একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এক দণ্ডিতের রায় কার্যকর না হওয়া প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি বিভক্ত রায় দিলেও তিনি এখনো লিখিত রায় জমা দেননি। রায় পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। আইনমন্ত্রী সন্দেহ পোষণ করে বলেছেন, এটাও ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।
শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক প্রয়াত অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ৯৩তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনা সভায় গতকাল সোমবার আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি রাজধানীর ধানমন্ডিতে ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে এ স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘একজন (সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক বিচারপতি) বিভক্ত রায় দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনো রায় লেখেননি। আইনে বলে, পুরো রায় না পাওয়া পর্যন্ত তা কার্যকর করা যায় না। ওনাকে রায় লেখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে, এখন দেখা যাক। আপনি বিভক্ত রায় দিয়েছেন, এতই যখন জ্ঞান, রায় লিখতে অসুবিধা কী? তবে এটাও কিন্তু ষড়যন্ত্রের একটা অংশ হতে পারে।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে গত বছরের ৩ নভেম্বর তাঁর আপিলের রায় ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ। ওই বেঞ্চে ছিলেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
বিএনপির সঙ্গে সংলাপের কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে আনিসুল হক বলেন, ‘আমাদের তো ওরা মানুষ মনে করে না, তাদের সঙ্গে কোনো কথা হতে পারে না। সংলাপ হতে গেলে মৌলিক কিছু বিষয়ে বিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু উনি (খালেদা জিয়া) বিশ্বাস করেন পাকিস্তানে, আমরা বাংলাদেশে। ওনার সঙ্গে সংলাপ হলে আমি বলব, আপনি পাকিস্তানে চলে যান।’
আইনমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, যারা বর্তমানে সন্ত্রাস করছে, তাদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিচারের আওতায় আনা হবে। চলমান সন্ত্রাস বন্ধের জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিস্ফোরক পদার্থ আইন প্রভৃতি কাজে লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, সুশীল সমাজের বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক-সামাজিক সনদ করা যায় কি না, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, যেটি নিয়ে তাঁরা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হবেন। প্রশ্ন দাঁড়ায়, সংবিধান তাহলে কী? সংবিধানের প্রতি যদি আস্থা, আনুগত্য ও শ্রদ্ধা থেকে থাকে, তাহলে এর বাইরে নতুন করে কোনো সনদের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যাঁরা এটা করতে চাইছেন, প্রকারান্তরে তাঁরা সংবিধানের প্রতি অবজ্ঞা দেখাচ্ছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল-অবরোধ প্রসঙ্গে সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ বলেছেন, ‘কিসের পরীক্ষা, কিসের কী? আগে আইনের শাসন দরকার।’ এ বক্তব্যের সমালোচনা করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আবার বলেন কিসের আবার পরীক্ষা। যে একবার রাজাকার, সে অনন্তকালের জন্য রাজাকার। কিন্তু যে একবার মুক্তিযোদ্ধা, তার প্রতিটি কাজকর্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্মারক বক্তৃতায় সেন্টার ফর সোশ্যাল স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বলেন, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ মানুষের শত্রু। তিনি বলেন, মানুষ সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) না হলে মানুষ মানুষের ওপর নির্যাতন করে। কবীর চৌধুরী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ মানুষকে খুন করতে শেখায়, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য দেন আয়োজক সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। মুনতাসীর মামুন প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করা যায়, তাহলে বিচারপতিদের সমালোচনা করা যাবে না কেন? তাঁরা কি প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বড়?
আরও বক্তব্য দেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, শহীদ বুদ্ধিজীবী আলীম চৌধুরীর মেয়ে নুজহাত চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন