বিতর্কের মুখে তালিকা বাতিল

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজাকারদের তালিকা করার চেষ্টা করে এক দফা পিছু হটেছে। ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর ‘একাত্তরের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা প্রকাশ: প্রথম পর্ব’ শিরোনামে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই তালিকায় দেখা যায়, এতে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ব্যক্তির নাম উঠে গেছে। আবার কুখ্যাত অনেক রাজাকারের নাম তালিকায় ছিল না। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, সংসদেও প্রশ্ন ওঠে। পরে তালিকাটি সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

নতুন আইনের খসড়ায় যা আছে

নতুন আইনের খসড়ার ৬ ধারায় জামুকার কার্যাবলি উল্লেখ করা আছে। এতে জামুকার একটি দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাজাকারদের তালিকা তৈরির কথা।

খসড়ায় বলা হয়েছে, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্য ছিলেন, আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং খুন, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগের অপরাধে জড়িত ছিলেন এবং একক বা যৌথ বা দলীয় সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের তালিকা প্রণয়ন ও গেজেট প্রকাশের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করবে জামুকা।

সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না জামুকার মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে রাজাকারের তালিকা তৈরির ক্ষমতা বা দায়িত্ব দেওয়া। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলে রাজাকারের তালিকা কখনো হবে না, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও শেষ হবে না।
শাহরিয়ার কবির, সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আইনটি পাস হলে জামুকা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকাও প্রণয়ন করতে পারবে।

নতুন জামুকা আইনে কাউন্সিলের সদস্য ৯ জনের পরিবর্তে ১১ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত ও সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আইনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত হলে মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাসংশ্লিষ্ট সংগঠনের নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে।

জামুকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

জামুকার অনুমোদিত জনবল ৩২ জন। এখন ১৮ জন কর্মরত। কর্মীরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরিতেই ব্যস্ত থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামুকার একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এখনো তাঁরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির ৫০ শতাংশ কাজও সম্পন্ন করতে পারেননি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজাকারদের তালিকা তৈরির কাজটিও জটিল। ২০১৯ সালে ২৮ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতন-ভাতা নেওয়া রাজাকারদের তালিকা জেলা প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে তালিকা চাওয়া হয়।

সে সময় শুধু ১১টি জেলা থেকে প্রতিবেদন এসেছিল। এর মধ্যে চাঁদপুরে ৯ জন, মেহেরপুরে ১৬৯ জন, শরীয়তপুরে ৪৪ জন, বাগেরহাটে ১ জন ও নড়াইল থেকে ৫০ জন রাজাকারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বাকি ছয়টি জেলার জেলা প্রশাসকেরা জানিয়েছিলেন, তাঁদের জেলার রেকর্ডরুমে রাজাকারদের নামের তালিকা তাঁরা পাননি। পরে অবশ্য বিভিন্ন জেলা থেকে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে সেগুলো ছিল অসম্পূর্ণ।

জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না জামুকার মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে রাজাকারের তালিকা তৈরির ক্ষমতা বা দায়িত্ব দেওয়া। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলে রাজাকারের তালিকা কখনো হবে না, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও শেষ হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় বলেছি রাজাকারদের তালিকা করতে হবে গবেষকদের দিয়ে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন