ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান খন্দকার ফারজানা রহমানের ভাষ্য, ‘আপনার একজনের সঙ্গে যোগাযোগ, আপনি সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে চেনেন। বিপরীত লিঙ্গের লোকের সঙ্গে সম্পর্ককে সহজ করে দেয় প্রযুক্তি। আগেও বিবাহবহির্ভূত ঘটনা ছিল, কিন্তু কাছে আসার সুযোগ ছিল কম। এখন ফোন সেই সুযোগ করে দিচ্ছে।’

কিন্তু শুধু বিবাহবহির্ভূত ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন এত সহিংস হয় মানুষ? এ প্রশ্নটিই উঠেছে সম্প্রতি। ঘটনাটি রোববারের। কুষ্টিয়া শহরে পুলিশের উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) সৌমেন রায় গুলি করে তিনজনকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। গুলির ঘটনায় নিহত আসমার তৃতীয় স্বামী হচ্ছেন সৌমেন।

অস্ত্রধারীর প্রথম গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এক ব্যক্তি। এরপর এক নারীকে পরের গুলি। তাঁদের সঙ্গে থাকা শিশুটি তখন ভয়ে দৌড় দেয়। তাকেও পেছন থেকে গুলি করা হয়। শিশুটি পড়ে গেলে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আবার গুলি করেন অস্ত্রধারী। গুলিতে নিহত হন আসমা খাতুন (৩৪), আসমার ছেলে রবিন (৬) ও একই উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের সাওতা গ্রামের শাকিল খান (২৩)।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার সৌমেনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আসমার সঙ্গে শাকিলের সম্পর্ক ছিল। এর জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
তবে ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এসব ঘটনা আলোচনায় আসছে বেশি। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মুঠোফোনের সহজলভ্যতার কারণে নারী-পুরুষের যোগাযোগ পরকীয়ায় মোড় নিচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের এসব ঘটনার ধরনেও এসেছে ভিন্নতা।


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, একসময় মানুষ যুদ্ধ করে নারীকে জয় করতেন বা প্রতিশোধ নিতেন তাঁর ‘হিরোইজম’ প্রকাশ করতে। বর্তমানে যাচ্ছেতাই উপায়ে পছন্দের মানুষকে পাওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্পর্ককে ঘিরেই ঘটছে এমন ঘটনা।

কেন খুন?

মনোরোগ চিকিৎসক হেলাল উদ্দিন আহমেদ এ জন্য দায়ী করেন মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর জোর কম দেওয়ার কারণকে। পাশাপাশি মাদক সেবনের ঘটনা, আসক্তি বাড়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন মনে করি, ন্যায়বিচারের পথগুলোকে প্রভাবিত করতে পারব, বিচার পাওয়ার ঘটনা প্রভাবিত করতে পারব তখনই এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটে।’


এ ছাড়া মানুষের হঠাৎ রেগে যাওয়াকে দায়ী করেন তিনি। এ মনোরোগ চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষের হঠাৎ করে রাগ ওঠে না। ব্যক্তিত্বের কারণে, সামাজিক দক্ষতার অভাব থাকে বলে এমনটা ঘটে। পৃথিবীর সবার হঠাৎ রাগ ওঠে। কিন্তু সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, তখন বলা হয় তাঁর ব্যক্তিত্বের গড়নটাই এমন। এ ধরনের ব্যক্তিরাই এ ঘটনাগুলো ঘটান।’

কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে তিনি ‘অবজারভেশনাল লার্নিং’ হিসেবে ধারণা করছেন। অর্থাৎ আগের কোনো ঘটনায় ‘হিংসাত্মক সমাধানের’ পথ দেখে এএসআই একই সমাধানের পথ বেছে নিয়েছেন, এমনটা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেশ আগে রামপুরায় একজন মা দুটো শিশুকে হত্যা করেন। এর ঠিক পরপরই মায়ের হাতে শিশুর মৃত্যুর আরও ঘটনা ঘটল।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান খন্দকার ফারজানা রহমান মনে করেন, সামাজিক পরিবর্তনে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া আরও কিছু উপাদান প্রভাব ফেলে—বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও ‘লিভ টুগেদার’।
এ অপরাধবিজ্ঞানী বলেন, ‘এগুলো মেনে নেওয়ার মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি আমাদের দেশে। সামাজিক প্রথা ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু এরপর কী করণীয়, তা শিক্ষা দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেই।’


‘লিভ-টুগেদার আমাদের এখানে নেই,’ তিনি বলেন। ‘বিষয়টি নিয়ে দেশের আইনেও বিধিনিষেধ আছে। তাই মানুষ গোপনে এটা করে।’

সমাধান কী?
হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ যখন ঘটে, তখন আমরা শুধু শারীরিক বিকাশের দিকে নজর দিই। কিন্তু আরও বিষয় আছে নৈতিকতা, মানবিকতা বা আবেগ।


‘মানুষের মাঝে অস্থিরতা বাড়ছে। ঠুনকো ব্যক্তিত্ব নিয়ে বেড়ে উঠছি আমরা। ফলে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে করতে ব্যর্থ হচ্ছি।’ এসব নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিবাহ, পরিবার, জ্ঞাতি সম্পর্ক, ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, এতিমখানা) যে ভূমিকা থাকা দরকার তা ঠিকঠাক পালন করতে পারছে না।

এ অপরাধবিজ্ঞানী বলেন, ‘একক পরিবারে এখন মানুষের ঝোঁক বেশি। আগে যৌথ পরিবারে সমস্যা ভাগাভাগির যে বিষয়টি ছিল, এখন তা নেই। এখন নিজের সমস্যা, নিজের সমাধান। ফলে স্বাভাবিকভাবে মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুল, কলেজ, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে যেটা পাওয়ার কথা, সেটা পাচ্ছি না। মানুষের মাঝে যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’


এ ক্ষেত্রে খন্দকার ফারজানা রহমান সমস্যা সমাধানে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। কিশোর অপরাধের মতো অন্যান্য অপরাধ রোধে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারের ভূমিকার ওপরও জোর দেন তিনি।

এ ছাড়া মানুষের মানবিক গুণাবলি, সামাজিক নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘কমিউনিটি পুলিশিং বলে একটা জিনিস আছে, এটা শক্ত করতে হবে। এখানে পুলিশ ছাড়াও যুবক, স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে যুক্ত করতে হবে। এটাকে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে।’

পুলিশে মনোচিকিৎসায় জোর

অন্য পেশার লোকদের মতো পুলিশ সদস্যরাও ‘অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’ সমস্যায় ভোগেন। এটি মূলত একটি মানসিক সমস্যা যেখানে ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে বিরূপ ও সহিংস আচরণ করে। এএসআই কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও তেমনি, বলেন অপরাধবিজ্ঞানী খন্দকার ফারজানা রহমান।


এই মানসিক সমস্যাটি নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না উল্লেখ করে এ অপরাধবিজ্ঞানী বলেন, চাকরিরতদের মনোচিকিৎসায় জোর দেওয়া দরকার। বিশেষ করে পুলিশে। তিনি বলেন, ‘একজন পুলিশ সদস্যা সারা দিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। ব্যক্তি জীবনে ও চাকরি জীবনের চাপে ভালো করে নিজের দিকে তাকাতে পারেন না। হয়তো তিনি (এএসআই) সহ্য করেছেন (সম্মুখীন হয়েছেন), এ জন্যই এমন ঘটেছে।’
বাচ্চাটিকে হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘(আসমার) সন্তানের সঙ্গে তাঁর (সৌমেনের) সম্পর্কটা ঔরসজাত না। এই জায়গা থেকে বাচ্চাকে মেরে ফেলা হতে পারে। যেহেতু সন্তানকেও মেরেছে, সে জন্য হয়তো তাঁর মানসিক সমস্যা আছে।’

খুনের এই ঘটনাটিকে একদিক থেকে না দেখে, নানা দিক থেকে দেখার তাগিদ দেন এ অপরাধবিজ্ঞানী।