বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মুহিত ভাইয়ের আনন্দময় ছাত্রজীবন, সফল আমলাজীবন, নাগরিক সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এবং শেষে এসে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁর একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। কারণ, তিনি এসব কিছুর বাইরেও শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের প্রতি আগ্রহী ছিলেন ভীষণ। তিনি শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির প্রতি শুধু আগ্রহীই ছিলেন না, এসবের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুষ্ঠানে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। তিনি এসব অনুষ্ঠানে উৎসাহের সঙ্গে যেতেন। অনুষ্ঠানের বাইরেও এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। প্রয়োজনে নানাভাবে তাঁদের সাহায্য করতেন।

সে জন্য তিনি যখন সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হলেন এবং দুই মেয়াদে মন্ত্রী থাকলেন, তখন আমরা একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছি যে আমাদের মুহিত ভাই হলেন ‘গুড ফেস অব গভর্নমেন্ট’। যেকোনো দল সরকারে থাকলে ভুলত্রুটি থাকবে। কোনো মন্ত্রী বা সরকারই সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। মুহিত ভাইও ছিলেন না। কিন্তু সবকিছুর পরও সর্বমহলে মুহিত ভাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তিনি জীবনের শেষ দুই দশকের অধিক সময় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এর বাইরেও তাঁর বহুমুখী সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব এবং গুরুত্ব। এখন তো এ ধরনের মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ এবং ঘনিষ্ঠতা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। তখন আমরা ভোরের কাগজ করি। ভোরের কাগজ–এ তিনি কলাম লিখতেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা তিনি লিখেছিলেন আমাদের কাগজে। পরে ১৯৯৬ সালে এই ধারাবাহিক লেখা নিয়ে স্মৃতি অম্লান: ১৯৭১ নামে বইও প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশেষ সংখ্যায় তিনি লিখেছেন। মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমন্ত্রণে একাত্তরে ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড এসেছিলেন। তখন মুহিত ভাইয়ের উদ্যোগে এক সকালে প্রাতরাশের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার আমরা নিয়েছিলাম। এসবের মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর বাসায় পারিবারিক বা বন্ধুবান্ধবের নৈশভোজে অংশ নিয়েছি অনেক দিন। অনেক উজ্জ্বল সময় কেটেছে। তিনিও আমাদের বাসায় এসেছেন বিভিন্ন উপলক্ষে।

১৯৯৮ সালে আমরা যখন ভোরের কাগজ থেকে বের হয়ে প্রথম আলো প্রকাশ করছি, তখন আমাদের নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। এমনকি যখন আমাদের প্রস্তুতির কাজ চলেছে, তখন এসে নানা পরামর্শ দিয়ে গেছেন। আমরা তাঁর অনেক লেখা ও সাক্ষাৎকার ছেপেছি প্রথম আলোতে। ২০১৬ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থেকে দেশে বাল্যবিবাহ রোধে প্রথম আলোকে সচেতন থাকতে, উদ্যোগী হতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেটা আমরা পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছেপেছিলাম ২২ নভেম্বর।

default-image

এভাবে এ ধরনের আসা-যাওয়া ও যোগাযোগের মাধ্যমে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ নানা বিষয়ে আলাপ হতো। তাঁর কথা যত শুনতাম, ততই আগ্রহ বোধ করতাম। তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি আমাদের বিস্মিত করত। পঞ্চাশ বা ষাটের দশক এবং আরও পরে যাঁদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় বা যোগাযোগ হয়েছিল, তাঁদের কথা বা সেসব স্মৃতি তিনি মনে করতেন। তাঁর সময়কার সরকারি কর্মকর্তা কারও নাম বলা হলে তিনি তাঁর সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দিতে পারতেন। কোথায় পড়াশোনা করেছেন, কবে সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) দিলেন, কোথায় কোথায় কাজ করলেন, কেমন মানুষ ছিলেন—এসব তথ্য দিতে পারতেন। একবার বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়াকে একুশে পদক দেওয়াসংক্রান্ত আলোচনা উঠলে তিনি তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলেন। এমনকি কোথায় কখন কাজ করেছেন, সে কথাও মনে করতে পারলেন। শেষে এ-ও বললেন যে একুশে পদক পাওয়ার জন্য তিনি একজন যোগ্য ব্যক্তি।

আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক দলের নেতা বা সরকারের মন্ত্রী হয়ে এভাবেই মুহিত ভাইদের মতো মানুষকে চলতে হয়, চলতে হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে মুহিত ভাইকে আমাদের সময়ে, আমাদের পাশে পেয়েছিলাম, এটা আমাদের বড় এক সৌভাগ্য।

মুহিত ভাইয়ের ব্যক্তিগত বই সংগ্রহ ও লাইব্রেরি ছিল বিরাট। সরকারি বা ব্যক্তিগত কাজে তিনি যত মানুষকে চিঠি লিখেছেন বা তাঁদের কাছ থেকে যত চিঠি পেয়েছেন, সব চিঠি তিনি যত্নে সংগ্রহ করে রেখেছেন। সে এক বিপুল আর্কাইভ। ইতিমধ্যে বাংলা ও ইংরেজিতে ৪০টির অধিক বই তিনি প্রকাশ করেছেন। শেষ দেখা হওয়ার দিনও বলেছিলেন, এসব বিরল চিঠি এবং কিছু তথ্য নিয়ে বই প্রকাশ করবেন। জানি না, কতজনের চিঠি বা তথ্য ছাপা এখন সম্ভব হবে। আমাদের প্রথমা প্রকাশন থেকে ২০১৭ সালে স্মৃতি অম্লান: ১৯৭১ বইটির পরিবর্ধিত সংস্করণ বের করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত থাকার সময় আবদুল মুহিত পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তিনি রাজনীতিসচেতন ছিলেন সব সময়। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সেই ১৯৫৫ সালে। তাই তাঁর পক্ষে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। ১৯৯২ সালে তিনি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে গণফোরাম প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং নানা দলীয় কাজ করেছিলেন। কিন্তু সেখানে বেশি দিন উৎসাহিত থাকতে পারেননি। তিনি গণফোরাম ছেড়ে দিলেন। পরে ২০০১ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভায় মুহিত ভাইয়ের যোগদান আমাদের বিস্মিত করেছিল।

অবশ্য আজ সত্যি করে বলতে গেলে মুহিত ভাইয়ের সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করা আমাদের খুব পছন্দ হয়নি। আমাদের সমাজে রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তি–কর্মীদের পাশাপাশি স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তাঁকে সেখানেই দেখতে চেয়েছিলাম। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে নাগরিক সমাজের বড় শক্তিশালী ভূমিকা বা অবদান আমরা দেখতে পাই। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে অংশ নিয়ে পরাজিত হলেন। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হলেন। পরপর দুই মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হলেন। তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়াটা যে আমাদের পছন্দ ছিল না, এটা তিনিও জানতেন। একদিন আলোচনাকালে তিনি এ বিষয় উত্থাপন করে আমার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে দেশের রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিদের যুক্ত হওয়া উচিত। সেদিক থেকে বলতে গেলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ও সরকারে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের একসময়ের একটি সেরা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকের ধ্বংসের জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এ জন্য তিনি সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের নানা রকম ত্রুটিবিচ্যুতি ও ব্যর্থতার মধ্যে সমাজ ও রাজনীতিতে মুহিত ভাইয়ের অবস্থান ভিন্ন ছিল, সে কথা আগেই বলেছি। তাঁর মন্ত্রিত্বের আমলের ১০টি বাজেট উপস্থাপন এবং আর্থিক নীতির মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে তিনি অনেক ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আজকের যে উন্নয়ন, তাতে তাঁর বড় অবদান আছে। আবার পাশাপাশি এটাও বলতে হয় যে ২০১১ সালের শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি পারেননি। তাঁর সিদ্ধান্তে শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির তদন্ত করলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। কিন্তু কোনো বিচার হলো না।

আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে ঋণখেলাপি এক বড় সমস্যা। এখানেও নানা উদ্যোগ নিয়ে তিনি ব্যর্থ হলেন। কোনো অগ্রগতি হলো না। হল–মার্কসহ কয়েকটি ব্যাংক কেলেঙ্কারিও তিনি বন্ধ করতে পারেননি। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তদারক করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান শক্ত করতে পারলেন না। দেশের একসময়ের একটি সেরা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকের ধ্বংসের জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এ জন্য তিনি সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

এসবের পাশাপাশি আবুল মাল আবদুল মুহিত, আমাদের মুহিত ভাই দেশের অর্থনীতিকে নতুন ধারায় নিয়ে যেতে, বিশেষ করে দেশীয় উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে বিশেষভাবে উদ্যোগী ছিলেন সব সময়। একই সঙ্গে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বাড়াতে সব সময় সচেষ্ট ছিলেন এবং উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে বিলাসদ্রব্য আমদানি, বিশেষ করে গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে অধিক ট্যাক্স বা একের বেশি গাড়ি ক্রয় বা পথে ব্যবহার করলে অধিক ট্যাক্স ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি এগোতে পারেননি স্বাভাবিক কারণেই।

আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক দলের নেতা বা সরকারের মন্ত্রী হয়ে এভাবেই মুহিত ভাইদের মতো মানুষকে চলতে হয়, চলতে হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে মুহিত ভাইকে আমাদের সময়ে, আমাদের পাশে পেয়েছিলাম, এটা আমাদের বড় এক সৌভাগ্য।

default-image

বিগত বছর ২০২১ সালের জুলাইয়ে মুহিত ভাই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে বিগত মার্চেও (২০২২) আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন কিছুদিন। গত ১৬ মার্চ তাঁর শহর সিলেটে গিয়ে সংবর্ধিত হয়েছিলেন বিশেষভাবে। তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। সেদিন তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘যেখানেই থাকি না কেন, সিলেট আমাকে খুব টানে। আমি আবার সিলেটে যাব।’

বাংলাদেশের একজন উজ্জ্বল ও সফল মানুষ আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর প্রিয় শহর সিলেটে গেলেন। কিন্তু তিনি গেলেন সে শহরে কফিনের ভেতরে। তাঁর প্রিয় শহর সিলেটেই মা–বাবার পাশে সমাহিত হবেন তিনি। এটাই ছিল তাঁর শেষ ইচ্ছা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন