সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে সোমবার থেকে নগরের বিভিন্ন জায়গায় টহল দেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা। চট্টগ্রাম, ২৫ জানুয়ারি
সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে সোমবার থেকে নগরের বিভিন্ন জায়গায় টহল দেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা। চট্টগ্রাম, ২৫ জানুয়ারি ছবি: জুয়েল শীল

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের পথসভা, গণসংযোগ ও নির্বাচনী কার্যালয়গুলোতে মানুষের কমতি ছিল না। কাউন্সিলর প্রার্থীদের উঠান বৈঠক কিংবা প্রচারের জন্য গলিতে হাঁটার সময়ও সমর্থকদের উপস্থিতি রীতিমতো মিছিলে রূপ নিত। কিন্তু ভোটের দিন ভোটাররা কেন্দ্রমুখী হয়েছেন খুবই কম। ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ভোট পড়েছে মাত্র ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ।

এর আগে ২০১৫ সালের চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৪৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছিরের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল।

চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে প্রচুর ভোটারের উপস্থিতি চাননি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। এ জন্য তাঁরা শুরু থেকে কেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে ভোটারের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। অন্যদিকে বিএনপি চেয়েছে কেন্দ্রে প্রচুর ভোটার আসুক। কিন্তু ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য যে কৌশল দরকার, তা দেখাতে পারেনি। অন্যদিকে সাধারণ ভোটার এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল শুধু বক্তৃতায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে এবার ভোটার ছিল ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী মাত্র ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শাহাদাত হোসেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পেয়েছেন। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও আনসারের প্রায় ১৮ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এরপরও সহিংসতায় একজন নিহত হয়েছেন। প্রচারণার সময় সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন আরও দুজন। প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রের বিপুল খরচের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত যে নির্বাচন হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

বিজ্ঞাপন

ভোটে সহিংসতা ও অনিয়ম সম্পর্কে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা নিজেরা অন্যায়ের অংশ না হওয়া এবং কাউকে অন্যায় করতে না দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, দুই দলের মেয়র প্রার্থী ভদ্রলোক। এ জন্য মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে তাঁদের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। কিন্তু কাউন্সিলরদের নিয়ে শঙ্কা ছিল। তাঁরাই আসলে সহিংসতা করেছেন। সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চলছে।

২৭ জানুয়ারি ভোটের দিন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে ভোটার নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষে অবস্থান করে কোথাও কোথাও ইভিএম মেশিনে চেপে নৌকায় ভোট নিশ্চিত করেছেন। কোথাও কোথাও ভোটারদের নৌকায় ভোট দিতে প্ররোচিত করেছেন। তবে এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো ভোটার প্রতিবাদ করে বা অনড় থেকে পছন্দের প্রার্থী ও প্রতীকে ভোট দিতে পেরেছেন।

default-image

কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্রের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ভোটের যে স্বাভাবিক প্রবণতা (ট্রেন্ড), তা নষ্ট হয়েছে। ২২টি কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন শূন্য ভোট পেয়েছেন। এসব কেন্দ্রের ১৩টিতে মেয়ের পদে যত ভোট পড়েছে, তার সবই পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী। ভোটারের আকালের মধ্যেও ৯টি কেন্দ্রে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। আবার ১৩টি কেন্দ্রে ২ শতাংশের কম ভোট পড়েছে।

নির্বাচনে কম ভোট পড়ার বিষয়ে নবনির্বাচিত মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ছুটি না থাকায় কিছু সমস্যা হয়েছে। কোনো দেশেই ৯০ বা ১০০ শতাংশ ভোট পড়ে না।

ভোটার বেশি চায়নি আওয়ামী লীগ

স্থানীয় আওয়ামী লীগ, মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর নির্বাচনী কৌশল প্রণয়নে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রে কোন ভোটার প্রবেশ করছে, তাঁরা কোন দলের সমর্থক, কোন প্রতীকে ভোট দিতে পারেন—এসব বিষয় আগেই ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আলাদা দল গঠন করা হয়। নীতিনির্ধারকদের একটা ধারণা ছিল যে নারী ভোটারদের ভোট নৌকায় কম পড়বে। এ জন্য কেন্দ্রে নারী ভোটারদের কড়া নজরদারি করা হয়। সব সময় নারী ভোটারের উপস্থিতি বেশি থাকলেও এবার তেমন দেখা যায়নি।

এ ছাড়া দলীয় কোন্দল, ভোটের দিন সকালে এবং প্রচারের সময় দুটি খুনের ঘটনা ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সহিংসতার কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ভোট দিতে আসেনি। চট্টগ্রাম সিটিতে সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় দুই লাখ।

ছুটি না থাকায় কিছু সমস্যা হয়েছে। কোনো দেশেই ৯০ বা ১০০ শতাংশ ভোট পড়ে না।
রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র

স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, কেন্দ্রে ভোটার আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কাউন্সিলরদের ওপর। এ জন্য দলের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের জোর করে বসানো হয়নি। আর কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা ছিল মেয়র প্রার্থীর কর্মীদের। মেয়র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ সকাল থেকেই ছিল। কিন্তু কাউন্সিলরদের সমর্থকদের মধ্যে প্রায় সব কেন্দ্রে দিনভর উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সহিংসতার ঘটনার কারণে আওয়ামী লীগের নিজস্ব (কোর) ভোটাররাও ভোট দিতে পারেননি। এবারের সিটি নির্বাচনে ৩৯টি ওয়ার্ডে ভোট হয়। এতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন ৩২ জন।

চট্টগ্রামের নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, মারামারির কারণে ভোট কম পড়েছে, এটা মানতে হবে। তবে আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রচারের সময় বিএনপির যত কর্মী-সমর্থক দেখা গেছে, তাঁরাও তো ভোট দিতে যাননি। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির ভোটারদের কেন্দ্রে না যাওয়ার প্রবণতার কারণে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরাও মনে করছেন, তাঁরা না গেলেও দলীয় প্রার্থী জিতে যাবেন।

বিজ্ঞাপন

বিএনপির আতঙ্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

বিএনপির নেতাদের আগে থেকেই ধারণা ছিল, সক্রিয় নেতা-কর্মী ও এজেন্টদের গ্রেপ্তার করা হবে। প্রচারের শুরু থেকে দলটির আড়াই শর মতো নেতা-এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তা বেশি নয় বলেই মনে করছেন দলের নেতারা। কেন্দ্রে এজেন্ট থাকতে দেওয়া হবে না—এটাও তাঁদের ধারণায় ছিল। এ জন্য বাসাবাড়ি থেকে ভোটার কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য নেতা-কর্মীদের বড় অংশকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে সেটাও দলটির নেতা-কর্মীরা পারেননি।

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, তারা যে ভোটগুলো পেয়েছে এর বেশির ভাগই সকালের, ভোট গ্রহণ শুরুর এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে। এরপর মারামারি ও কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভোটাররা আর কেন্দ্রমুখী হওয়ার সাহস পাননি।

মারামারির কারণে ভোট কম পড়েছে, এটা মানতে হবে। তবে আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রচারের সময় বিএনপির যত কর্মী-সমর্থক দেখা গেছে, তাঁরাও তো ভোট দিতে যাননি।
আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রামের নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংকল্পেরও অভাব আছে। কেন্দ্রে স্রোতের মতো তাঁরা হাজির হলে পরিস্থিতি অন্য রকমও হতে পারত। কারণ, কেউ কেউ নিজের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান দেখিয়ে সফল হয়েছেন। এ ছা্ড়া মার খেয়েও কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে সারা দেশে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙা হতো।

এসব বিষয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বেলা দুইটা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৬ শতাংশ। শেষ দুই ঘণ্টায় আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো ২২ শতাংশ কীভাবে হয়? এ ছাড়া ইভিএমে কারচুপি করার জন্য প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদেরও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোট রেখে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

সর্বোচ্চ ৯৪.৯৮%, সর্বনিম্ন ১.২৭% ভোট

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ৭৩৫ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়েছে। এর মধ্যে দুটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত আছে। নির্বাচন কমিশনের ভোটের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন ১ দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট পড়েছে দক্ষিণ মধ্য হালিশহর ওয়ার্ডের আহমদ মিয়া সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। ৩৮ নম্বর মধ্য হালিশহরের ৭টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ২ শতাংশের নিচে। এই এলাকায় ২৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১টিতে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ ভোট পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই অঞ্চলের ভোটারদের বড় অংশই কর্মজীবী। সাধারণ ছুটি না থাকায় এবং সহিংসতার আশঙ্কায় ভোটার আসেননি।

বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বেলা দুইটা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৬ শতাংশ। শেষ দুই ঘণ্টায় আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো ২২ শতাংশ কীভাবে হয়?
শাহাদাত হোসেন, বিএনপির মেয়র প্রার্থী

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ৪৯টি কেন্দ্রে ৫ শতাংশের কম ভোট পড়েছে। ৯টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশ বা এরও বেশি। সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের এহয়াউল উলুম আরবিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে। এই ওয়ার্ডের আরও দুটি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের বেশি। এর বাইরে ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডে ৬টি কেন্দ্রে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়েছে। আরও ১০টি কেন্দ্রে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি মু. সেকান্দার খান প্রথম আলোকে বলেন, ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্র যাওয়া এবং সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। ভোটে দেখা গেছে, এক পক্ষ কেন্দ্র পুরো নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, অন্য পক্ষ মাঠছাড়া। যারা কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের সমর্থকেরা জয় নিশ্চিত জেনে ভোট দিতে যাননি। আর যাঁরা মাঠছাড়া, তাঁদের কর্মীরা কোন ভরসায় ভোটকেন্দ্রে যাবেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন