default-image

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বে জনজীবন থমকে গেছে। আক্রান্ত হচ্ছেন লাখো মানুষ, মৃত্যুবরণ করছেন সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ। কোভিড-১৯ সংক্রমণের শুরুতে সরকার গত ১৮ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এরপর নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। 

দু-একটি বাদে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট আছে। এর সমাধান হিসেবে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা এবং নিকটবর্তী শহরের মেসে নিজস্ব অর্থায়নে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেসে অবস্থানকারী অনেক শিক্ষার্থী অনেকে টিউশনি বা পার্ট টাইম চাকরি করে নিজ খরচে পড়েন। এখন সে পথ বন্ধ। পরিবার বিভিন্ন উৎস থেকে আয় করে থাকে, যা এখন বন্ধ। এমন কঠিন সময়ে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা মেসে অবস্থান না করলেও মাসের পর মাস ভাড়া দিতে হচ্ছে বা হবে, যা অমানবিক। মেসের মালিকেরা ভাড়ার জন্য ফোন করে বা খুদেবার্তায় শিক্ষার্থীদের মেসের ভাড়া পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেকে মেস ভাড়া নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন ছাত্রছাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ছুটিকালীন মেস ভাড়া মওকুফের দাবি তুলেছেন। কোথাও কোথাও তাঁরা মেস ভাড়া মওকুফের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের কাছে খোলা চিঠি ও স্মারকলিপি দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ, খুলবে কবে তার নিশ্চয়তা নেই, মেসের মালিকেরা চাপ দিচ্ছেন ভাড়া প্রদানের জন্য, যত দিন বন্ধ থাকবে তত দিন পর্যন্ত কি ভাড়া প্রদান করতে হবে? মেসে না থেকেও ভাড়া প্রদান করতে হবে? ব্যবহার না করেও বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে? নিজেরা পরিবারসহ কীভাবে দিনাতিপাত করব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, এর মধ্যে অভিবাবক কীভাবে মেসের ভাড়া দেবেন। শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ঠিক তেমনি তাঁরা অসহায়ত্বও প্রকাশ করেছেন সংকোচ পরিহার করে। অনেক শিক্ষার্থীর বাবা দিনমজুর। এ সময় কোনো কাজ নেই, কোনো সঞ্চয়ও নেই, এরূপ পরিস্থিতিতে কারও কাছে ধারও চাইতে পারছেন না। কিন্তু মেসের মালিকেরা ভাড়ার টাকার জন্য দিনের পর দিন চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। অপর দিকে যাঁরা টিউশনি করে বা অন্য কোনো পার্ট টাইম চাকরি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন, তাঁদের সেসব কাজও বন্ধ। তাই কোথা থেকে তাঁরা মেস ভাড়া দেবেন, তা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এমন দুঃসময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে এভাবে ভাড়া আদায় একেবারেই অনুচিত। তাই যত দিন করোনা ভাইরাসঘটিত মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে, তত দিন মেস ভাড়া মওকুফ করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা মেসমালিকদের মানবিক হওয়ার আকুল আবেদন জানান।
অপর দিকে ভাড়ার চাওয়ার পক্ষে মেস মালিকদের দিক থেকেও রয়েছে নানাবিধ সংগত কারণ। যাঁর আয়ের পথ ওই মেস ভাড়া, তাঁরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন। মালিকপক্ষ প্রতি মাসে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ভাড়া না পেলে বিদ্যুৎ ও পানির বিল মালিকদের ঠিকই দিতে হচ্ছে।
আবার করোনাভাইরাসের কারণে দেশের সব খাতের অর্থনীতিতে বড় আঘাত আসা শুরু হয়েছে। যাঁরা মেস ব্যবসায় জড়িত, তাঁদের কিছু না কিছু ক্ষতি হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু নয়? অধিকাংশ মেসমালিকদের এটিই প্রাথমিক পেশা নয়। ঢাকা-চট্রগ্রামের মতো বড় শহর বাদ দিলে অধিকাংশ জেলা শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে এবং বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় যেসব মেস ব্যবসা গড়ে উঠেছে, তাঁদের অধিকাংশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকার বা অন্যান্য পেশাজীবী ব্যাংকঋণ দিয়েই বাসা-বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ব্যতিক্রম খুব কম, যাঁরা পৈতৃক সম্পদ বা পেনশনের টাকা দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং শুধু মেস ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। যাঁরা ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়ি করেছেন এবং মেস হিসেবে ভাড়া দিয়ে উপার্জন করছেন, তাঁদের বক্তব্য, ব্যাংক লোনের কিস্তি দিতে হবে, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল দিতে হবে। এমনকি যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত, তাঁরা স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক থেকে বেতন উত্তোলন করেন, তার বিপরীতে লোন নিয়েছেন, সে কিস্তিই আগামী জুন পর্যন্ত স্থগিত! অনেক ক্ষেত্রে কেন জানি না তাঁরা মনে হয় ভুলেই গিয়েছেন যে লোনের ওপর ইন্টারেস্ট বন্ধ করেছে, ক্ষেত্রবিশেষে কিস্তিই স্থগিত করেছে, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস বিল আগামী জুন পর্যন্ত বিলম্ব ফি ছাড়া পরিশোধ করার জন্য সরকার নির্দেশনা দিয়েছে। বেশির ভাগ মালিকই শুরুর দিকে এক টাকা ভাড়াও ছাড় দিতে নারাজ ছিলেন। এ আচরণ খুবই অমানবিক ও অযৌক্তিক প্রতীয়মান হওয়ায় কিছুটা শিথিল হয়েছেন তাঁরা। এমনকি কিছু কিছু মালিক নিজ উদ্যোগে এ অবস্থা চলাকালীন পুরো ভাড়া মওকুফ করার ঘোষণাও দিয়েছেন। তাঁদের উদার মনের বহিঃপ্রকাশ ও সাধুবাদ জানাই।
ছাত্রছাত্রীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভাড়া মওকুফ বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিছিন্নভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে যবিপ্রবি ও হাবিপ্রবি ছাড়া এখনো তেমন আশাব্যঞ্জক সুরাহা অন্য কোথাও নজরে আসেনি। যবিপ্রবির উপাচার্য মো. আনোয়ার হোসেন করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বাসা–বাড়ির মালিকদের প্রতি মেস বা সিট ভাড়া মওকুফের আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি যশোর-৩ আসনের সাংসদ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তিনি বাসা-বাড়ির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানালে সর্বসম্মতিক্রমে করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবজনিত কারণে যত দিন যবিপ্রবি বন্ধ থাকবে, তত দিন ছাত্রছাত্রীরা ৬০ শতাংশ মওকুফে ভাড়া প্রদান করবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত।

অপর দিকে হাবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আবুল কাসেমের সম্মতিক্রমে চিঠির মাধ্যমে মেসমালিকদের ভাড়া মওকুফের জন্য মানবিক আহ্বান জানানো হয়েছে। উপাচার্যের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দফা বৈঠক হয়েছে। এপ্রিল থেকে করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ যত দিন থাকবে, তত মাস ৫০ শতাংশ মেস ভাড়া মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

* লেখক: অধ্যাপক ও পরিচালক, ছাত্র পরামর্শ এবং নির্দেশনা বিভাগ, হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। iparvez.fbg@hstu.ac.bd

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0