default-image

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তে দুভাবে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। একটি হলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ। এটিকে বলা হয় অ্যাকটিভ সার্ভেল্যান্স। আরেকটি হলো ব্যক্তি নিজে বুথে, ল্যাবরেটরিতে বা হাসপাতালে গিয়ে নমুনা দিয়ে আসেন পরীক্ষা করানোর জন্য। এটাকে বলা হয় প্যাসিভ সার্ভেল্যান্স। দেশে দুই ধরনের নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতিই আছে। তবে বেশি হচ্ছে প্যাসিভ।

দেশের উত্তরবঙ্গের ১০টি জেলায় এখন সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব জায়গায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে কেন বেশি, সংক্রমণের ধরন কেমন—এসব বিশ্লেষণের পাশাপাশি নজরদারি বাড়াতে হবে। এসব এলাকায় অ্যাকটিভ সার্ভেল্যান্স বাড়াতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ শহরে সংক্রমণ বেশি। আবার এই তিনটি বড় শহরের কিছু কিছু জায়গায় সংক্রমণ হার অনেক বেশি। এসব এলাকায় নমুনা সংগ্রহ আরও বাড়াতে হবে।

বিজ্ঞাপন

পবিত্র ঈদুল আজহার সময় সারা দেশে পশুর হাটে এবং গ্রামে যাতায়াতের জন্য যেভাবে লোকসমাগম হয়েছে, তাতে মধ্য আগস্ট নাগাদ সংক্রমণ রেখায় একটি রাইজ (ঊর্ধ্বগতি) দেখা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী, তা পরিষ্কার নয়। গ্রাম এলাকা থেকে কেমন নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা দেখতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ বাড়াতে হবে।

সঠিকভাবে নমুনা সংগ্রহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথভাবে নমুনা সংগ্রহ করা না হলে ফলাফল ভুল আসার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু যাঁরা মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করছেন, তাঁদের হাতে-কলমে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়নি।

আমাদের দেশে আরটিপিসিআরের মাধ্যমে কোভিড-১৯ শনাক্তের পরীক্ষা করা হয়। এটি অত্যন্ত উঁচু মানের মেশিন। এই যন্ত্রের কারণে নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের হেরফের হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। পরীক্ষার ফলাফলে হেরফের হতে পারে, যদি নমুনা সংগ্রহে ত্রুটি হয়। সঠিকভাবে নমুনা সংগ্রহ করা না গেলে ফলাফল ত্রুটিপূর্ণ আসবে। এ ছাড়া নমুনা ট্রান্সপোর্টেশনের (নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষাগারে নেওয়া) সময় ও প্রসেসিং (সংরক্ষণ প্রক্রিয়া) ঠিকমতো না হলেও সঠিক ফলাফল আসবে না। অবশ্য আমাদের ট্রান্সপোর্টেশনে খুব একটা সমস্যা নেই। আরেকটা সমস্যা হতে পারে ফলাফল একত্রীকরণের সময়। একজনের রেজাল্ট (করোনা পরীক্ষার ফল) আরেকজনের নামে লেখা হয়ে গেলে।

সম্প্রতি নমুনা পরীক্ষা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষা না করেই একটি প্রতিষ্ঠান অনেককে ফলাফল দিয়েছে। এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা অকল্পনীয়।

এখন দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৮৬টি পরীক্ষাগারে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর সব কটি খুব ভালো কি না বা খুব খারাপ কি না, তা বলার সুযোগ নেই। কথা ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি দল নিয়মিত ল্যাবরেটরি (পরীক্ষাগার) পরিদর্শন করবে। তারা পরীক্ষা এবং ল্যাবরেটরির যথাযথ মান বজায় রাখছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে। এর সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিও রাখা যেত। কিন্তু প্রথমে এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত এটি কার্যকর হয়নি।

প্রতিটি ল্যাবরেটরির নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে হবে। ল্যাবে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। যাঁরা কাজ করছেন তাঁরা সুরক্ষিত কি না, পরিবেশ ঠিক থাকছে কি না, এসব দেখতে হবে। এ জন্য ল্যাবরেটরিগুলো নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

আসলে কারা কিসের ভিত্তিতে করোনা পরীক্ষা করার অনুমতি পাচ্ছে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে পরিষ্কার নয়। যত ধরনের চুক্তি হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত তার বিস্তারিত নিজেদের ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া। সব তাদের ওয়েবসাইটে থাকতে হবে। তাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, দুর্নীতি কমবে।

বিজ্ঞাপন

দেশে গত ২৫ মে থেকে এখন পর্যন্ত পরীক্ষার তুলনায় সংক্রমণ শনাক্তের হার ২০ থেকে ২৩ শতাংশ। সংক্রমণ একই মাত্রায় আছে। জুলাই মাসে এসে পরীক্ষা কমে গেছে। এর একটি কারণ পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা, কিন্তু এটার বাইরে আরও কারণ আছে। তবে যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা আরেকটু কমিয়ে দিলে পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়বে।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন