default-image

বাংলাদেশি গবেষক মো. হারুন-অর রশিদ নতুন প্রজাতির তিনটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছেন। এগুলোর বৈজ্ঞানিক নামের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। এসব ব্যাকটেরিয়া কাজে লাগিয়ে উন্নত মানের জীবাণু-সার তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। এতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমবে, ফলনও বাড়বে।
মো. হারুন-অর রশিদ ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতিগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম Rhizobium bangladeshense, Rhizobium binae ও Rhizobium lentis। ব্যাকটেরিয়ার নামকরণের আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন সিস্টেমেটিকস অব প্রোক্যারিওটস (আইসিএপি) সম্প্রতি ওই তিনটি নামের স্বীকৃতি দিয়েছে। দুটি প্রজাতির নামে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ও বিনা।
এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বিনার নাম জীববিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল বলে মনে করেন হারুন-অর রশিদ।
শনাক্ত হওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলোর বৈশিষ্ট্য অন্য দেশের থেকে আলাদা। হারুন-অর রশিদ বলেন, Rhizobium leguminosarum নামের একধরনের ব্যাকটেরিয়া মসুর ডালের গাছে শিকড়ে গুটি সৃষ্টি করে, যা ওই উদ্ভিদে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে পুষ্টি জোগায়। এতে গাছে ইউরিয়া সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সারা বিশ্বে মসুরের শিকড়ে গুটি তৈরির জন্য ওই ব্যাকটেরিয়া দায়ী বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল। কিন্তু তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে মসুরের শিকড়ে Rhizobium leguminosarum নয়, বরং অন্য তিনটি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া গুটি তৈরি করে।
হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। মসুর ডালে গুটি তৈরিতে ব্যাকটেরিয়ার ভিন্নতা নিয়ে তাঁর লেখা গবেষণা নিবন্ধ ২০১১ সালে জার্মানি ও স্পেন থেকে প্রকাশিত সিস্টেমেটিক অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড মাইক্রোবায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোবায়োলজি ইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণা নিবন্ধে হারুন-অর রশিদ ব্যাখ্যা করেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মসুরে যে ব্যাকটেরিয়া থাকে, বাংলাদেশে তা নেই। এর মাধ্যমে নতুন ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিশ্চিত হয়। গত জুন মাসে যুক্তরাজ্যের ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সিস্টেমেটিক অ্যান্ড ইভল্যুশনারি মাইক্রোবায়োলজি সাময়িকীতে ওই ব্যাকটেরিয়া তিনটি প্রজাতির আলাদা নাম ও জিন-নকশা বা জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করেন হারুন-অর রশিদ।
হারুন-অর রশিদ বলেন, ব্যাকটেরিয়াগুলোর আলাদা পরিচয় দেওয়ার জন্য তাঁকে বাংলাদেশ, জার্মানি, সিরিয়া ও তুরস্কের বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করতে হয়েছে। বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। তিনি বাংলাদেশি মসুর ডাল গাছের নমুনা এবং ওই তিনটি ব্যাকটেরিয়া ও বিদেশি মসুর উদ্ভিদে গুটি তৈরির জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া প্রজাতিটির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর্থিক সহায়তায় হারুন-অর রশিদ ওই গবেষণা করেন। এ কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন তাঁর পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক জার্মানির হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইকেল বিঙ্ক।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হারুন-অর রশিদ বলেন, ব্যাকটেরিয়া প্রজাতিগুলো উপকারী। এগুলো ব্যবহার করে উন্নত মানের জীবাণু-সার তৈরি করে তা মসুর, খেসারি ও মটরশুঁটি উৎপাদনে প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। এতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমবে এবং ফলনও বাড়বে। বিনা ইতিমধ্যে ওই জীবাণু-সার তৈরির লক্ষ্যে গবেষণা শুরু করেছে।
দেশি ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে জীবাণু-সার তৈরির গবেষণা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের কাজ অত্যন্ত জরুরি। এটির সুফল প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারলে তা দেশের জন্য সত্যিই বড় অর্জন হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0