default-image

বিনোদনমূলক শিক্ষা নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি রোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি খুলনা অঞ্চলে এক গবেষণায় এ ফলাফল উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার প্রথম আলোর কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গবেষণার এ ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
‘নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিনোদনমূলক শিক্ষার ভূমিকা’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটির আয়োজক ছিল প্রথম আলো ও ব্র্যাক। গোলটেবিল বৈঠকে ‘পপ কালচার উইথ আ পারপাস: এডুটেইনমেন্ট-ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ নামের একটি দিশারি প্রকল্পের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষকেরা জানান, তাঁরা খুলনার পটসংগীত, নাটক, ভিডিও ক্লিপ ও পোস্টারের মাধ্যমে তিন হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের কাছে সরাসরি যৌন হয়রানি রোধে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছান। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এর মাধমে উপকৃত হন।
আলোচকেরা যৌনতা নিয়ে সমাজে রাখঢাকের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাঁরা সহশিক্ষা প্রবর্তনের পাশাপাশি যৌন হয়রানি রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় হাইকোর্টের নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের কথা বলেন। স্কুল-কলেজগুলোয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সমাজকে সুন্দর রাখার বার্তাগুলো প্রচারের ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠানটির সূচনা করেন জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক নিগার রহমান।
শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে লেখাপড়া করলে পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা বাড়ে। তবে সহশিক্ষার বিষয়ে অনেকেরই ভিন্নমত আছে। অনেক বিষয় নিয়েই কথা বলা যাচ্ছে না। পাঠ্যক্রমে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও শিক্ষিত অনেক লোকজনই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত বলে জানান তিনি। তবে ইভ টিজিং রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বার্তা প্রচারে সরকার উদ্যোগী।
সংস্কৃতিসচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস জানান, অনেকে মনে করেন সহশিক্ষা চালু হলে সমাজে অনাচার বাড়বে। তাঁর মতে, এই ধারণা একেবারে উল্টো, এমন ধারণা পোষণ করা শোভন বা কাঙ্ক্ষিত নয়।
ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসাটি কর্মসূচির প্রধান হাবিবুর রহমান বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতারোধে ছেলেদের ও পুরুষ শিক্ষকদের যুক্ত করতে হবে। যৌন হয়রানির শিকার হলে মেয়েরা যেন স্বচ্ছন্দে তাদের সহপাঠী শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে সে জন্যই ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।
কিশোর-তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে তারা যে ভাষায় যেভাবে বোঝে সেই ভাষায় সেভাবে তাদের কাছে পৌঁছানোর কথা বলেন অক্সফামের নির্বাহী পরিচালক স্নেহাল সনেজি। এ ক্ষেত্রে আবহমানকালের সংস্কৃতি যেমন কাজে লাগাতে হবে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া বিনোদনমূলক কর্মসূচি সব সময় নির্বিঘ্নে চলতে পারে না। তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা মানুষকে নানা বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। দুজন কর্মী নেত্রকোনায় নিহতও হন।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের পরিচালক কল্পনা বসু বলেন, নারী-পুরুষের সমানাধিকারের অনেক বিষয় নিয়েই এখন আর কেউ কিছু বলছেন না। অথচ, ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিয়ে, সম্পদ ইত্যাদিতে নারী-পুরুষ যেন সমান অধিকার পায় সে নিয়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনে ধর্ষণের শিকার মেয়েকে প্রমাণ করতে হয়, ধর্ষণের জন্য সে দায়ী নয়।
উই ক্যানের জাতীয় সমন্বয়ক জিনাত আরা বলেন, মাঠে জনগণকে সচেতন করতে রাজনৈতিক দল, সরকার বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভাবে নেই। কিন্তু মৌলবাদীদের ব্যাপক তৎপরতা আছে। তিনি সংবাদমাধ্যমেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নারী ইস্যুকে পত্রিকাগুলো এনজিও ইস্যু হিসেবে দেখে। মূলধারার বিষয় বলে মনে করে না।
প্রায় একই মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান তানিয়া হক। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে নারী নির্যাতনের বিষয়টি উঠে আসছে। কিন্তু গুরুত্ব পাচ্ছে কম। বিজ্ঞাপনসহ অনেক জায়গায় নারীদের যৌনতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের পরামর্শক তাহমিনা হক সিনেমায় নারী-পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ছেলেমেয়েরা বন্ধুত্ব-ভালোবাসার যে স্বাভাবিক রূপ সেটি দেখতে পাচ্ছে না। সিনেমায় নারী পুরুষের সম্পর্কের শুরু হচ্ছে নারী ইভ টিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন সেই দৃশ্য দিয়ে। বাংলা ও ইংরেজিমাধ্যম এবং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সব শিক্ষার্থীকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাঠ গবেষণা ও ফলাফল : ‘কিশোরী কন্যার কথা শুনি, বিশ্বাস করি, পাশে থাকি’ এই স্লোগান নিয়ে ২০১৩ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটি প্রকল্প একযোগে বাস্তবায়ন করেছে ব্র্যাক, হাসাব, রূপান্তর, উই ক্যান ও অক্সফাম। গবেষণা ও ফলাফল সম্পর্কে জানান হাসাবের দলীয় প্রধান মাহফুজুল বারী এবং অক্সফামের জাতীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ঈমাম নাহিল।
‘পপ কালচার উইথ এ পারপাস: এডুটেইনমেন্ট-ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ নামের ওই দিশারি প্রকল্পের ফলাফলে বিনোদনমূলক শিক্ষা খুলনার ১০টি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নারী নির্যাতনরোধে কীভাবে সহযোগিতা করেছে সেটি পরিষ্কার হয়।
গবেষকেরা বলছেন, ৪৬ ধরনের কাজকে যৌন নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দিশারি প্রকল্পের শুরুতে যৌন নির্যাতন সম্পর্কে স্কুলশিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না। সেদিকে অগ্রগতি লক্ষণীয়। প্রকল্পটি শুরুর আগে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ ব্যক্তি যৌন নির্যাতন সম্পর্কে ধারণা রাখত, প্রকল্পের পর এই হার দাঁড়ায় ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় থাকা ৯৫ শতাংশ মানুষ বলেছে সহিংসতার শিকার হলে তারা ব্যবস্থা নেবে।
অক্সফামের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক কনর মলয় বলেছেন, নারীর প্রতি সহিংসতারোধে একটি ভালো সূচনা হয়েছে। এটির বিস্তার হওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন