টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কে চার বছর ধরে গাড়ি চলছে না। কারণ, প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির পাঁচ কিলোমিটার অংশ জোয়ারের তোড়ে বিলীন হয়ে গেছে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে গ্রাম রয়েছে ১৯টি। সেখানে ৪০ হাজার মানুষের বাস। ওই সড়কটি ছাড়া টেকনাফ উপজেলা সদরে যাওয়ার জন্য দ্বীপের মানুষের বিকল্প কোনো পথ নেই। যোগাযোগের এই সমস্যার একমাত্র কারণ দ্বীপের ভাঙা বেড়িবাঁধ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ২০১২ সালের ২২ জুলাই জোয়ারে সড়কটির পাশের উপকূলীয় বেড়িবাঁধের সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা ভেঙে যায়। এতে সড়কের ভরাখাল এলাকার একটি কালভার্ট ধসে পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে ওই পাঁচ কিলোমিটার অংশ বিলীন হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে কোনো রকমে নৌকায় করে এ পাঁচ কিলোমিটার পার হয়ে সড়কের আরেক পাশে উঠতে হয়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে সেই সুযোগও থাকে না।
দ্বীপের উত্তরপাড়ার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ভাটার সময় যখন নৌচলাচল বন্ধ হয়, তখন এলাকার মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না।
সওজের কক্সবাজার কার্যালয় সূত্র বলছে, ১৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কটি আগেও কয়েকবার মেরামত করা হয়েছে। তবে প্রতিবারই জোয়ারের পানি উঠে সেটি নষ্ট হয়।
ভাঙা সড়ক সংস্কার প্রসঙ্গে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রানাপ্রিয় বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগে ভাঙা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বাঁধের আগে সড়ক সংস্কার করা হলে জোয়ারের ধাক্কায় তা আবার ভেঙে যাবে।
শাহপরীর দ্বীপ আওয়ামী লীগের সভাপতি সোনা আলী বলেন, দ্বীপের লোকজনকে কয়েক বছর ধরে পানিবন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে টেকনাফ সদরে চলে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় শতাধিক শিক্ষার্থীর লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
শাহপরীর দ্বীপ রক্ষা ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি জাহেদ হোসেন বলেন, মৎস্য আহরণের অন্যতম স্থান শাহপরীর দ্বীপ এখন বিচ্ছিন্ন জনপদ। এপ্রিল মাস থেকে শুরু হবে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম। তখন জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবনের মুখে পড়বে হাজারো পরিবার।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এই দ্বীপের পশ্চিম পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক কিলোমিটারের মতো বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন সময় ভাঙা বাঁধ সংস্কারের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৭ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত ভাঙা বাঁধ জোড়া লাগেনি। উল্টো বাঁধের নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন ধরেছে বলে মন্তব্য করেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা হামিদুর রহমান।
জলোচ্ছ্বাসের কারণে গত ১৬ বছরে শাহপরীর দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার একর চিংড়িঘের ও ফসলি জমি সাগরগর্ভে তলিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে এলাকার মসজিদ-মাদ্রাসাসহ অন্তত চার হাজার ঘরবাড়ি। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় এলাকার প্রায় তিন হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানান শাহপরীর দ্বীপ রক্ষা ও উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম এ হাশেম।
দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার লবণচাষি কেরামত উল্লাহ বলেন, জোয়ার-ভাটার কারণে চার বছর ধরে লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকায় পাঁচ শতাধিক লবণচাষির পরিবার অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছে।
কাতারের দেওয়ানি আমিরের সচিবালয়ের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হাবিবুর রহমান সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপ ঘুরে গেছেন। এই দ্বীপের বাজারপাড়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়ি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ কিংবা সংস্কার করে শাহপরীর দ্বীপকে রক্ষা করা যাবে না। দ্বীপকে রক্ষা করতে হলে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে। বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম অংশ থেকে পূর্ব দিকে নাফ নদী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার লম্বা ‘খুরের মুখ’ নামক খালটি খুলে দিতে হবে। এতে জোয়ারের পানি খাল দিয়ে নাফ নদীতে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা হলে শাহপরীর দ্বীপ বিলীনের কবল থেকে রক্ষা পাবে। সড়ক যোগাযোগের জন্য খালের ওপর দৃষ্টিনন্দন একাধিক সেতু তৈরি হতে পারে। তখন শাহপরীর দ্বীপ আলাদা দ্বীপ হিসেবে পর্যটক আকর্ষণ করতে পারবে।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাঙা বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে এলাকার মানুষ কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম অংশের বিলীন ২ দশমিক ৬৪৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পুনর্নির্মাণের জন্য প্রায় ১০৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই কাজ করবে (ঠিকাদার হিসেবে) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আর কাজের তত্ত্বাবধান করবে পাউবো। বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ কখন শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু ২০১৮ সালের ৩০ জুনের আগেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, আগামী এপ্রিল মাস থেকে সমুদ্র উত্তাল হয়ে পড়বে। এরপর বর্ষা মৌসুম। এ সময় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী বালির বাঁধ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। বর্ষায় ভেঙে যাবে। তখন সরকারি টাকার অপচয় হবে। তাই আসন্ন বর্ষা কষ্টে কাটাতে হবে শাহপরীর দ্বীপের লোকজনকে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন