ভূমিকম্প, স্রোত, ঘূর্ণিঝড় বড় ঝুঁকি

বিজ্ঞাপন
default-image

শিল্পকারখানা, বন্দর, সড়ক—এসব যাতে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয়, সে কথা মাথায় রেখে এগুলো স্থাপনের জায়গা বাছাই করতে হয়। ভূমির গঠনে পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এসব অবকাঠামোর ক্ষতি করতে না পারে, সে কথা ভেবে পরিকল্পনা করতে হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তেমনটাই করে। মধ্যম আয়ের এই দেশে টেকসই উন্নয়নের এটা অপরিহার্য শর্ত।

উন্নয়নের স্বার্থে সরকার পটুয়াখালী জেলায় পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কক্সবাজারে মহেশখালী থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভারী শিল্প ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে। সেখানে বিপুল বিনিয়োগ করছে। উদ্যোগগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী।

কিন্তু বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে আমাদের গবেষণাগুলো বলছে, ওই উপকূলে এসব তৎপরতার জন্য তিন ধরনের ঝুঁকি আছে। এগুলো হচ্ছে ভূমিকম্প, ঢেউয়ের তীব্র স্রোত এবং ঘূর্ণিঝড়প্রবণতা।

প্রথমত, বাংলাদেশের মাটির নিচে ভূমিকম্পের দুটি বড় উৎস আছে। একটি হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের ডাউকি চ্যুতি বা ফাটল (ফল্ট)। ১৭৮৭ সালে ডাউকি চ্যুতিতে তীব্র ভূমিকম্পের পর ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছিল। আরেকটি হচ্ছে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ভূ-অভ্যন্তরে বিস্তৃত একটি সাবডাকশন অঞ্চল। এমন অঞ্চল বলতে আমরা বোঝাই, যেখানে একটি ভিত্তিস্তরের (টেকটোনিক প্লেট) নিচে আরেকটি ভিত্তিস্তর তলিয়ে যেতে থাকে। এই অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় আছে অসংখ্য চ্যুতির শাখা (স্প্লে ফল্ট)।

সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাটি ইন্দো-বার্মা পর্বতমালার অংশ। ওই এলাকার যে গঠন ও বৈশিষ্ট্য এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা অতীতের অনেকগুলো পরিবর্তনের ফসল। আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে এই সাবডাকশন অঞ্চলে একটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। তাতে লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত নদীটি গতিপথ পাল্টে এখনকার মেঘনা নদীতে সরে এসেছে। আরও শক্তি নিয়ে এই ভূমিকম্প ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ছিল একটি ডুবো দ্বীপ। ১৭৬২ সালে এক বড় ভূমিকম্পে দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন মিটার ওপরে উঠে আসে। সেই ভূমিকম্পে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে কাদা-বালুর স্রোত বেরিয়ে এসেছিল। বঙ্গোপসাগরে সুনামি হয়েছিল, যার প্রভাব ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভবিষ্যতে পূর্ব উপকূলে সুনামি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

আমাদের গবেষণায় আমরা দেখেছি, এই সাবডাকশন অঞ্চলে প্রবল শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে, যার প্রভাব হয়তো সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ওই এলাকার উপকূল ও দ্বীপে কোনো ভারী স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। একটি ভূমিকম্পের কারণে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় পরিকল্পিত ভারী শিল্প উদ্যোগগুলো সব বিনিয়োগসহ বিপদে পড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গোপসাগরের টেকনাফ থেকে সোনাদিয়া পর্যন্ত সমুদ্রের আড়াআড়ি অংশে ঢেউয়ের স্রোত অনেক বেশি। শক্তিশালী তীরাভিমুখী ঢেউয়ের আঘাতে কুতুবদিয়া দ্বীপে ভাঙন বেশি। তার ওপর ওই দ্বীপে পলিমাটির আস্তর আছে, বেড়িবাঁধগুলোও ভেঙে গেছে। এসব কারণে পাড় আরও দ্রুত ভাঙছে।

কুতুবদিয়ায় মাঝেমধ্যে ভাঙন বেশি হয়, আবার কখনো কম হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে সেখানে ভাঙনই বেশি। এমন একটি দ্বীপে এতগুলো ভারী স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা করতে গেলে এসব কিছু মাথায় রাখতে হবে। এটা ঠিক যে সেখানে সমুদ্রের গভীরতা বেশি আর পাশেই মহেশখালীতে বন্দর হচ্ছে। কিন্তু দ্বীপটিতে ভাঙনসহ অন্যান্য ঝুঁকিও অনেক বেশি।

তৃতীয়ত, কুতুবদিয়া দ্বীপ এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। এখন তো প্রায় প্রতি দুই বছরে একটি করে ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানছে। তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সংবেদনশীল স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়বে। এ ছাড়া এলএনজি টার্মিনাল থেকে শুরু করে জ্বালানি খাতের অন্যান্য স্থাপনারও অনেক ঝুঁকি রয়েছে।

অর্থাৎ কুতুবদিয়া আর আশপাশের দ্বীপগুলোতে ভারী স্থাপনা ও বিনিয়োগ করতে হলে এসব দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। নয়তো বিনিয়োগ তো ঝুঁকিতে পড়বেই, বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। সুতরাং দুর্যোগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ টেকসই স্থাপনা গড়তে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন