনে বাংলাদেশি ভিসা নতুন করে ইস্যু হচ্ছে না বিধায় আটকে পড়া প্রবাসীদের মধ্যে যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাঁরা পড়েছেন ভীষণ দুশ্চিন্তায়। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ী।
অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে বাহরাইন আসার টিকিটের দাম ৩০ থেকে ৩৬ হাজার টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কিছু অসাধু ট্রাভেল ব্যবসায়ী একেকটি টিকিটের দাম হাঁকাচ্ছেন দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাহরাইনে আসতে নিরুপায় হয়ে কোনো কোনো প্রবাসী জমিজমা বিক্রি করে টিকিট কিনছেন।
এদিকে অনেক প্রবাসীর ফিরতি টিকিটের শিডিউল দুই/তিন মাস, এমনকি তারও বেশি পিছিয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে অনেকেরই, আবার যথাসময়ে চাকরিতে ফিরতে না পারায় চাকরি হারাচ্ছেন অনেকেই।
নোয়াখালীর খোকনুর রহমান বললেন, তাঁর ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে ৩০ জুন। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ৭০০ বাহরাইনি দিনার (বাংলাদেশি এক লাখ ৫৪ হাজার টাকার বেশি) দিয়ে টিকিট কিনে বাহরাইন আসেন।
খোকনুর বলেন, অনেক প্রবাসী এত উচ্চমূল্য দিয়ে টিকিট কিনতে না পারায় শেষ হয়ে যাচ্ছে ভিসার মেয়াদ। নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে অনেক প্রবাসীর পরিবার। এ ব্যাপারে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
শুধু খোকনুর নন, অসাধু ট্রাভেল ব্যবসায়ীদের অনৈতিক ব্যবসার শিকার হচ্ছেন আরও অনেক প্রবাসী। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার সালেহ আহমদ জানুয়ারিতে দুই মাসের ছুটিতে দেশে যান। মার্চের শেষ সপ্তাহে তাঁর কাজে যোগদানের কথা ছিল, ফিরতি টিকিটও আছে। কিন্তু করোনার কারণে আটকা পড়েছেন দেশে। বাহরাইনে ন্যাশনাল গার্ডে (বর্ডার গার্ড) চাকরি করেন। তিনি বলেন, রিটার্ন টিকিট থাকা সত্ত্বেও শিডিউল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় আকাশচুম্বী দাম দিয়ে নিজে টিকিট করে যাওয়া সম্ভব নয়। ভিসার মেয়াদ থাকলেও চাকরি নিয়ে আছেন চরম দুশ্চিন্তায়।
বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসের গাড়িচালক মো. আরশাদুল বলেন, ভিসার মেয়াদের কথা চিন্তা করে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ই কে ০৫৮৫ ফ্লাইটের আগামী ৬ জুলাইয়ে একটি টিকিট কিনেছেন। তাঁকে ওয়ান ওয়ে টিকিটের জন্য ১ লাখ ২২ হাজার টাকা গুনতে হয়েছে।
কুমিল্লার মতলব থানার হারুনুর রশিদ বাহরাইনে থাকেন দীর্ঘ ৩৬ বছর। তিনি বাহরাইন পুলিশে চাকরি করেন, জানুয়ারিতে দেশে যান ছুটিতে। চাকরিতে ফিরে আসার কথা ছিল ১৩ এপ্রিল। এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফিরতি টিকিটও ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে ফিরতে পারেননি যথাসময়ে। দীর্ঘদিনের সরকারি চাকরি, সময়মতো ফিরে আসতে না পারলে সমস্যা। এমিরেটসের ফ্লাইট চালুর পর বুক ভরা আশা নিয়ে যান ঢাকায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের অফিসে। দুদিন কথা বলার সুযোগই পাননি। পরে টেলিফোনে তাঁকে জানানো হয়, আগস্টের আগে তিনি কোনোভাবেই বাহরাইন ফিরতে পারবেন না। কারণ এখন কোনো সিট খালি নেই। পরে দালাল মারফত জানতে পারেন, যদি একান্তই তাঁকে যেতে হয় তাহলে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করলে টিকিট পাওয়া যাবে। স্বল্প সময়ের জন্য ছুটিতে গিয়ে অনেক দিন দেশে থেকে এমনিতে হাতে টাকা-পয়সা নেই, তাই এত টাকা খরচ করে বাহরাইন ফেরত আসাটা তাঁর জন্য অনেক কষ্টকর। তাঁর ভিসার মেয়াদ আরও এক বছর আছে। কিন্তু যথাসময়ে না আসতে পারলে চাকরির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন । এ নিয়ে আছেন চরম উৎকণ্ঠায়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বাহরাইনে পুরোনো বাংলাদেশি ট্রাভেল ব্যবসায়ী আল মালিকি ট্রাভেলসের মালিক সাবের হোসেন দাবি করেন, ওয়াই ক্লাসের সব টিকিট বাংলাদেশ থেকে ব্লক করে রাখা হয়েছে, যার ফলে এমিরেটসের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। ইকোনমির আসন আগস্টের আগে খালি নেই। এখন হাতে গোনা কয়েকটি বিজনেস ক্লাসের সিট খালি আছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে বিজনেস ক্লাসে টিকিট নিতে হচ্ছে, তাও আবার অনেক বেশি চড়া দাম দিয়ে। যাত্রীরা টিকিটের দাম নিয়ে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। একটি টিকিট অনেক কষ্টের পরে পাওয়া গেলেও সেটির দাম পড়ছে বাংলাদেশি টাকায় ১ লাখ ২৪ হাজার কিংবা ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
সাবের হোসেন বলেন, ‘আমার অত্যন্ত কাছের একটি ফ্যামিলি যাদের ভিসা শেষ হয়ে যাচ্ছিল, ৩০ জুনের জন্য তারা বাধ্য হয়ে দেশ থেকে প্রতিটি টিকিট ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা দিয়ে ২৮ জুন টিকিট কিনেছেন।’ তবে তিনি বলেন, আগামী ১৫ জুলাই সম্ভবত গালফ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট চালু হতে পারে এবং এর টিকিটের দাম সম্ভবত ৬৪ হাজার টাকা করে পড়তে পারে। এতে যাঁদের ভিসার মেয়াদ আছে, তাঁরা কিছুটা হলেও স্বস্তি বোধ করবেন।
সাবের বলেন, আগামী ৩ জুলাইয়ের পর সরকার ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক করার অনুমোদন দিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
বাহরাইনে পান ব্রাইট ট্রাভেলস অ্যান্ড টুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদনান মোহাম্মদ আনোয়ার দাবি করেন, জুলাই মাসজুড়ে ইকোনমি ক্লাসের কোনো টিকিটই নেই। তাই বাধ্য হয়ে আকাশচুম্বী দাম দিয়ে বিজনেস ক্লাসের টিকিট কিনতে হয়। ৩০-৩৫ হাজার টাকা দামের টিকিট কিনতে হয় লক্ষাধিক টাকা দিয়ে। এতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বাহরাইন ফিরতে আসা সাধারণ প্রবাসীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বলেন, একটি সিন্ডিকেট স্বল্পমূল্যে সব ইকোনমি টিকিট বুক করে আগেই রেখে দেয়। কেউ টিকিট কিনতে গেলে সিস্টেম থেকে দেখায় সিট নেই। ওদের চড়া দাম দিলে ওই বুক করা টিকিট বাতিল করে সঙ্গে সঙ্গে ওদের লোকজন একসঙ্গে অনেক টিকিটের অনুরোধ পাঠায়, যার জন্য ওদের বাতিল করা টিকিটটি ওদের নির্ধারিত কাস্টমারের নামে ফেরত পেয়ে যায়। কাস্টমার বাধ্য হয়ে ইকোনমিক ক্লাসের টিকিট আপার বিজনেস ক্লাসের মূল্য দিয়ে কিনে নেন। এভাবেই চলছে সিন্ডিকেট।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন