default-image

ব্যবসায়ীদের কারখানা করার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র যথাসময়ে দেয় না পরিবেশ অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয় দুই দফা চিঠি দিয়ে অনিষ্পন্ন আবেদনের তালিকা চাইলেও তা দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর। এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র না দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তাদের তালিকা চেয়েও পায়নি মন্ত্রণালয়।

উপেক্ষার এ চিত্র উঠে এসেছে খোদ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসানের এক চিঠিতে। সচিব মন্ত্রণালয়টির অধীন সংস্থা পরিবেশ অধিপ্তরের (ডিওই) মহাপরিচালককে গত ২৯ ডিসেম্বর এ চিঠি দেন।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭ (সংশোধিত ২০১৭) অনুযায়ী, উদ্যোক্তাদের আবেদনের ১৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে পরিবেশ বা অবস্থানগত ছাড়পত্র দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সচিবের চিঠিতে ১ হাজার ৬২টি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়, যারা পরিবেশ বা অবস্থানগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু ৬০ দিনের মধ্যে তা দেওয়া হয়নি।

পরিবেশসচিব জিয়াউল হাসানের চিঠিতে বলা হয়, যথাসময়ে আবেদন নিষ্পত্তি না করে পরিবেশ অধিদপ্তর সরকারি সেবা থেকে এসব প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করেছে, যা বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এক থেকে তিন বছর ধরে অনিষ্পন্ন আবেদনের তালিকা চেয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিদপ্তর তালিকা দেয়নি। এরপর গত বছরের ৭ অক্টোবর আবার চিঠি দিয়ে তালিকা চায় মন্ত্রণালয়। এ দফায়ও দেয়নি পরিবেশ অধিপ্তর। এর আগে ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে যথাসময়ে ছাড়পত্র না দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তাদের তালিকা চায়। তাও দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর।

চিঠিতে সচিব বলেন, তালিকা না দিয়ে বরং ‘তাঁরা দায়ী নন’ বলে উল্লেখ করে বলে অযাচিতভাবে কর্মকর্তাদের পক্ষ নেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়।

কোনো শিল্পকারখানা ও বড় প্রকল্পকে তাদের অবকাঠামো নির্মাণ বা উন্নয়নের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশের অবস্থানগত ছাড়পত্র নিতে হয়। ছাড়পত্র না পেলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

যথাসময়ে ছাড়পত্র না দেওয়ার ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ আবেদনের যে অজুহাত পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেখান, সেটার জবাবও পরিবেশসচিব চিঠিতে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে আবেদন নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতার বিষয়টি উপলব্ধি না করে আবেদনকারীদের আবেদনে অসম্পূর্ণতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। স্ব–উদ্যোগে আবেদন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি।

এ বিষয়ে পরিবেশসচিব জিয়াউল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি কাজে সেবা বাড়াতে আমি চিঠিটি দিয়েছি। আশা করি, তারা দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দূর করবে।’

বিজ্ঞাপন

পরিবেশসচিবের চিঠিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চিঠির জবাব দিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, তারা ছাড়পত্র দিতে দেরি করার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ কে এম রফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব ছাড়পত্রের নিষ্পত্তি না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তা আমি এখানে যোগ দেওয়ার আগে থেকে ছিল। আমি দায়িত্ব নিয়ে এগুলোর অনেকগুলোকে ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘যেসব কর্মকর্তার কারণে ছাড়পত্র দিতে দেরি হয়েছে, তাঁদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

পরিবেশসচিবের চিঠিতে যে ১ হাজার ৬২টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুলনায়—৩২২টি। এ ছাড়া গাজীপুরে ১৬১, রংপুরে ১৫৮, চট্টগ্রামে ১২৫, বরিশালে ১২১, নোয়াখালীতে ৯১, ঢাকা মহানগরে ৩৫, চাঁদপুরে ১৭ ও ফেনীতে ৯টি আবেদন রয়েছে। বাকি আবেদনগুলো নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজার জেলায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তারা ৮ হাজার ৩৭৩টি আবেদন পেয়েছিল। নিষ্পন্ন করেছে ৫ হাজার ৩১৫টি, যা মোট আবেদনের প্রায় ৬৩ শতাংশ। দীর্ঘ সময় ধরে আবেদন অনিষ্পন্ন থাকায় একটি বিনিয়োগ প্রকল্পের উদ্যোক্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে বলেন, এভাবে অনুমোদন ঝুলে থাকলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেন না করলে অনুমোদন পাওয়া যায় না।

বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচক বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম। এ তালিকায় বাংলাদেশ চলতি বছরের মধ্যে অন্তত ৯৯তম অবস্থানে আসার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। যদিও সরকারের চেষ্টার পরও অনেক সংস্থার অনীহায় উন্নতি তেমন একটা হচ্ছে না।

বেসরকারি সংস্থা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, আবেদন জমা পড়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হ্যাঁ বা না-একটা কিছু জানিয়ে দিতে হবে। বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসায়ীরা তো বসে থাকবেন না। তিনি বলেন, সরকার ব্যবসা সহজ করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সফলতার জন্য মাঠপর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। তাদের জবাবদিহির মধ্যে না আনলে সমস্যার সমাধান হবে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন