বৈশাখ মাসের দিন পনেরো বাকি থাকতেই হাওরের গ্রামগুলোতে ব্যাপারীদের আনাগোনা শুরু হয়। রং জমা (জমির মালিককে আগাম টাকা দিয়ে জমি চাষের অনুমতি) দিয়ে যেসব প্রান্তিক কৃষক ধান চাষ করেন, তাঁদের টাকার বড় জোগানদার এসব ব্যাপারী। ধান ওঠার পর বাজারে ধানের দাম যা–ই থাকুক না কেন, ব্যাপারীর বেঁধে দেওয়া দরে তাকে ধান দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বলা যায়, ধান জন্মানোর আগেই তা পানির দরে ব্যাপারীর হাতে তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হয়।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ৩ লাখ ১৭ হাজার কৃষকের মধ্যে কমপক্ষে ৬৫ হাজার কৃষকই অন্যের জমি নিয়ে চাষ করেন। কেতাবি ভাষায় তাঁরা বর্গাচাষি। কিন্তু বর্গা চাষের ঘোষিত নিয়মকানুন কিছুই মানা হয় না। জমি চাষাবাদ থেকে শুরু করে বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিকসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করতে হয় কথিত বর্গা কৃষক বা বাস্তবের রং জমার খাতককেই। যে কৃষক আগাম টাকা দিয়ে রং জমা (অগ্রিম টাকা দিয়ে জমি নেওয়া) নিতে পারেন না, তাঁর উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক নিয়ে যান জমির মালিক। ফলে জমির মালিককে দেওয়ার পর উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কৃষকদের কাছে তেমন কিছুই থাকে না। চলতি মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে যুদ্ধ করে নানা প্রতিকূলতার মাঝে যেসব কৃষক আধা পাকা ফসল রক্ষা করতে পেরেছেন, তাঁরাও কষ্টের ধান পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারবেন না। ধান শুকানোর আগেই মাঠ থেকে মহাজনদের দিয়ে দিতে হচ্ছে ভাগের অংশ।

কৃষক হাবিব কাজি জানালেন, বহু কষ্টে এবার ধান তুলেছেন। কিন্তু মহাজনি ঋণ আর জমির মালিকের অংশ দিয়ে কিছুই থাকে না তাঁদের।

আর যাঁদের ধান তলিয়ে গেছে, তাঁদেরও কড়ায়–গন্ডায় ফিরিয়ে দিতে হবে ব্যাপারী মহাজনের টাকা। ফলন যা–ই হোক, ব্যাপারীর হক আগে। তাঁরা খালি হাতে ফেরেন না। ধান দিতে না পারলে গরু নিয়ে টানাটানি করেন।

বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ নিয়ে গঠিত হাওর এলাকা। এখানে ধান ও মাছের পরেই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান প্রাণিসম্পদ। দেশের মোট গবাদিপশুর ২২ শতাংশ থাকে হাওরাঞ্চলে। আর মোট হাঁসের ২৪ শতাংশ আসে হাওরের জেলাগুলো থেকে। দুধ, মাংস ও ডিমের বড় জোগানদার হচ্ছে হাওর। কিশোরগঞ্জের হাওরে মহিষের দুধের পনির বলতে গেলে সারা দেশের চাহিদা মেটায়। এ ছাড়া কিছু কিছু উপজেলায় (যেমন সুনামগঞ্জের দিরাই) ভেড়া পালন বেশ জনপ্রিয়।

সুনামগঞ্জের সদর উপজেলা, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দিরাই, শাল্লা, ছাতক, দোয়ারাবাজারে গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা গরু পালন করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। গরু তাঁদের ‘নিদান’ (সংকট) কালের সহায়। গ্রামে কৃষক পর্যায়ে পরিবারপিছু দু–চারটা গরুর পাশাপাশি এখন ছোট ছোট খামার গড়ে উঠছে। নেই নেই করে সারা সুনামগঞ্জ জেলায় একে একে প্রায় সাড়ে পাঁচ শর মতো ছোট–বড় খামার গড়ে উঠেছে।

গবাদিপশুর খাদ্যসংকট তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে

বছরের একটা ফসল বোরো ধান যেমন হাওরবাসীর সারা বছরের খাদ্য জোগায়। তেমনি এই ধানের খড়ে হাওরপাড়ের প্রাণিসম্পদের সারা বছরের খাবার হয়। ধান তলিয়ে যাওয়ায়, ঠিকমতো পাকার আগেই ধান কেটে ফেলায় এবং কোথাও কোথাও গাছ রেখে শুধু শিষটা কেটে আনায় গোখাদ্যের দাম চড়তে শুরু করেছে গ্রামগুলোতে। তা ছাড়া বাথানগুলো থেকে এবার এক মাস আগে গরু–মহিষ নিয়ে এসেছেন অনেকে। তারও একটা চাপ আছে গোখাদ্যের ওপর। যাঁরা শুকনার সময় গহিন হাওরে গেছেন, তাঁরা জানেন বাথানের কথা। বাথান হচ্ছে সবুজ ঘাসের রাজ্যে প্রাণিসম্পদের নিরাপদ খাদ্য ও বাসস্থান। বর্ষার পানি নেমে গেলেই অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মালিকেরা তাঁদের গরু-মহিষ দেখভাল করার জন্য বাথান আয়োজকদের কাছে রেখে যান আর বৈশাখ মাসে ফিরিয়ে নিয়ে যান গ্রামে। শীতের সময় মাছ আর পরিযায়ী পাখির সঙ্গে দেখা মেলে গরু-মহিষেরও। কিছু লোক হাওরজুড়ে চরান হাজার হাজার গরু ও মহিষ। এবার ঢলের ভয়ে চৈত্র মাসেই ফিরিয়ে আনা হয়েছে গবাদিপশুদের।

চরম সংকটের সময়েও মানুষ চেষ্টা করেন তাঁর গবাদিপশু হাতে রাখতে। এটা অনেকটা তাঁর শেষ পুঁজির মতো—ভাঙতে চাই না। ২০১৭ সালের সর্বনাশা গ্রাম ভাসানো বন্যায় অনেকেই তাঁদের প্রাণিসম্পদ ধরে রাখতে পারেননি। হাওরের অনেক জাতের গবাদিপশুর ‘স্টক’ বা সংগ্রহ এ সময় হাতছাড়া হয়ে যায় গোখাদ্যের অভাবে। গত পাঁচ বছরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা গবাদিপশুর ‘স্টক’ আবার এক নতুন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। হালির হাওরপাড়ের মদনাকান্দি গ্রামের কৃষাণী ঝর্না রানী জানালেন, ‘নিজের খানি নিয়া কষ্ট নাই। কিন্তু গরুর খানি নিয়া জ্বালায় আছি।’

অনেকেই হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁদের প্রাণিসম্পদ, বিশেষ করে গরুগুলো রক্ষা করতে পারবেন না। এগুলো বেচেই তাঁদের বাকি দিনগুলো গুজরান করতে হবে। তবে কোনোভাবে অন্তত পরবর্তী দুই মাস (পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ) পর্যন্ত যদি গরুগুলো ধরে রাখতে পারেন, তাহলে কৃষকেরা একটা সম্মানজনক দাম পাবেন। অন্য এক বন্যায় টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের ভবানীপুর গ্রামে কাজ করার সময় ভগবান প্রসাদ নামের এক প্রবীণ কৃষক বলেছিলেন, ‘গবাদিপশু আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও আদরের। কিন্তু বন্যা এলে মানুষের খাবার নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও গবাদিপশুর খাবার নিয়ে কোনো ধরনের তৎপরতা দেখা যায় না।’

যে কৃষক গফুরের মতো দাঁতে দাঁত চেপে কম খাইয়ে তাঁর গবাদিপশু রক্ষার চেষ্টা করবেন, তাঁর জন্য অন্য বিপদও অপেক্ষায় থাকবে। কম খাবারজনিত অপুষ্টি গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বানবন্যায় গবাদিপশু নানা রোগব্যাধি, বিশেষ করে খুরারোগের ঝুঁকিতে থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, গ্রামের সংকীর্ণ পরিসরে এক গরু থেকে আরেক গরুতে রোগ সংক্রমিত হয় দ্রুত হারে। এসব আমলে নিয়ে গবাদিপশু সংবেদনশীল ত্রাণকাঠামোর প্রতি নজর দিতে হবে। বানভাসি হাওরে এবার চক্কর দেওয়ার সময় কথিত ত্রাণ তৎপরতায় গবাদিপশুর কোনো হিস্যা চোখে পড়েনি। ত্রাণের তালিকায় গোখাদ্য একটি আবশ্যিক সামগ্রী হিসেবে গণ্য করা উচিত।

‘হাওরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন’ প্রকল্পটি কি এই সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ‘হাওরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন’ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ২০১৭ সালের সর্বগ্রাসী ঢলে প্রাণিসম্পদের অভাবনীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প প্রণীত হয়। হাওরের প্রাণিসম্পদের সমস্যাগুলোকে সহজ করার জন্য তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের জীবনকাল ধরা হয়েছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন। সেই অর্থে এখনো জীবন্ত আছে হাওরের ৩৯টি উপজেলার জন্য নেওয়া এই কর্মসূচি। লাইভ স্টক ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর নামের ৩৩৮ জনের এক বিশাল কর্মীবাহিনী আছে এই প্রকল্পের। গত দুই বছর করোনার অমাবস্যায় অনেক কাজের গতি ছিল না। বেশি দূর এগোয়নি প্রকল্পের বাস্তবায়ন। কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণের ব্যবস্থাসহ ১১৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার বেশির ভাগই হয়তো খরচ হয়নি।

এই প্রকল্পের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা পারেন চলমান এবং আসন্ন ত্রাণ তৎপরতাকে গবাদিপশু রক্ষা ও গবাদিপশুর বিকাশ সহায়ক করে গড়ে তুলতে। প্রকল্পের শুরুতে করা ‘বেঞ্চমার্ক সার্ভে’কে ভিত্তি ধরে গবাদিপশু সুরক্ষার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরির এটাই সময়, এটাই সুযোগ।

লেখক গবেষক

nayeem [email protected]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন