default-image

তিন বছর আগের কোনো একদিনের গল্প। সেদিন অজস্র জলরাশির ভিড়ে ডুবে ছিল আরামবাগের অলিগলি। প্রশস্ত রাস্তা ধরে যেদিকে চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। আকাশ মেঘে মেঘে বার্তা ছুড়ে দিলেও কলেজ থেকে আসেনি কোনো নোটিশ। ক্লাস মিস হওয়ার টেনশন থেকেও বড় টেনশন ছিল, ওই দিন ফিসিকস ল্যাব মিস হয়ে যাওয়ার টেনশন। ফিলিপ স্যারের এই ল্যাবে দুই বছরে কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল, লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। আর ক্যাম্পাসের প্রতি টানও ছিল বেশ। তাই বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া শহরের রাস্তা ধরেই রিকশা নিয়ে ক্যাম্পাসে রওনা দিই।

শাহজানপুরে আমতলার সামনে দিয়ে বাঁয়ের গলিতে যেতেই রাস্তায় পানির দেখা পেতে শুরু করি। তারপর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল পেছনে ফেলে আইডিয়ালের সামনের পদচারী–সেতু ক্রস করে যেতে যেতে বুঝতে পারি, এখন আর প্রাণের শহর ঢাকায় নেই আমি, সুদূর কক্সবাজারে চলে এসেছি!

default-image

‘সাগর’–এর ঢেউয়ের পর ঢেউ পাড়ি দিতে দিতে কলেজের সামনের পদচারী–সেতুর কাছে এসে রিকশা থামাই। নিজের কলেজের ব্যাগ তখন ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। কোনো শখে তখন ছাতার জায়গায় রেইনকোট ইউজ করতাম এখনো জানি না। আমি নিজের ঘোলাটে চশমা দিয়ে আশপাশে তাকাতে থাকি চেনা মুখের আশায়। আর রিকশাওয়ালা মামা আমার দিকে তাকাতে থাকেন ৫০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। টাকা–পয়সা থেকে শুরু করে আইডি কার্ড এগুলো রেইনকোটের ভেতরে জামা হাতড়ে এই ‘সাগরে’র মধ্যে বের করা আরেক ঝামেলা।

যাহোক, গেটের কাছে যেতে যেতে বুঝতে পারি আইডি সঙ্গে নেই। তারপর বুকের ভেতর চলতে চলতে একটাই কথা বাজতে থাকে, গেটের মামা কি এতটাই নিষ্ঠুর যে এত দূর থেকে সাগর পাড়ি দেওয়া মানুষটাকেও ভেতরে জায়গা দেবে না?

অবশেষে ভেতরে ঢুকতে পারলাম এবং নিজের কলেজ প্রাঙ্গণকে নতুন এক রূপে দেখলাম। ঘোলাটে পানির মলাটে ঢেকে যাওয়া মাতা মেরির প্রাঙ্গণ ধরে হাঁটতে ভালোই লাগছিল অবশ্য! বৃষ্টির পানিতে স্বপ্নের কলেজ একাকার। খেলার মাঠ থেকে শুরু করে গাঙ্গুলি ভবন, হেরিংটন ভবনের নিচতলা যেন নদীর স্রোতে ভাসছে। আর সেই স্রোতের মধ্যে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে সারি সারি বালক। আমার চোখেও তখন একই সঙ্গে মুগ্ধতা ও আশঙ্কা। আশঙ্কা বাড়ি ফিরব কীভাবে তা নিয়ে। মনের মধ্যে চলছে নোটিশ কখন দেবে সে উদ্বেগ।

default-image

একসময় নোটিশ এল। দলে দলে চিৎকার করে সোনালি-কালো কাপড়ে জড়ানো বালকের দল হাঁটতে লাগল গেটের দিকে। রাস্তায় তখন রিকশার সংখ্যা কম। গাড়ি আসছে একের পর এক আর জমে থাকা পানিতে ঢেউ তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছে। সেই ঢেউয়ের মধ্যে আনন্দে উচ্ছ্বাসে চিৎকার করতে করতে হেঁটে বাড়ি ফিরে চলেছি অজস্র বালক।

আজ অনেক দিন পর এত সময় নিয়ে বৃষ্টি দেখছি। কলেজের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ঝুমবৃষ্টির দিনে আজকে আবার কলেজের সেই ড্রেস পরে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে এই পানির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কলেজে যেতে ইচ্ছা করছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন