default-image

নটর ডেম থেকে বের হওয়ার পরদিন থেকে কলেজকে যতটা স্বর্গ মনে হয়, নটর ডেমের দুটি বছর ঠিক ততটাই কষ্টের হয়। সব নটর ডেমিয়ানের কাছে এই পুরো কষ্টের সময়টায় ‘স্ট্রেস রিলিভার’ হিসেবে কাজ করে কলেজের পাশের পদচারী-সেতুটি (ফুট ওভারব্রিজ)। সারা দিনের অথবা পুরো সপ্তাহের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য সোডিয়াম লাইটের আলোতে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যস্ততম এই রাস্তাটার দিকে অপলক চেয়ে থাকাটাই যথেষ্ট ছিল।

জহরলাল স্যারের এতগুলো ম‍্যাথ একসঙ্গে পড়ানো, এডলিন ম্যামের বায়োলজির এত বড় সিলেবাস, ফিজিকস কুইজের ‘ঘ’ নম্বরটায় রহস্যময় কোনো সূত্র থেকে দেওয়া, গুহ স্যারের রিডিং পড়িয়ে সব শেষ করে দেওয়া, ছোট্ট একটা রুমে ৬ জন গার্ড দেওয়া, ল্যাব ক্লাসের একটার পর একটা রিপিট—এগুলো তো নিত্যদিনের গল্প। এরপর সব কুইজের আগের দুই-তিন রাত নির্ঘুম কাটালেও কুইজে ফেল করানোর দায়িত্বটা নটর ডেম ভালোভাবেই পালন করত। একদম অজ পাড়াগাঁ থেকে জীবনের প্রথম ঢাকায় এসে আশপাশে এত সব মেধাবীর মধ্যে এই টিকে থাকার লড়াইটা বেশির ভাগ নটর ডেমিয়ানেরই জানা।

তবুও রেজা স্যারের সেই হৃদয়জুড়ানো ক্লাস, জহরলাল স্যারের অমর সব বাণী, ডন আর মুন্না স্যারের বন্ধুর মতো মিশে যাওয়া, মার্লিন ম্যাম আর এডলিন ম্যামের মায়ের মতো আদর, ফাদারের এমন অমায়িক ব্যবহার—এমন সব অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য এই সময়টা ফিরে পেতে চাইবে না, এমন মানুষ খুব কমই আছে।

অমানবিক একটা সপ্তাহ শেষে বৃহস্পতিবার ল্যাবটা শেষ করে এই ফুটওভার ব্রিজটায় দাঁড়িয়ে নীরবে কাঁদত, এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। একদিকে পরিবারের অভাব অনটন, আরামবাগের মেস আর হোস্টেলের ভয়ানক জীবন, অন্যদিকে কলেজের এমন অমানবিক প্রেশার, প্রতিনিয়ত এমন নিষ্ঠুর সময়গুলো সব নটর ডেমিয়ানকে শিখিয়ে দেয় জীবনে টিকে থাকার লড়াইটা।

আরামবাগের এই জায়গাটুকুতে দেশের সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমী মানুষগুলোর বাস। যারা হাজারটা নির্ঘুম রাত পার অনায়াসে কাটিয়ে দেয় গ্রামে ফেলে আসা মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর আশায়। কতগুলো দিন বাইরে না খেয়ে কাটিয়ে দেয় নতুন একটা বই কিনবে বলে। কতগুলো দিন টিফিন না খেয়ে কাটিয়ে দেয়, বাবার কাছে আর টাকা চাইতে হবে না, এই আশায়।

আরামবাগের মোড়ের ওই চায়ের দোকানটা, ফুচকা-চটপটি আর ভেলপুরির দোকানগুলো, এই ফুট ওভারব্রিজটা, সবার প্রিয় মাতামেরিটা, আবেগের সেই ক্লাসরুমগুলো সবই আছে আগের মতো। শুধু সময়ের স্রোতে একটা ব্যাচ যায়, নতুন একটা ব্যাচ আসে। অভিনয়ের এই মঞ্চ আর স্ক্রিপ্টগুলো একই থাকে, শুধু বদলে যায় পাত্র-পাত্রীরা।

নতুন কিছু মানুষ এসে আবারও জরাজীর্ণ এই ডালাস গলিতে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানুষগুলোর একজন হওয়ার স্বপ্ন দেখে।


*শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন