default-image

সকালে ও বিকেলে দুই দফায় স্মরণকালের ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে গতকাল শনিবার সারা দেশে দুর্যোগ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বেলা ১১টা ২৭ মিনিট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দেশের কোথাও গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল না। বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন (গণভবন), বিদেশি মিশনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনাও (কেপিআই) এই বিপর্যয়ের কবলে পড়ে। 
তবে কেপিআই, হাসপাতাল, বিমানবন্দর প্রভৃতি এলাকায় তাৎক্ষণিক জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। জেনারেটর দিয়ে কোনো কোনো টিভি চ্যানেল চালু রাখা হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো দর্শক টেলিভিশন চালু করতে পারেননি। বিদ্যুৎ বিষয়ে তথ্যসংকটেও পড়ে দেশবাসী। পুলিশ জানায়, তাদের নিজস্ব বেতার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
সারা দিনের প্রচেষ্টায় বিকেলে কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টার মধ্যেই সোয়া চারটায় আবার বিপর্যয় ঘটে। বন্ধ হয়ে যায় জাতীয় গ্রিড। গত রাত ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর সর্বত্র তা আর ঠিক হয়নি। স্মরণকালের মধ্যে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার নজির নেই।
সন্ধ্যার পর দেশের বিভিন্ন স্থানের মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ হতে শুরু করে। কারণ, মোবাইলের টাওয়ারগুলোতে ব্যবহৃত ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যায়। শহরাঞ্চলে ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথের সেবা বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার বাতি পর্যন্ত জ্বলেনি। পেট্রলপাম্পগুলোতে গ্রাহকের লাইন পড়ে যায় জেনারেটরের তেলের জন্য।
শহর-নগরে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয় পানি সরবরাহ। বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়াসার লাইনগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে। বাসাবাড়িগুলোতে পানির সমস্যা দেখা দেয় দুপুরের পরই। তবে রাতের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা বলেছে পিডিবির সূত্রগুলো।
প্রথমে গতকাল বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার বাংলাদেশ অংশে কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। তখন ভারত থেকে ৪৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল। কিন্তু সমস্যার কারণে সমগ্র সঞ্চালনব্যবস্থাটি হুমকির মুখে পড়লে ওই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে একবারে ৪৩৮ মেগাওয়াট সরবরাহ কমে যাওয়ায় ‘লো ফ্রিকোয়েন্সি’জনিত শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এর অভিঘাতে অল্প সময়ের মধ্যে দেশের সব কটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়।

এই অবস্থায় প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য কিছু বিদ্যুতের (অক্সিলারি) দরকার হয়। স্বল্পতম সময়ে ওই বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো হয়। কিন্তু মিনিট দশেকের মধ্যে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে রুরাল পাওয়ার কোম্পানির (আরপিসিএল) কেন্দ্রটি এবং সিলেটে ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র চালিয়ে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে অক্সিলারি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ায় কাপ্তাই কেন্দ্রটিও পুনরায় চালু করা হয়। এভাবে বিভিন্ন কেন্দ্রে সম্মিলিতভাবে বিদ্যুতের উৎপাদন যখন প্রায় ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়, তখন বিকেল সোয়া চারটায় আবার জাতীয় গ্রিড বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে তখন কাপ্তাই ছাড়া অন্য কেন্দ্রগুলো আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রাতের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।
জানতে চাইলে রাত আটটায় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনী বলেন, গ্রিডের সমস্যা খুঁজে বের করার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করার কাজ চালানো হচ্ছে। সব পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজের মধ্যে আছেন। পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রগুলো চালু করে উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গ্রিডে সরবরাহ সমন্বয় করা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
এর আগে, সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালে। তখন একটি ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্যুতের গ্রিড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। কিছু সময়ের ব্যবধানে দুবার গ্রিড বন্ধ হওয়ার ঘটনাও এর আগে ঘটেছে। তবে এবারের মতো সর্বব্যাপী বিপর্যয় কোনোবারই ঘটেনি।
এবারের বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে পিজিসিবির একাধিক সূত্র জানায়, বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে বিপর্যয় ঘটার সময় চাহিদা অনুযায়ী চার হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছিল। এ সময় ভারত থেকে আসছিল ৪৩৮ মেগাওয়াট। ভারতের এই বিদ্যুৎ নিতে কিছুক্ষণ ধরেই সমস্যা হচ্ছিল ভেড়ামারা গ্রিড উপকেন্দ্রের ‘রিসিভিং পয়েন্ট’-এ। দেশের মধ্যে গ্রিডের কোনো অংশে সৃষ্ট কারিগরি সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
এই সমস্যা ভেড়ামারায় কর্মরত কর্মকর্তারা যেমন দেখছিলেন এবং সমাধানের চেষ্টা করছিলেন, তেমনি ঢাকায় জাতীয় লোড ডেসপাচ কেন্দ্রে (এনএলডিসি) দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তারাও দেখছিলেন। একপর্যায়ে সমস্যাটি বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ-ভারত সঞ্চালনব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর ফলে ৪৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন একেবারে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সৃষ্ট শূন্যতার অভিঘাতে গ্রিড বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কেন্দ্রগুলো অল্প সময়ের মধ্যে একে একে বন্ধ হয়ে যায়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ-ভারত সঞ্চালন লাইনের ভেড়ামারা গ্রিডের ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন বলেন, জাতীয় গ্রিডের কোথাও সমস্যা হয়েছে। তবে সেটা ভেড়ামারায় কি না, তা নিশ্চিত নয়। জাতীয় গ্রিডের অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারত থেকে আমদানি বন্ধ রাখা হবে।
বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, ভারতের পাওয়ার গ্রিড করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ যায়, ভারতীয় সময় বেলা ১১টার দিকে বহরমপুর-ভেড়ামারার মধ্যকার দুটি লাইনের একটিতে মিনিট খানেকের জন্য ট্রিপ করে যায়। তবে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাতেই দ্বিতীয় লাইনটি চালু হয়ে যায়। সে রকমই বন্দোবস্ত করা আছে। এ কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো বিপর্যয় ঘটেছিল কি না, সে ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিত নন।
তবে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির চেয়ারম্যান আর এন নায়েক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তাঁদের লাইনে গতকাল কোনো সমস্যা হয়নি।
ভারতের পাওয়ার গ্রিড করপোরেশনের পরিচালক (প্রজেক্ট) আইএস শাহ বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর থেকে বাংলাদেশের ভেড়ামারার ওই গ্রিড লাইনে দুটি লাইন রয়েছে। একটি ট্রিপ করলে অন্য লাইনটি চালু হয়ে যায়। দ্বিতীয় লাইনটিতে সার্বক্ষণিক চার্জও দেওয়া থাকে। তাই বাংলাদেশে আজ এক মুহূর্তের জন্যও ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়নি এবং বাংলাদেশে গ্রিড বিপর্যয় ভারতীয় গ্রিডের কারণে হয়নি।
গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে বের করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ কায়কাউসকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন