বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এসব প্রকল্প যখন হাতে নেওয়া হয়েছিল, তখন মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। এখন ব্যয় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। বিসিক বলছে, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বেড়েছে।

প্রকল্পগুলো হলো বিসিক শিল্পপার্ক, সিরাজগঞ্জ; বিসিক শিল্পনগর, ভৈরব; বিসিক শিল্পপার্ক, টাঙ্গাইল; বিসিক প্লাস্টিক শিল্পনগর; নরসিংদী বিসিক শিল্পনগর সম্প্রসারণ; বিসিক মুদ্রণ শিল্পনগর; বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগর; বিসিক শিল্পনগর রাউজান; বরিশাল বিসিক শিল্পনগরের অনুন্নত এলাকা উন্নয়ন এবং উন্নত এলাকার অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণ এবং বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল
পার্ক, মুন্সিগঞ্জ।

জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব কমিটির গত ২১ মার্চের বৈঠকে বিসিকের এই প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এসব প্রকল্পের ধীরগতি
নিয়ে বৈঠকে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটি। তাঁরা বিসিককে কাজে আরও যত্নবান হওয়া এবং প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে
গুরুত্ব বিবেচনা করে সঠিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দেন।

সংসদীয় কমিটি সূত্র জানায়, কমিটি বিসিকের প্রকল্পগুলো নিয়ে অসন্তোষ ও অনাস্থার কথা জানায়। দুই বছর আগে কমিটি এই প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করেছিল। এই দুই বছরে কাজের খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।

সংসদীয় কমিটি বৈঠকে বলেছে, প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আর্থিক ব্যয় ও কাজের অগ্রগতি প্রায় একই। এটা হওয়ার কথা নয়। আর্থিক অগ্রগতির চেয়ে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি বেশি হওয়ার কথা (অর্থাৎ ২৫ শতাংশ টাকা খরচ হলে কাজ হওয়ার কথা ২৫ শতাংশের বেশি)। কিন্তু দুটি সমান হওয়ার মানে ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ওই বৈঠকে একজন সদস্য বলেন, একটি প্রকল্পও সময়মতো শেষ হয়নি। কোনো কোনো প্রকল্প দ্বিতীয় তৃতীয়বার সংশোধন করা হয়েছে। প্রথমবার সংশোধন করার ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষা করা উচিত।

সূত্র জানায়, বৈঠকে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মুহ. মাহবুবর রহমান এ বিষয়ে জবাব দিতে গিয়ে বিসিকের ইতিহাস–ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে কমিটির একজন সদস্য প্রশ্ন করেন, গত ১০ বছরে দেশে কতগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়েছে আর এ সময়ে বিসিক কয়টি প্রকল্প করেছে? বিসিকের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো জবাব দিতে পারেননি।

জানতে চাইলে বিসিকের চেয়ারম্যান মুহ. মাহবুবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার পর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়। জমি অধিগ্রহণেই অনেক সময় চলে যায়। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে দেরি হওয়ার মূল কারণ এটি। প্রকল্পগুলোর সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। অনুমোদিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে।

বিসিক শিল্পপার্ক, সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জ শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বে যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠছে বিসিক শিল্পপার্ক, সিরাজগঞ্জ। প্রকল্পটির কর্মকর্তারা বলছেন, ৪০০ একর জায়গায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৮২৯টি শিল্প প্লট তৈরি হবে।

২০১০ সালে ৩৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় ধরে চার বছরমেয়াদি এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পুনর্নির্ধারিত হওয়ার ওই চার বছরে কোনো কাজই হয়নি। পরে প্রকল্পটি প্রথম দফায় সংশোধন করে ৪৮৯ কোটি ৯৬ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে মেয়াদ ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছাড়পত্র না পাওয়ায় কাজ এগোয়নি। পরে দ্বিতীয় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৬২৮ কোটি ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। এবার অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি আবার সংশোধন করা হয়। নতুন করে ব্যয় ধরা হয় ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ করতে বলা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজের আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় সময়সীমা ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ পর্যায়ে অবশ্য ব্যয় বাড়ানো হয়নি।

সরেজমিনে গত বুধবার প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাটি ভরাটের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কার্যালয় নির্মাণ শেষ পর্যায়ে। এখন চলছে প্রকল্পের মধ্যে ১৭ কিলোমিটার রাস্তা ও ৩৪ কিলোমিটার নালা (ড্রেন) নির্মাণসহ ১২ ধরনের কাজ। সময় শেষ হতে চললেও প্রকল্পের কাজের এখনো অনেকটাই বাকি। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলেছেন, ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ আরও কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।

সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আবদুল খালেক প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০০ একর জমি ২০১৪ সালে বিসিক বুঝে পায়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন, নদী তীরবর্তী হওয়ার কারণে নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্মতি এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করতে অনেকটা সময় চলে যায়। সব অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৮ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ মাঠে গড়ায়। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজের ৭৩ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে আরও বেশ কিছু সময় লাগবে।

অন্য প্রকল্প

বিসিক সূত্র জানায়, টাঙ্গাইলে বিসিক শিল্পপার্ক প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। এটি শেষ হওয়ার কথা ২০১৭ সালের জুনে। তিন দফা প্রকল্পটি সংশোধন করে এখন চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। প্রথমে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬৪ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২৯৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা হয়েছে।

বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগর গড়তে প্রকল্প নেয় ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। ২০১৯ সালের জুনে এটি শেষ হওয়ার কথা। নথিপত্র অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণে সময়ক্ষেপণ ও অন্যান্য কারণে ইতিমধ্যে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। নতুন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। শুরুতে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৩ কোটি টাকা। আর এখন ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৩০৯ কোটি টাকা।

২০১৬ সালে হাতে নেওয়া চট্টগ্রামের রাউজানে বিসিক শিল্পনগর প্রকল্পটি একবার ব্যয় বৃদ্ধিসহ সময় বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজ শেষ হয়নি। পরে গত বছর ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া এ বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, এখনো সীমানাপ্রচীর ও মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়নি। এখন পর্যন্ত ১৮ একর জমির মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ১৭ একর জমির মাটি ভরাটের কাজ চলছে।

এই প্রকল্পের পরিচালক মুহাম্মদ জামাল নাসের প্রথম আলোকে বলেন, একবার মেয়াদ বাড়ালেও করোনার কারণে কাজ কিছুটা পিছিয়েছিল। ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

‘আমরা কোনো উত্তর দিতে পারি না’

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে শিল্পনগর প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১২ সালে। ২০১৬ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা। দুই দফা সংশোধন করে এখন চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এখন ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৮০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনো দৃশ্যমান হয়নি। অথচ প্রকল্পের সময় শেষ হতে বাকি আর আড়াই মাস।

তবে প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের দাবি, অবকাঠামো দৃশ্যমান না হলেও এরই মধ্যে ৬৬ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। একাধিক বিভাগের কাজ হচ্ছে একসঙ্গে। যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করে আনা নিয়ে তিনি যথেষ্ট আশাবাদী।

গত বুধবার সকালে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে সড়ক নির্মাণের জন্য মাপের কাজ চলছে। একটি পুকুর খনন করা হচ্ছে। প্রশাসনিক ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও নালা নির্মাণকাজের প্রস্তুতি চলছে।

ভৈরব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিসিক শিল্পনগর কখন থেকে কার্যকর হবে—এ জিজ্ঞাসা এখন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের। কিন্তু আমরা কোনো উত্তর দিতে পারি না।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সুমন মোল্লা, ভৈরব, আরিফুল গণি, সিরাজগঞ্জএস এম ইউসুফ উদ্দিন, রাউজান]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন