বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জ
উৎপাদনে সক্ষমতা থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিন বছরের মধ্যে উন্নতির আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুতের ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সির ওঠানামা, ঘন ঘন এবং অপ্রত্যাশিত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা পুরোনো। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেও মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন না ভোক্তারা। এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের উন্নয়নে নজর দিতে হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্রাহকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উন্নত সেবা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজেটেও এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এবার বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এবার বরাদ্দ ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে সমস্যা রয়ে গেছে এখনো। যৌক্তিক কারণেই ২০০৯ সালের শুরুতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দুই বছর ধরে সঞ্চালন ও বিতরণে জোর তৎপরতা চলছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা বলছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে মহানগর এলাকার সব বিতরণ লাইন ও সাবস্টেশন মাটির নিচে নেওয়া হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইন হবে ২৮ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে আছে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে গত এক যুগে বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন করা হবে। বর্তমানে আছে ৬ লাখ ১৪ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে এক যুগে বেড়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার কিলোমিটার। সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার বসাতে জমি দিতে কেউ রাজি হতে চায় না। তাই অনেক সময় লেগে যায়। এখন জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, সঞ্চালনে পিছিয়ে আছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের তিন গুণ সক্ষমতা দরকার সঞ্চালন লাইনে। এখন আছে দেড় গুণ। তাই সব সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আগামী তিন বছরের মধ্যে এটি তৈরি হয়ে যাবে।
সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে সমস্যা রয়ে গেছে এখনো। যৌক্তিক কারণেই ২০০৯ সালের শুরুতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দুই বছর ধরে সঞ্চালন ও বিতরণে জোর তৎপরতা চলছে।মোহাম্মদ হোসাইন, মহাপরিচালক, বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেল
অবশ্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সরকারের বরাদ্দের মধ্যে উৎপাদনের দিকটিই গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এবারের বাজেট বরাদ্দ নিয়ে গত জুনে সিপিডি বলেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দের ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে সঞ্চালন ও বিতরণে বেশি রাখা হয়েছে। তবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ হিসাব করা হলে এবার বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন বাজেটের ৬২ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে উৎপাদনে। আর সঞ্চালন ও বিতরণে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৯ শতাংশ করে। বিদ্যুৎ বিভাগের উচিত উৎপাদন থেকে বরাদ্দ সরিয়ে সঞ্চালন ও বিতরণে নেওয়া।
সিপিডির হিসাবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অধীনে ১০২টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হবে এবারের বাজেটে। এর মধ্যে ৪০টি প্রকল্প গত অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। এগুলোতে নতুন করে সময় বাড়িয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি বিতরণের ও ৮টি সঞ্চালনের। সময়মতো এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করা যায়নি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি থাকায় জনমানুষের আগ্রহ ছিল সেখানেই। সরকারও সেটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সমানভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ গুরুত্ব পায়নি। এটি পুরোপুরি সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে বলে উৎপাদনের মতো বেসরকারি বিনিয়োগও আসেনি। তবে সরকারের নজর বেড়েছে। দুই বছর ধরে সঞ্চালনে বিনিয়োগ বাড়ছে।