মুঠোফোন ও ল্যান্ডফোনে আড়িপাতার পাশাপাশি ভাইবার, ট্যাংগো বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো মুঠোফোন বা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলোও সরকার নজরদারি করছে। টেলিযোগাযোগ খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞ, বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সম্প্রতি ইন্টারনেটে ভিডিও দেখার ওয়েবসাইট ইউটিউবে প্রকাশিত নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার কথাবার্তা আলোচনায় এসেছে। এতে একপর্যায়ে বোঝা গেছে, আলোচনার বেশির ভাগ অংশই ভাইবারের মাধ্যমে হয়েছে। সেখান থেকে তাঁদের কথোপকথন ধারণ করে ইন্টারনেটে ছাড়া হয়। এর আগে প্রকাশিত অডিও টেপগুলোর বেশির ভাগ ছিল মুঠোফোন থেকে রেকর্ড করা।
সাধারণত বড় কোনো সফটওয়্যার ছোট পরিসরে হাতে বহনযোগ্য যন্ত্রে ব্যবহৃত হলে তাকে অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস বলা হয়। মুঠোফোনে কথোপকথন, বার্তা ও ভিডিও বিনিময়ের জন্য জনপ্রিয় অ্যাপসের মধ্যে রয়েছে ভাইবার, ট্যাংগো, হোয়াটসঅ্যাপ, মাইপিপল ও লাইন।
গত মাসে বাংলাদেশে ‘নিরাপত্তার’ কারণে এই পাঁচটি অ্যাপসের সেবা বন্ধ করে দেয় সরকার। তখন বলা হয়েছিল, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এসব অ্যাপস ব্যবহার করতেন।
টেলিযোগাযোগ খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এসব অ্যাপস ব্যবহারকারীর ওপর নজরদারি করার কোনো প্রযুক্তি বা সক্ষমতা ছিল না। ওই পাঁচটি অ্যাপস বন্ধ করে তা নজরদারিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গতকাল মঙ্গলবার জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হক খান এ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে আইনের ভেতরে থেকে আড়িপাতার মতো কাজ করতে পারে।
অবশ্য তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার বলেন, সরকার স্বীকার না করলেও ধারণা করা যায়, সরকারের কাছে এ প্রযুক্তি রয়েছে। আর তা না হলে শীর্ষ পর্যায়ের দুজন রাজনৈতিক নেতার ভাইবার সংলাপ কীভাবে রেকর্ড হয়, কীভাবে ইন্টারনেটে চলে আসে?
ভাইবার বা অন্য অ্যাপসগুলো নিজেদের প্রযুক্তিকে নিরাপদ বলে সব সময়ই দাবি করে। তাহলে কীভাবে এসব অ্যাপসের কথোপকথন রেকর্ড করে বাইরে ছাড়া সম্ভব? জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রত্যেকের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা রয়েছে, যা আইপি বা ইন্টারনেট প্রটোকল নামে পরিচিত। কোনো ব্যক্তির ওপর নজরদারি করতে চাইলে ওই ব্যক্তির আইপি অ্যাড্রেসে ঢুকে তার কার্যক্রম নজরদারি করা সম্ভব। তাঁর পাঠানো বার্তা, ছবি, ভিডিও, কথোপকথন সবই নজরদারির আওতায় আনা যায়। ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ের (আইআইজি) সহায়তায় এটা করা হয়।
বাংলাদেশে ইন্টারনেটে কোনো ব্যক্তির ওপর নজরদারি করার বিষয়টির তথ্য মেলে গোপন তারবার্তা ফাঁস করে আলোচনায় আসা ওয়েবসাইট উইকিলিকসের নথিতে। এতে বলা হয়, ইন্টারনেটে নজরদারি করতে পারে এমন কয়েকটি সফটওয়্যার ২০১২ সালে ইউরোপীয় একটি কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশ কিনেছে। ব্যক্তিগত কম্পিউটার থেকে অডিও, ভিডিও এবং লিখিত কোনো ডকুমেন্ট দূরবর্তী অবস্থান থেকে নজরদারি করার জন্য ‘ফিনস্পাই’ নামে এই সফটওয়ারের লাইসেন্স কেনে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিনস্পাই কম্পিউটারে একবার যুক্ত করার পর এটি নির্দিষ্ট অপর কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেটের যেকোনো অ্যাপসের কথোপকথনও রেকর্ড করতে পারে। এ ছাড়া ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং, ই-মেইল এবং লুকানো কোনো ফাইল উদ্ধার করতে পারে। ব্যবহারকারীর কোনো পাসওয়ার্ড থাকলেও ফিনস্পাই তা উদ্ধার করতে সক্ষম।
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে মুঠোফোনে ভাইবারসহ অন্য অ্যাপস নজরদারি করা সম্ভব।
অনলাইন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ২৮ কোটি নিবন্ধনকৃত ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে ১০ কোটি মানুষ ভাইবার ব্যবহার করে থাকে। বিনা মূল্যে কথা বলার সুযোগের কারণে বিশ্বব্যাপী এ সেবা বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ, মাইলাইন, ট্যাংগোসহ অনেক অ্যাপসই জনপ্রিয়। তবে বাংলাদেশে ভাইবার ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি বলে তথ্যপ্রযুক্তি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
কিন্তু ভাইবারের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের এক পর্যালোচনায় নিরাপত্তার দিক থেকে ভাইবার সাত পয়েন্টের মধ্যে পেয়েছে এক পয়েন্ট। এ ছাড়া ব্যবহারকারীদের তথ্য বাইরের বিক্রি করা এবং নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে ভাইবারের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন