অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর জন্ম থেকে এ পর্যন্ত পেরিয়ে আসা সময়ের স্মৃতিচারণা করেন। নিজের শিক্ষাজীবন, শিক্ষকতা, শিক্ষকরাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি ও বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্ব নিয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক আজফার হোসেন।

জন্মদিন উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতার আগে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগীত পরিবেশন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবর্তন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি নুরুল হুদা, সমকাল পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খানসহ লেখক, কবি, রাজনীতিক ও ছাত্রনেতারা তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

default-image

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর জন্মস্থান মুন্সিগঞ্জের আড়িয়ল বিলসংলগ্ন একটি প্রত্যন্ত গ্রাম—এই তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার বাবা চাইতেন আমি একজন আমলা হই, কারণ তিনি আমলাতান্ত্রিকতা পছন্দ করতেন। আর মা ছিলেন গণতান্ত্রিক। তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলতে পছন্দ করতেন। আমি মায়ের গণতান্ত্রিক মানসিকতার বেশি অনুসারী হয়েছি।’

ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘তিন আমলেই আমি দুর্ভিক্ষ দেখেছি। আমলাতান্ত্রিকতা দিয়ে দেশ চালাতে দেখেছি। যে কারণে রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী ও দমনমূলক আচরণের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো এই রাষ্ট্রের শাসকেরা জনগণের সম্পদ লুট করছে, আর বিদেশে তা পাচার করছে। রাষ্ট্র বদল হয়েছে, কিন্তু শাসকদের আচরণের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’

দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে একজন শিক্ষক পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। সেখান থেকে নিয়োগপত্র এসেছিল। কিন্তু দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ছেড়ে আমি অন্য কোথাও যাইনি। রাও ফরমান আলী দেশের যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যার জন্য তালিকা করেছিলেন, তার মধ্যে আমার নামও ছিল। কিন্তু আমার বাসার ঠিকানা তাদের কাছে না থাকায় তারা আমাকে খুঁজে পায়নি।’

default-image

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেককে ধনসম্পদ লুট করতে, হত্যা ও ডাকাতি করতে দেখেছেন উল্লেখ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ওই প্রবণতা এখনো বন্ধ হয়নি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমি সারা জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষকরাজনীতি করেছি। চারবার নির্বাচন করে তিনবার উপাচার্য হওয়ার মতো ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছি, কিন্তু কখনো উপাচার্যের দায়িত্ব নিইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা, একাডেমিক কাজের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’

নিজের জীবনের শেষ ইচ্ছা তুলে ধরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি দেশে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তন আসবে। এ জন্য দেশের সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। দেশের পাড়ায় পাড়ায় পাঠশালা গড়ে তুলতে হবে। সেখানে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের মতো বিষণ্নতার প্রবণতা ও কাজী নজরুল ইসলাম-সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো বিদ্রোহের প্রবণতা আছে। দেশের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হলে তরুণদের ওই বিদ্রোহের প্রবণতাকে সংগঠিত করে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন