বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

হাবিজাবি বিচ্ছিন্ন ভাবনার জায়গায় এবারে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা মাথায় আসে। জায়গাটা যুক্তরাষ্ট্র বলেই রোডট্রিপটা এত নিরাপদ ছিল। বাংলাদেশের রাস্তায় আমরা কতটা নিরাপদ, কতটা সচেতন? এই প্রশ্নটা এখনো আমাদের কুরে কুরে খায়।

এখনো আমাদের পথে নামতে হয়, স্লোগান দিতে হয়—‘নিরাপদ সড়ক চাই’।

প্রতিবছর ২২ অক্টোবরে ‘নিরাপদ সড়ক চাই দিবস’ পালিত হয়। ১৯৯৩ সালের এই দিনেই যে একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ভাই তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা ভাবিকে হারান এক ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনায়।

জাহানারা কাঞ্চন, চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির, চিত্রনায়িকা টিনা খানসহ অনেকগুলো তাজা প্রাণ আমাদের ছেড়ে চলে যান। গভীর শোকে দুমড়েমুচড়ে পাথর হয়ে যান কাঞ্চন ভাই।

সে বছরের ১ ডিসেম্বর তিনি শুরু করেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন (নিসচা)। তারপর পেরিয়ে গেছে ২৮টি বছর। বুড়িগঙ্গায় কত পানি গড়িয়েছে, সূর্যকে ঘিরে পৃথিবী ঘুরে এসেছে ২৮ বার! কিন্তু সড়ক কি আদৌ নিরাপদ হয়েছে?

প্রতিদিন, বিশেষ করে ঈদ-পার্বণে পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাই সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু, রাস্তা পার হতে গিয়ে কিশোরের মৃত্যু। টেলিভিশনের খবরেও প্রায়ই দেখা যায় ট্রাক-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ২৫ জনের।

কথার কথা হিসাবে বাড়িয়ে বলছি না। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। আহত হয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার।

এমনকি ট্রাক-মাইক্রোবাসের এক সংঘর্ষে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর স্যারের মতো কীর্তিমানদের হারাই আমরা।

মৃত্যু, মৃত্যু আর মৃত্যু—এর কয়টাই-বা আমরা মনে রাখি। কেউ মনে না রাখলেও কাঞ্চন ভাই মনে রেখেছেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রয়াণদিবস ২২ অক্টোবরকে।

রাজপথে নেমেছেন, প্রেস কনফারেন্স করেছেন, মিটিং-মিছিল করে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন, পথচারীকে বুঝিয়েছেন, ড্রাইভারদের শিখিয়েছেন, এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের টনকও নাড়িয়েছেন।

তাই তো তাঁর ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামের একক আন্দোলনটি পরিণত হয়েছে এক রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে। এ আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে ২০১৮ সালে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। একটাই মূল দাবি ছিল তাদের—পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়। দাবি ছিল, তাদের বন্ধুর মৃত্যুর যেন বিচার হয় সঠিকভাবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০১৮ সালে দেশে চলমান বৈধ গাড়ির সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ ৪২ হাজার, কিন্তু বৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ৯ লাখ গাড়ি চালাতেন লাইসেন্সবিহীন চালকেরা।

তার ওপর দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার। ২০১৯ সালের এক জরিপ থেকে জানা যায়, গণপরিবহনের প্রায় ৭০ শতাংশ চালক দৃষ্টিসমস্যায় ভুগছেন। এ রকম হলে, তাঁরা তো চাইলেও দুর্ঘটনা এড়াতে পারবেন না।

৩.

default-image

গত ২৮ বছরে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জনও আছে। এর প্রথমটি হলো, সড়ক দুর্ঘটনা যে নিয়তির খেলা নয়, এর পেছনে কারও দোষ বা অবহেলা যে আছে, সেটা বুঝতে পারা।

এটা আমরা সবাই এখন বুঝি। দ্বিতীয় অর্জনটি হলো, ২২ অক্টোবরকে সরকারিভাবে ‘নিরাপদ সড়ক চাই দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এর মাধ্যমে সরকার সড়ক নিরাপদ করে তোলার ব্যাপারে সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর হাত ধরে এসেছে তৃতীয় অর্জনটি—সড়ক আইন।

দীর্ঘদিন ধরে হবে হবে করেও হচ্ছিল না। কিন্তু ২০১৮ সালে এসে একটি সড়ক আইন সরকার সংসদে পাস করেছে। তারপর আবার আইনটি সরকার সংশোধন করেছে। এখন দরকার এর সঠিক বাস্তবায়ন।

তবে শুধু আইন করে তো হবে না। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে দায়িত্ব নিয়ে। আমরা সবাই সেটা করিনি। কিন্তু কাঞ্চন ভাই নিজের শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঠিকই এগিয়ে এসেছেন।

২৮টি বছর ধরে তিনি চেষ্টা করছেন সড়ককে সবার জন্য নিরাপদ করে তুলতে। এ জন্যই মানুষ আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে। সরকার আজ অনেক বেশি কঠোর। আমরা সড়কে নিরাপত্তা চাই, নিরাপদে বাঁচতে চাই। সে জন্য জনসচেতনতা যেমন দরকারি, তেমনি যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে।

নিশ্চিত করতে হবে, ড্রাইভাররা যেন রাস্তার সঠিক নিয়মনীতি মেনে চলেন। যথাসময়ে গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করাতে হবে। পাশাপাশি, ড্রাইভারদের গাড়ি চালানোর মতো ফিটনেস আছে কি না, দেখতে হবে তা-ও। তাঁদের দৃষ্টিশক্তি বা শারীরিক যেকোনো সমস্যার দিকে খেয়াল রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে সেভাবে।

পথচারীদেরও বেশ কিছু দায়িত্ব আছে। ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে হবে। আন্ডারপাস বা ওভারপাস দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। একজন আরেকজনকে দোষারোপ না করে, সবাইকে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে সঠিকভাবে। তবেই বাস্তবায়িত হবে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবি।

৪.

‘বাচ্চারা নামো’

আমরা পৌঁছে গেছি। সবাই হাসিমুখে যে যার ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। তানিয়ার মুখে তৃপ্তির হাসি। নিরাপদে আমরা সবাই নাভিদ-রেমীর ওয়াশিংটনের বাড়ি চলে এসেছি।

এতক্ষণের ভাবনার রেশ এখনো কাটেনি। মনে মনে ভাবছি, এমনই তৃপ্তি নিয়ে আমরা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সড়ক পথে ঘুরে বেড়াব। আমাদের রাস্তাতেও আমার মেয়েরা পরম নিশ্চিন্তে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবে। বাংলাদেশের সব রাস্তা হবে নিরাপদ। বাঙালি বীরের জাতি, মনে-প্রাণে যা চায়, তা পায়।

আমরা নিরাপদ সড়ক চাই। সবার জন্য।


ফেরদৌস আহমেদ: অভিনয়শিল্পী

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন