দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘গোয়ালন্দ ঘাটে এসে, ইলিশ ধরা পড়ে শেষে’ কবিতার সেই পঙ্‌ক্তি এখন শুধুই স্মৃতি। একসময় গোয়ালন্দে স্টিমারঘাট (বর্তমানে গোয়ালন্দ বাজার) ছিল। গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ–চাঁদপুর রুটে বড় বড় স্টিমার চলাচল করত। গোয়ালন্দ ঘাট থেকে সরাসরি শিলিগুড়ি ট্রেন কলকাতার শিয়ালদহে যেত। পদ্মার ইলিশ সরাসরি কলকাতায় বিক্রি হতো। পাওয়া যেত কালো তরমুজ। এখন স্টিমার ঘাট নেই, ট্রেন নেই। কালো তরমুজও নেই, পদ্মার সুস্বাদু ইলিশও নেই। কালের বিবর্তনে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে গোয়ালন্দ বাজার থেকে চলে গেছে দৌলতদিয়ায়। স্টিমারঘাট হারিয়ে গিয়ে হয়েছে দৌলতদিয়ায় ফেরিঘাট। প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার যানবাহন এবং অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পারাপার হন। তাঁদের বিশ্রাম ও খাওয়ার প্রয়োজনে ঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে খাবারের হোটেল, বোর্ডিংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

তবে পদ্মা সেতু চালু হলে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের অধিকাংশ গাড়ি চলাচল করবে পদ্মা সেতু দিয়ে। নিষ্প্রভ হয়ে পড়বে দৌলতদিয়া ঘাট। শুধু ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলার গাড়ি চলাচল করবে দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে। তখন স্বাভাবিকভাবে ঘাটের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে বেকার হয়ে পড়বে বহু মানুষ।

দৌলতদিয়া ঘাট বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল সরদার জানান, দৌলতদিয়া ঘাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে দুটি সংগঠনের প্রায় ১ হাজার ২০০ হকার রয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশ নদীভাঙা পরিবারের। তাঁরা ফেরি ও লঞ্চে ডিম, ঝালমুড়ি, ডাব, ফল, বইসহ নানা ধরনের পণ৵ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরির সংখ্যা বেশি থাকলে যানবাহন পারাপার বেশি হয়। এতে তাঁদের বেচাকেনাও বেশি হয়।

বাবুল সরদার শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পদ্মা সেতু যখন চালু হবে, তখন পারাপারের যানবাহনের সংখ্যা তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে। এতে কয়েক শ হকার বেকার হয়ে পড়বেন। এসব হকার পরিবারগুলোর তখন কী হবে—এই দুশ্চিন্তা ভর করছে তাঁদের মাথায়। বাধ্য হয়ে তাঁদের বিকল্প পথ বেছে নিতে হবে।

প্রতিদিন শুধু দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, যাত্রীবাহী বাসসহ ছোট গাড়ি পার হয়। দুই ঘাট মিলে প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক গাড়ি পারাপার হয়। প্রতিদিন এই ঘাট থেকে সরকারের রাজস্ব আসে ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকা। দুই ঘাট মিলে রাজস্ব আসে প্রায় দ্বিগুণ। যানবাহন পারাপারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন হাজারখানেক শ্রমিক। তাঁদের অধিকাংশ নদীভাঙনের শিকার।

বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়নের গোয়ালন্দ ঘাট শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম মিয়া বলেন, প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে শুধু পণ্যবাহী গাড়ি পার হয় ৬০০ থেকে ৭০০। অন্যান্য গাড়ি মিলে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় পার হয় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার গাড়ি। এসব গাড়ি পারাপারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় এক হাজার শ্রমিক। তাঁদেরও অধিকাংশ নদীভাঙনের শিকার।

আবদুস সালাম বলেন, ‘১৯৭৫ সাল থেকে আমি পরিবহন শ্রমিক। তবে কিছুদিন পরে পদ্মা সেতু চালু হলে আমাদের শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়বেন। ফেরিঘাটকে আধুনিকায়ন করে যদি বন্দর নগরী করা হয় এবং কার্গো চলাচল নিয়মিত হয়, তাহলে পণ্য লোড-আনলোডে শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।’

দৌলতদিয়া ঘাট বাজার ও ব্যবসায়ী পরিষদের সভাপতি মোহন মণ্ডল পদ্মা সেতু চালু নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই ঘাটের ওপর নির্ভর করে অন্তত তিন-চার হাজার পরিবার বেঁচে আছে। এ জন্য এই ঘাট আধুনিকায়ন করে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে, এসব শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান হতো। না হলে দৌলতদিয়া ঘাটের জৌলুস আর থাকবে না।

বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক লীগ দৌলতদিয়া নৌবন্দর শাখার সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর সঙ্গে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় নদীশাসনের পাশাপাশি বন্দর এলাকায় একটি ডকইয়ার্ড নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি। নদীশাসন হলে অন্তত ভাঙন থেমে যাবে। ডকইয়ার্ড হলে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন