default-image

তখন বিকেল, ঘড়ি বলছে ৪টা ৫৬। বইমেলার এক প্রান্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকতেই বাংলা একাডেমির বিলবোর্ডের সামনে কয়েক তরুণের সেলফি উৎসবে আটকে গেল চোখ। ‘রাব্বী, আবার দাঁড়া, হাসি দে, সেলফিটা ঠিকঠাক হয়নি।’—এমন টুকরো টুকরো কথায় মুঠোফোনে নিজেদের সেলফি তুলতে ব্যস্ত সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোস্তাকিম পিয়াল, আশিকুর রহমান আর মো. রাকিব রাব্বী। প্রায় প্রতিদিনই মেলায় আসে তারা। বইপত্র এখনো কেনা হয়নি তেমনভাবে। জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘ঘুরছি, দেখছি, তালিকা করছি। তালিকা দেখে বাছাই করে পরে বই কিনব। মেলা তো এখন মাত্র হানিমুন পিরিয়ড পার করল।’
হ্যাঁ, দেখতে দেখতে সাত দিন পার করল অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বৈরী রাজনৈতিক সময়ে মেলার এই ‘হানিমুন পিরিয়ড’-এর মধ্যে অবরোধ-হরতালের গুমোট পরিস্থিতি, পেট্রলবোমা আর দগ্ধ মানুষ এবং মানুষের আতঙ্কিত মন যেমন আছে, তেমনি আছে আশার জায়গাও। কারণ, দিনে দিনে ভিড় বাড়ছে মেলায়, মানুষ বই কিনছে।
গতকাল শনিবার মেলার সপ্তম দিন। কেউ বই কিনছে, কেউবা স্টল থেকে স্টলে ব্যস্ত নতুন বইয়ের তালিকা সংগ্রহে। শুক্রবার বিপুল মানুষের সমাগম ও আশানুরূপ বিক্রিবাট্টায় যে আশার ফুলকি ছিল সবার মধ্যে, গতকালও ছিল তারই রেশ। তবে শুক্রবারের তুলনায় কালকে মেলায় মানুষের উপস্থিতি ছিল কম।
মেলার সকালটি গতকালও ছিল শিশুদের। বেলা ১১টায় মেলার দরজা খুলে যাওয়ার পরপর অজস্র শিশু-কিশোরের উচ্ছলতা ও মুখরতায় ধীরে ধীরে ভরে উঠল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের শিশু চত্বর। বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ‘শিশু প্রহর’-এ স্টল থেকে স্টলে বিভিন্ন বয়সী শিশুরা ঘুরছিল পরিবারের সঙ্গে।
দুপুরবেলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শিশু চত্বর থেকে যে মুহূর্তে বই কিনছে নালন্দা বিদ্যাপীঠের তৃতীয় শ্রেণির তাসনিম রাইয়ান কিংবা ইকবাল খালেদ নামের ছোট্ট ছেলেসহ অনেকেই, মেলার আরেক প্রান্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তখনো ক্রেতার অপেক্ষায়। পরে সন্ধ্যায় অবশ্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রান্তটিও ভরে ওঠে।
মেলার সাত দিন নিয়ে লেখক-প্রকাশকদের রয়েছে নানা অভিমত। যেমন আগামী প্রকাশনীর বিক্রয়কেন্দ্রের প্রধান মিতিয়া ওসমান বললেন, ‘শুক্রবার ভালো বিক্রি হয়েছে। আজ এখন পর্যন্ত লোকজন তেমন নেই। আসলে হরতাল-অবরোধের কারণে এবার বিক্রি কম হচ্ছে। কিন্তু আমরা আশাবাদী।’ বিভাস প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রামশংকর দেবনাথ বললেন, ‘রাজনৈতিক খারাপ পরিস্থিতির কারণে ঢাকার বাইরের লোকেরা মেলায় আসতে পারছেন না। তা ছাড়া দুই প্রান্তে মেলা হওয়ার কারণেও কেউ হয়তো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ঘুরে চলে যান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন না।’ প্রথমা প্রকাশনের বিক্রয়কর্মী মো. ইউসুফ আশাবাদী। বললেন, ‘বিক্রি এখনো আমাদের প্রত্যাশাকে ছুঁতে না পারলেও একেবারে যে মন্দা, সেটি বলা যাবে না।’
ছুটির দিনে মেলার দুই অংশেই দেখা মিলেছে লেখক-সাহিত্যিকদের। এঁদেরই একজন কথাশিল্পী নাসরীন জাহান। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তাঁর কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, ‘মেলা প্রসারিত হওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করা যাচ্ছে। এটা ভালো দিক। বাইরে যতই আতঙ্ক থাক, মেলা প্রাঙ্গণে এর প্রভাব তেমন নেই। সবকিছু মিলিয়ে ভালো লাগছে।’ আর কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরের কথায় উঠে এল ভিন্ন প্রসঙ্গ, ‘এবারের মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এ অংশে কোন প্রকাশনী কোন দিকে, তা নিয়ে বাংলা একাডেমির দিকনির্দেশনা না থাকায় অনেকেরই অভীষ্ট প্রকাশনী খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া বইমেলার স্থান প্রসারিত হওয়ায় ভালোই লাগছে।’
শনিবার সকালে অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজন করে সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় ক শাখার সাধারণ জ্ঞান বিভাগে ৮০ জন প্রতিযোগী এবং খ শাখা উপস্থিত বক্তৃতা বিভাগে ১৭ জন প্রতিযোগী অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।
নতুন বই: একাডেমির তথ্যকেন্দ্র এবং সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শনিবার মেলার সপ্তম দিনে নতুন ২৯০টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ৩৯, উপন্যাস ৪০, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৪১, গবেষণা ৭, ছড়া ৭, শিশুসাহিত্য ২, জীবনী ২, নাটক ১, বিজ্ঞান ৩, ভ্রমণ ৩, ধর্মীয় ৩, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ১, রম্য ৪, চিকিৎসা ২, মুক্তিযুদ্ধ ৬, রাজনীতি ৩ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ৩৬টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল নজরুল মঞ্চে ১০টি নতুন বইয়ের মোড়ক খোলা হয়। এর মধ্যে অবসর থেকে এসেছে ফজল-এ-খোদার আলো-ছায়ার জোয়ার-ভাটা, আগামী প্রকাশনী থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের সুপ্রভাত বিষণ্নতা, দিব্যপ্রকাশ থেকে এসেছে আহসান হাবীবের দুই হাতে দুই আদিম পাথর, অনিন্দ্য প্রকাশনী আহমদ রফিকের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে হাসান আজিজুল হকের উপন্যাস শামুক ও সেলিনা হোসেনের নুন পান্তার গড়াগড়ি, অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে পূরবী বসুর কিংবদন্তির খনা ও খনার বচন, সংবেদ থেকে এসেছে পারভেজ হোসেনের নভেলা হরণ।
মেলামঞ্চের আয়োজন: শনিবার মেলামঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক জন্মশতবর্ষ শীর্ষক আলোচনা সভা। এতে প্রবন্ধ পাঠ করেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে আলোচনা করেন মীজানূর রহমান শেলী ও অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সিদ্দিকুর রহমান পারভেজের পরিচালনায় আবৃত্তি পরিবেশন করে মুক্তধারা সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্রের শিল্পীরা। সংগীত পরিবেশন করেন অরূপ রতন চৌধুরী, নীলোৎপল সাধ্য, শাহনাজ নাসরিন, ছায়া রানী কর্মকার, সুষ্মিতা আহমেদ, পল্লব গোমেজ, শাহনাজ পারভীন ও শাহীন আক্তার।
আজকের আয়োজন: আজ রোববার মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ পাঠ করবেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্বে আলোচনা করবেন আবুল মনসুর, সৈয়দ আজিজুল হক, নিসার হোসেন ও শরীফ আতিক-উজ-জামান।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন