default-image

নিজের ভারেই চলতে পারছে না সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। দীর্ঘদিন ধরেই যা ব্যয় করছে, তা আয় করতে পারছে না সংস্থাটি। ফলে কর্মীদের বেতন-ভাতা মাসের পর মাস আটকে আছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, গত দুই সপ্তাহের লকডাউনে বিআরটিসির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তাই সরকারের কাছে ৯৯ কোটি টাকা চেয়েছে সংস্থাটি। গত বছরের সাধারণ ছুটির পরও সরকার দুই দফায় ১০ কোটি টাকা দিয়েছে বিআরটিসিকে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) আইন অনুসারে, সংস্থাটি নিজ আয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করবে; আর সেবার ক্ষেত্রে বেসরকারি পরিবহন খাতের মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু তার গন্তব্য হয়েছে উল্টো। বছরের পর বছর ঋণ, অনুদান, নতুন বাস-ট্রাক কিনতে সরকারের কাছে হাত পেতে চলছে সংস্থাটি। তার মাথায় এখন ৭২৪ কোটি টাকা দেনার বোঝা।

বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিআরটিসির কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া পাওনা প্রায় ১৯ কোটি টাকা। সারা দেশে সংস্থাটির ২১টি বাস ও ২টি ট্রাক ডিপো আছে। প্রায় সব কটিতেই বেতন বকেয়া পড়ে আছে। ঢাকার গাবতলী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রংপুর ডিপোতে কর্মীদের এক বছরের বেশি বেতন বকেয়া আছে।

বিজ্ঞাপন

কল্যাণপুর বাস ডিপোর একজন চালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, অক্টোবর থেকে তাদের পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। বৈশাখী ভাতা পাননি। ঈদে বেতন ও বোনাস পাওয়া যাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত। তিনি বলেন, চালক-কর্মীদের কেউ কেউ নানা উপায়ে টুকটাক আয় করে চলেন, কিন্তু যাঁরা সৎ পথে থাকতে চান, তাঁদের অবস্থা খারাপ।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটির কারণে গত বছরের এপ্রিল থেকে দুই মাসের বেশি বাস চলেনি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে আবার বন্ধ হয় বাস। এই অবস্থায় কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ৪ এপ্রিল সরকারের কাছে ৯৯ কোটি টাকা চেয়েছে বিআরটিসি। এই প্রস্তাব এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। গত বছরও সাধারণ ছুটির সময় সরকারের কাছে ২০ কোটি টাকা চেয়েছিল বিআরটিসি। দুই দফায় সরকার ঋণ হিসেবে ১০ কোটি টাকা দিয়েছিল তাদের।

বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁরা চার কোটি টাকা বাড়তি আয় করেছিলেন। ওই আয় থেকে অবসরে যাওয়া কর্মীদের গ্র্যাচুইটিসহ অন্য সুবিধা পরিশোধ করা হয়েছে। অনেক কর্মী অসুস্থ, মারা গেছেন কেউ কেউ। মানবিক কারণে তাঁদের টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কারণে আমরা বিপদে পড়ে গেছি। আমাদের ট্রাকগুলো চলছে। ৫০টি বাস হাসপাতালের কর্মীদের আনা-নেওয়ায় নিয়োজিত। ব্যাংকের কর্মীদের জন্য চলছে ১৪টি বাস। এই দিয়ে বেতন দেওয়ার অর্থ আয় করা সম্ভব হচ্ছে না।’

বিআরটিসি সূত্র জানায়, সংস্থাটিতে ৩ হাজার ১৩০ জন কর্মরত আছেন। নিজ নিজ ডিপোর আয় থেকে তাঁদের বেতন হয়। সংস্থাটি যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের পাশাপাশি জমি-ভবন ভাড়া দিয়ে আয় করে। সব মিলিয়ে মাসে গড়ে ১২ কোটি টাকা আয় হয়। ছয় কোটি টাকা চলে যায় অবসরে যাওয়া কর্মীদের সুবিধা পরিশোধে এবং পরিবহন রক্ষণাবেক্ষণে। আর মাসে বেতন লাগে সাড়ে ৭ কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় কিছুটা বেশি। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতি মাসে আয়-ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি চলে আসছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিআরটিসি যেহেতু নিজেদের খরচই তুলতে পারছে না। তাই তারা সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ কখনোই পরিশোধ করতে পারে না। ফলে দিন দিন দেনার বোঝা ভারী হচ্ছে।

বিআরটিসির মোট বাস ১ হাজার ৮০২টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৫৮টি এই সরকারের সময় কেনা। তবু ৫০০টির বেশি বাস অকেজো। সংস্থার কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের বাস আমদানি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মেরামত ও যন্ত্রাংশ কেনায় দুর্নীতি, দামি বাস ইজারায় চালানোসহ নানা কারণে বিআরটিসির বাস অল্প কয়েক বছরেই অকেজো হয়ে যায়। সংস্থাটির বাসের অর্থনৈতিক বয়সসীমা ধরা আছে ১৫ বছর। বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত বাস অনায়াসে ২০ বছর চলাচল করছে। কিন্তু বিআরটিসির প্রায় সব বাস ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে লোহালক্কড়ে পরিণত হচ্ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দেশে যাত্রীর যে চাপ, তাতে পরিবহন ব্যবসায় লোকসানের কারণ নেই। কিন্তু বিআরটিসি লোকসান দিয়েই যাচ্ছে। কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। তহবিলে ঘাটতি হলেই সরকার টাকা দেয়। এভাবে একটি সংস্থা চলতে পারে না। তিনি বলেন, বিআরটিসির দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। টাকা দেওয়ার বিপরীতে দেশের মানুষ কী পেল, বাস কেন অচল থাকে, লোকসান কেন হয়-এসবের জবাব চাইতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন