default-image

গুলিস্তানে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের ফুটপাতে সাত-আট বছর ধরে স্কুলব্যাগ বিক্রি করেন মো. মনোয়ার। নিজে থাকেন ফকিরাপুলে মেসে। পরিবারের চার সদস্য থাকে কুমিল্লার লাকসামে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত মনোয়ারের বিক্রি ১৮০ টাকা। লাভ হয়েছে ৩০ টাকা। মাসের ১০ দিন চলে গেলেও বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেননি।
মনোয়ার বললেন, ‘প্রতিদিন বাড়ি থিকা ফোন দিতাছে। গত মাসে নিজের থাকা-খাওয়ার খরচই ওঠে নাই, বাড়িতে টাকা পাঠামু কী।’ জানালেন, স্বাভাবিক সময়ে তাঁর দিনে বিক্রি হতো আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলিস্তান ভাসানী স্টেডিয়ামসংলগ্ন ফুটপাত, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, বঙ্গবাজার, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, নিউমার্কেট, মিরপুর ১ ও ১০ নম্বর এলাকার ফুটপাতগুলো ঘুরে মনোয়ারের মতো অন্তত ৪০ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩৫ দিন ধরে চলা অবরোধ-হরতালে তাঁরা এখন দিশেহারা। দোকান খোলা রাখলেও তেমন ক্রেতা নেই, বিক্রিও কম। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখছেন দোকান। এসব ব্যবসায়ীর অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
মিরপুর ১০ নম্বর ফায়ার সার্ভিস ও সিভেল ডিফেন্স কার্যালয়ের উল্টো পাশের ফুটপাতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছেলেদের শার্ট ও টি-শার্টের পসরা সাজিয়ে বসেছেন কয়েকজন। তাঁদের সম্মিলিত হাঁক ‘একের মাল ২০০, হাফ দামে ২০০’। কিন্তু হাঁক শুনেও কোনো ক্রেতাকে দরদাম করতে দেখা গেল না।
ব্যবসায়ী লিমন আলী ১০ বছর ধরে এখানে বিক্রি করেন। বললেন, ‘এখানে ব্যবসা শুরুর পর থেকে কখনো এত দুরবস্থায় পড়িনি। আগে দিনে অন্তত ২০-২৫টি জামা-টি শার্ট বিক্রি হতো। এখন কোনো দিন পাঁচ, কোনো দিন ১০টি বিক্রি হয়।’
স্ত্রী, দুই ছেলেকে নিয়ে লিমন থাকেন ভাষানটেক বস্তিতে। লিমন জানালেন, ব্যবসা খারাপ থাকায় জানুয়ারি মাসের বাসা ভাড়া দিতে পারেননি। বাড়িওয়ালা জানিয়ে দিয়েছেন, সামনের মাসে ভাড়া না দিলে বাসা ছাড়তে হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে গ্রামে চলে যাবেন।
বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে কম্বল-শীতবস্ত্র নিয়ে বসেছেন কয়েকজন। এবারের শীতের অনেকটা সময়ই চলে গেছে অবরোধ-হরতালে। ফলে কম্বল-শীতবস্ত্র ব্যবসায়ীরা অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কম্বল দোকানি খোয়াজ আলী আক্ষেপ করে বললেন, ‘ব্যাচা নাই, তাও বইসা থাকি। পরশু, কালকে বিসমিল্লাহ (বিক্রি শুরু) হয় নাই। আজকেও এখন পর্যন্ত হইল না। বেচা-বিক্রির খুব বাজে অবস্থা। হরতাল-অবরোধে আমগো জীবন শ্যাষ।’
ফুটপাতের খোলা দোকানগুলোর মাঝেমধ্যেই কিছু দোকান বন্ধ। বন্ধ দোকানের চৌকি, বেঞ্চগুলো নীল ত্রিপল ও দড়ি দিয়ে বাঁধা। কয়েক দিন বন্ধ থাকায় ত্রিপলের ওপর জমেছে ধুলো-ময়লা, পাখির মল। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনের সামনের ফুটপাতে টানা কয়েকটি দোকান বন্ধ। বন্ধ দোকানগুলোর পাশে খোলা রয়েছে আবদুর রবের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির দোকান। তিনি বলেন, ‘ আয়-রোজগার নেই। দোকান খুলে রেখে লাভ হচ্ছে না। তাই বন্ধ করে তাঁরা হয়তো অন্য পেশা খুঁজছেন। আমাদেরও দোকান বন্ধ করার সময় চলে আসছে।’
অবরোধ-হরতালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রেিণকক্ষে শিক্ষার্থী উপস্থিতিও কম। এর প্রভাবও যেন পড়েছে নীলক্ষেতের ফুটপাতের বইয়ের দোকানগুলোতে। নীলক্ষেত সিটি করপোরেশন মার্কেটের ফুটপাতে নতুন-পুরোনো বই বিক্রি করেন আউয়াল আজিজ। পাঁচ সদস্যের পরিবারে আউয়াল একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আউয়াল জানালেন, ‘বেচা-বিক্রি কমে যাওয়ায় পরিবার নিয়া ঝামেলায় পড়ছি। গ্রামেও পাঠাতে পারছি না, ঢাকাতে থাকার খরচও জোগাতে পারছি না।’
গতকাল হরতাল থাকায় নিউমার্কেটের বড় ফটকগুলো বন্ধ ছিল, ক্রেতাদের ঢোকার জন্য ছোট ফটক খোলা। ২ নম্বর ফটকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে টানানো ব্যানারে লেখা ‘রাজনীতিবিদদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ব্যবসািয়ক পরিবেশ’। বন্ধ ফটকের এক পাশের ফুটপাতে নারীদের জুতা আর অন্য পাশে হাতব্যাগের দোকান।
জুতার দোকানি ইমন হোসেন বললেন, ‘অবরোধ-হরতালের আগে দিনে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি হতো। এখন পাঁচ শ-হাজার টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না।’ ইমনের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, ততক্ষণে দুপুরের খাবারের সময় পেরিয়ে গেছে। ইমন জানালেন, ‘বউনি (বিক্রি শুরু) না হওয়ায় আজকে দুপুরের খাবারও খাইনি।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন