ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্যের মতে, ভাষাদূষণ বলে কোনো কিছু নেই। তাই বাংলা ভাষার দূষণ রোধ করার প্রশ্নই আসে না। ভাষাকে তার নিজের মতো করে চলতে দেওয়া উচিত।
‘প্রমিত বাংলা উপভাষার প্রকৃত সমস্যা ও এর পেশাদারি সমাধান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে গতকাল বুধবার শিশির ভট্টাচার্য্য এ মত দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে মুক্তবুদ্ধি চর্চাকেন্দ্র এই আলোচনার আয়োজন করে।
মূল প্রবন্ধে প্রথম আলোয় প্রকাশিত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধের উল্লেখ করা হয়। ওই প্রবন্ধে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যম, বিশেষত এফএম রেডিও ও বেসরকারি টেলিভিশনে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলায় উদ্বেগ জানিয়ে লিখেছিলেন, ভাষাদূষণ হচ্ছে প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে: উচ্চারণে ও শব্দব্যবহারে।
তবে শিশির ভট্টাচার্য্য তাঁর বক্তব্যে বলেন, তথাকথিত ভাষাদূষণের জন্য এফএম রেডিও বা টেলিভিশনের নাটক-সিরিয়াল দায়ী নয়। রেডিও শুনে বা টেলিভিশন দেখে কেউ ভাষা শেখে না। রেডিও বা টেলিভিশন সেই ভাষাই ব্যবহার করে, যে ভাষায় শ্রোতা বা দর্শক কথা বলে। এফএম রেডিওর পক্ষে বাংলা ভাষা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এখানে যা হচ্ছে তা ভাষাদূষণ নয়, ভাষামিশ্রণ।
অন্য ভাষা থেকে বিভিন্ন শব্দ বাংলা ভাষায় প্রয়োগ প্রসঙ্গে শিশির ভট্টাচার্য্য বলেন, যেকোনো ভাষাকে নতুন শব্দ সৃষ্টি করতে হয়, নতুন অর্থে পুরোনো শব্দ ব্যবহার করতে হয় এবং অন্য ভাষা থেকে ঋণ নিতে হয়। বাংলা এককালে সংস্কৃত, ফারসি, আরবি থেকে ঋণ নিয়েছে, এখন নিচ্ছে ইংরেজি থেকে।
তবে ভিন্নমত দিয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর বলেন, যেকোনো জিনিসের একটি প্রমিত রূপ আছে। ভাষারও প্রমিত রূপ আছে। ভারতবর্ষ আগে বহু ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে ছিল, তখন বাংলা ভাষায় অনেক ঔপনিবেশিক শব্দ অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু এখনো যদি ঔপনিবেশিক আমলের মতো শব্দ আসতে থাকে, তাহলে স্বাধীনতা অর্থহীন। এটা ঔপনিবেশিক-পরবর্তী সময়েও ওই আমলের মনমানসিকতা থাকার লক্ষণ।
চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলার ইংরেজি নাম পরিবর্তন করা উচিত মন্তব্য করে সৌমিত্র শেখর বলেন, এখনো এসব জেলার নাম ইংরেজিতে চিটাগং, মাইমেনসিং লেখা হয়। অথচ ইংরেজিতেই নিয়ম আছে, বিশেষ্য কখনো পরিবর্তন করা যায় না।
দেশে একটি ভাষানীতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাকিম আরিফ বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব ভাষানীতি আছে। সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রভাষা বাংলা, অথচ সরকার ইংরেজির পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে। বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় গ্রহণ-বর্জনের বিষয়ে উদার দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে বলে মনে করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান। তিনি মনে করেন, এ জন্য ভাষা নিয়ে আরও বেশি গঠনমূলক তর্কবিতর্ক হওয়া উচিত।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান, বাংলা বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আজম, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন