রাজাকারের নামে নামফলক ঢেকে দিতে নির্দেশ
বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলীর নামে সড়ক কেন নয় : হাইকোর্ট
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সিইউএফএল (চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড) এলাকা থেকে পারকি সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার পথে বাঁ দিকে অবস্থিত সড়কটির নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলীর নামে নামকরণ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট।
গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে আজ সোমবার বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন।
‘একটি সড়ক এবং লজ্জার ইতিহাস’ শিরোনামে আজ প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়, যা নজরে এলে শুনানি নিয়ে ওই আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজাকার আবদুল গণি চৌধুরীর নামে ওই সড়ক নামকরণের ফলকটি অবিলম্বে ঢেকে দিতে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ায়েস আল হারুনী। আদালতে উপস্থিত আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন শুনানিতে অংশ নেন।
পরে আলতাফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রাজাকার আবদুল গণির নাম বাদ দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলীর নামে ওই সড়কের নামকরণ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজাকারের নামে থাকা সড়কের নামফলকটি অবিলম্বে ঢেকে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
প্রথম আলোর ‘একটি সড়ক এবং লজ্জার ইতিহাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলীর শহীদ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এক রাতে রাজাকারদের অতর্কিতে হামলায় শহীদ হন রুস্তম। প্রায় শেষ রাতের দিকে এ ঘটনা ঘটে। তাঁর লাশ নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তে রুস্তমের লাশ দাফন করা হয় সুরমা নদীর পাড়ে। সামরিক কায়দায় তাঁকে বিদায় অভিবাদন জানান সহযোদ্ধারা। জয়ের আনন্দের মধ্যেও সঙ্গীকে হারানোর বিষণ্নতা নিয়ে ফিরে যান সহযোদ্ধারা।
পরে রাজাকাররা রুস্তমের লাশ তুলে গলায় দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল গণি চৌধুরী ও রাজাকার কমান্ডার জালাল চৌধুরীর নেতৃত্বে রাজাকার-আলবদররা এখানে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়াসহ হেন কোনো দুষ্কর্ম নেই, যা করেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বীর মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ রুস্তম আলীর নামে সড়কের নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যে সড়কটিতে লেগে আছে তাঁর রক্তের দাগ, তাঁর মৃতদেহের অবমাননার চিহ্ন, সেই সড়কটিকে শহীদ রুস্তম আলী সড়ক নামকরণ করার প্রস্তাব তাঁরা পৌঁছে দেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে। সরকারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে নিজেরাই সাইনবোর্ডে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন শহীদ রুস্তমের নাম। পঁচাত্তরে সপরিবার বঙ্গবন্ধুর হত্যা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ব্যাপারটি আর এগোয়নি। বরং এ সড়কের নাম হয় রাজাকার আবদুল গণির নামে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আনোয়ারা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা আবার শহীদ রুস্তমের নামে সড়কের নামকরণের দাবি নিয়ে মাঠে নামেন। সড়কটি উন্নয়নের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। ২০১০ সালে এলজিইডি এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের দপ্তর, চট্টগ্রামের বরাতে একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। কিন্তু সড়কের নাম দেখে বাকরুদ্ধ এলাকাবাসী, ক্ষোভে-বেদনায় পাথর মুক্তিযোদ্ধারা! সড়কের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আবদুল গণি চৌধুরী বারশত গোবাদিয়া লিংক রোড’।
আজ হাইকোর্ট রাজাকার আবদুল গণি চৌধুরীর নামে ওই সড়ক নামকরণের ফলকটি অবিলম্বে ঢেকে দিতে নির্দেশ দিলেন।