এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সহকারী প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর রফিক আহমেদ সিরাজী।

গত ২৩ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘটু গ্রামের কৃষক অভিনাথ মারান্ডি ও তাঁর চাচাতো ভাই রবি মারান্ডি বিষ পান করেন। এতে দুজনেরই মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় গভীর নলকূপের অপারেটর সাখাওয়াত হোসেন তাঁদের পানি না দিয়ে ১২ দিন ধরে ঘোরাচ্ছিলেন। চোখের সামনে বোরো ধানের খেত ফেটে চৌচির হতে দেখে তাঁরা বিষ পান করেন।

এ ঘটনার পর চলতি মাসের ১১ ও ১২ তারিখে বিভিন্ন সংগঠনের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল গোদাগাড়ী ও সদর থানার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এই সময়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা দুই কৃষকের পরিবারের সদস্য, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিএমডিএর সচিব, রাজশাহীর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর এক প্রতিবেদনে ৯টি সুপারিশ করেছে প্রতিনিধি দলটি। তবে কী কারণে কৃষকেরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি তাঁরা।

পরিদর্শন দলের কাছে বক্তব্য দিয়েছেন স্থানীয় সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী। বিএমডিএকে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‌‘বিএমডিএর জন্ম কৃষকদের সহযোগিতা করার জন্য হলেও তাঁরা কৃষকদের শোষণ করছে। পানি নিয়ে বাণিজ্য ও সন্ত্রাস করছে।’

পনি বণ্টনের ক্ষেত্রে বিএমডিএর পাম্প অপারেটরদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতি রয়েছে অভিযোগ করে ওমর ফারুক বলেন, সংশ্লিষ্ট পাম্প অপারেটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এর পরও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সময় মতো ব্যবস্থা নিলে হয়তো গোদাগাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনা এড়ানো যেত।

সেচের পানি না পেয়ে দুই কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা দুঃখজনক উল্লেখ করে এই সাংসদ বলেন, ‘আমি মনে করি, এই বিষয়ে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিচার হাওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএমডিএ বরেন্দ্র এলাকায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করার কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এবার তাদের থামা উচিত। এ এলাকায় গভীর নলকূপ ও সেমি-গভীর নলকূপ বসানো ও পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা হওয়া দরকার।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দুই কৃষকের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া কেবল অনিয়ম আর দুর্নীতির দৃষ্টান্ত নয়। এটা হচ্ছে একটা সুস্পষ্ট বঞ্চনার দৃষ্টান্ত। যে ব্যবস্থা চালু আছে, সেটাকে বিশ্লেষণ করে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে।

সরকারকে পানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার দাবি তুলে রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রয়োজনে বরেন্দ্র অঞ্চলকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পরিদর্শন দলের সুপারিশ

পরিদর্শন দলের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া; সেচকাজে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের জন্য বিএমডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, পাম্প তথা পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা; পাম্পের নির্ধারিত সীমানার বাইরে নতুন কোনো জমি পাম্পের সেচ ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনা; সেচ পাম্পের আওতায় জমি তালিকাভুক্তির জন্য বিএমডিএর জমি তালিকাভুক্তি নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কমপক্ষে বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের সময় বিনামূল্যে সেচের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিএমডিএর সঙ্গে আলোচনা করা।

সুপারিশে আরও বলা হয়, প্রান্তিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার পাম্পের অপারেটর হিসেবে এসব সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়োগ দেওয়া, যাতে তাঁরা প্রতারণার শিকার না হন; ধার্য করা পানির দামের অতিরিক্ত টাকা কৃষকদের কাছ থেকে আদায় না করা; ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ও নারী কৃষকদের বিনা মূল্যে সেচের পানির সরবরাহ করা; দুই কৃষকের আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলাটির একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা, যাতে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত না করা যায়।

বিএমডিএর যথেচ্ছভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূমির ওপরের পানির ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন