বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পরীমনি মামলায় অভিযোগ করেছিলেন, ৮ জুন রাতে তাঁকে কৌশলে সাভারের বিরুলিয়ায় ঢাকা বোট ক্লাবে ডেকে নিয়ে যান তাঁর পূর্বপরিচিত তুহিন। সেখানে জোর করে তাঁকে মদ পান করানোর চেষ্টা করেন নাসির। একপর্যায়ে তাঁকে ধর্ষণের এবং হত্যার চেষ্টা চালানো হয়।

তবে ঘটনার পাঁচ দিন পর গত ১৩ জুন নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রথম বিষয়টি জানান পরীমনি। পোস্টে লেখেন, ‘আমাকে রেপ এবং হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।’ সেদিন রাতেই বনানীর বাসায় সাংবাদিকদের ডেকে ঢাকা বোট ক্লাবে সেই রাতে কী ঘটেছিল, তার বর্ণনা দেন। সেদিন কথা বলার সময় বারবার কাঁদছিলেন তিনি। পরদিন (১৪ জুন) সাভার থানায় পরীমনি বাদী হয়ে ব্যবসায়ী নাসির ও তুহিনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

পরীমনির মামলার পরই গ্রেপ্তার হন নাসির ও তুহিন। এ মামলায় এখন নাসির জামিনে আছেন। তিনি ঢাকা বোট ক্লাবেরও সদস্য। অন্য আসামি তুহিন এ মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় কারাগারে আছেন। শহিদুল এখনো পলাতক।

পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের বিষয়ে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে মঙ্গলবার রাতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। তবে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁর আইনজীবী আমানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে তাঁরা আদালতে আবেদন করবেন।

ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার মামলা করার আড়াই মাস পর গত ৪ আগস্ট পরীমনির বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। পরে তাঁকে বিদেশি মদসহ গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ মামলায় তিন দফায় মোট সাত দিন তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গ্রেপ্তারের ২৭ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর পরীমনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন।

অভিযোগপত্রে সেই রাতের বর্ণনা

অভিযোগপত্রে পুলিশ বলেছে, ৮ জুন রাত সাড়ে আটটায় পরীমনির বনানীর ভাড়া বাসায় আসেন তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ জিমি। এরপর জিমি মোবাইল ফোনে তুহিনের সঙ্গে কথা বলেন। রাত ১০টার সময় কিছু খাবার নিয়ে পরীমনির বাসায় হাজির হন তুহিন। পরে পরীমনি, তুহিন, জিমি এবং ফাতেমাতুজ জান্নাত (পরীমনির পরিচিত) একসঙ্গে বাসায় খাওয়াদাওয়া করেন। রাত সাড়ে ১১টার সময় তাঁরা উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। তবে তুহিন কৌশলে পরীমনিদের রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে বোট ক্লাবে নিয়ে যান। পরীমনিকে বোট ক্লাবে নিয়ে যাওয়ার তথ্য তুহিন আগেই ব্যবসায়ী নাসিরকে জানিয়ে রাখেন। তাঁদের জন্য একটি টেবিল প্রস্তুত করতে বোট ক্লাবের ব্যবস্থাপক আবদুর রহিমকে বলেন নাসির। ক্লাবে ঢোকার পর পরীমনি ও তাঁর সঙ্গীদের যে টেবিলে বসানো হয়, তার সামনে একটি টেলিভিশন ছিল। ক্লাবে ঢোকার পর নাসির ও শহিদুলের সঙ্গে পরীমনির পরিচয় করিয়ে দেন তুহিন। পরিচয়ের কিছুক্ষণ পর হাফপ্যান্ট পরে ক্লাবে আসা নিয়ে পরীমনির কস্টিউম ডিজাইনার জিমির সঙ্গে শহিদুলের কথা-কাটাকাটি হয়।

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ক্লাবে অবস্থান করার সময় পরীমনি, তুহিনসহ অন্যরা দুই বোতল মদ (ব্লু লেবেল) পান করেন। অন্য টেবিলে বসে তখন মদ পান করেন নাসির ও শহিদুল। রাত সোয়া একটার দিকে নাসির ও শহিদুল ক্লাব থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে তুহিন ও পরীমনি তাঁদের আবার বারে ডেকে নেন। পরে একসঙ্গে তাঁরা মদ পান করেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নাসিরসহ অন্যদের সঙ্গে মদ পানের পর একপর্যায়ে পরীমনি ক্লাবের ব্লু লেবেলের ছয় বোতল মদ নিতে চান। তখন ক্লাবের খাবার সরবরাহকারী আসাদুজ্জামান পরীমনিকে বলেন, একটি তিন লিটারের ব্লু লেবেল মদের বোতল রয়েছে। পরে তিনি ওই মদের বোতল পরীমনির হাতে দেন। পরীমনির সঙ্গে থাকা ফাতেমাতুজ জান্নাতও ক্লাব থেকে দুই বোতল মদ (রেড ওয়াইন) কেনেন। এর দাম ছিল ৮৮ হাজার ৬১০ টাকা। এই টাকা পরিশোধ করেন তুহিন। তবে পরীমনি যে তিন লিটারের মদের বোতল নিয়েছিলেন, সেটির দাম ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

এই টাকাও পরিশোধ করতে হবে ভেবে তুহিন কৌশলে নাসিরকে দিয়ে বলান, এই মদের বোতলটি ক্লাবের ‘স্যাম্পল’ (নমুনা)। এটা পার্সেল দেওয়া যাবে না। একপর্যায়ে নাসিরের সঙ্গে পরীমনির কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। তখন পরীমনিকে তর্কে না জড়াতে অনুরোধ করেন তাঁর সঙ্গে থাকা জিমি ও ফাতেমা। তখন খেপে গিয়ে তাঁদের থাপ্পড় মেরে পরীমনি বললেন, ‘আমি কি ড্রাঙ্ক?’

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পরীমনির সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর তুহিনের উদ্দেশে নাসির বলেন, ‘এ রকম...(মানহানিকর শব্দ) মেয়েকে কেন ক্লাবে নিয়ে এসেছ?’ এ সময় নাসিরকে বাধা দেওয়া এবং এ ঘটনার ভিডিও করার চেষ্টা করেন জিমি। তখন নাসিরের সহযোগী শহিদুল জিমিকে থাপ্পড় মারেন। এ ঘটনা দেখে পরীমনি খেপে গিয়ে টেবিলের ওপরে থাকা গ্লাস, বোতল ও অ্যাশট্রে নাসিরের দিকে ছুড়ে মারেন। তবে নাসির সরে যাওয়ায় তাঁর শরীরে লাগেনি। এরপরই পরীমনির উদ্দেশে অশ্লীল গালিগালাজ শুরু করেন নাসির ও শহিদুল। দুজনেই পরীমনিকে মারধর (থাপ্পড়) মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দেন এবং ভয়ভীতি দেখান। রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে নাসির ও শহিদুল ক্লাব ছেড়ে চলে যান। এরপর ক্লাবের কর্মচারীরা পরীমনিসহ অন্যদের ক্লাব থেকে বের হয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে তিনি সেখানে বসে ছিলেন। এ সময় ক্লাবের কিছু লাইট, এসি ও ফ্যান বন্ধ করে দেন কর্মচারীরা। তখন পরীমনির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে লাইট ও ফ্যান ছেড়ে দেওয়া হয়। রাত দুইটার দিকে পরীমনি ও তাঁর সঙ্গীরা ক্লাব ছেড়ে চলে যান।

পরীমনির আইনজীবী মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ অভিযোগপত্রে কী লিখেছে, এখনো জানেন না তাঁরা। শিগগিরই অভিযোগপত্রের অনুলিপি পেতে তাঁরা আদালতে আবেদন করবেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন